আমদানি-রফতানি পণ্যের কনটেইনার পরিবহন

ডলারের বিনিময় হারে মাশুল আদায় করবে রেলওয়ে

২০২৫ সালে কনটেইনার পরিবহনের ভাড়া ডলারের ভিত্তিতে নির্ধারণের বিষয়টি পরিকল্পনায় আনে রেলওয়ে। ওই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর রেলওয়ের মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে মাসিক পরিচালন পর্যালোচনা সভায় কনটেইনার ভাড়া ডলারের ভিত্তিতে নির্ধারণের নির্দেশনা দেয়া হয়।

আমদানি-রফতানির কনটেইনার পরিবহনে ডলারের বিনিময় হারের সঙ্গে সমন্বয় করে ভাড়া নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সংস্থাটির হিসাবে, টাকার অঙ্কে ভাড়া বাড়লেও ডলারের হিসাবে তা ১৯৯২ সালের চেয়েও কম। এ পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে কনটেইনার পরিবহনের ভাড়া হালনাগাদের সময় ডলারের বিনিময় হারকে ভিত্তি ধরতে চায় রেলওয়ে। পাশাপাশি কনটেইনার পরিবহনের ক্ষেত্রে রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার ও এক্সট্রা ডিসট্যান্স অব পন্টেজ চার্জ আরোপের মাধ্যমে কনটেইনার ভাড়া ডলারে যুগোপযোগী করতে চায় রেলওয়ে। সংশ্লিষ্ট কমিটির প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব রেল ভবনে পাঠানো হয়েছে। রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে বিনিময় হারের পরিবর্তনের সঙ্গে ভাড়া সমন্বয় করা যাবে। এতে কনটেইনার পরিবহন থেকে রাজস্ব বাড়বে এবং পরিচালন আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

রেলওয়ে আন্তঃদেশীয় তিনটি ট্রেনের যাত্রীভাড়া ছয় মাস অন্তর ডলারের বিনিময় হারের সঙ্গে সমন্বয় করে। বন্দর ও কাস্টমসেও আমদানি-রফতানি সংশ্লিষ্ট মাশুল ও শুল্ক নির্ধারণে ডলারের মূল্য বিবেচনায় নেয়া হয়। ব্যবসায়ীরাও বিদেশী ক্রেতার কাছে পণ্যের দাম নির্ধারণ করেন ডলারে। একইভাবে কনটেইনার পরিবহন ভাড়া নির্ধারণেও ডলারের বিনিময় হারকে ভিত্তি ধরতে চায় রেলওয়ে।

২০২৫ সালে কনটেইনার পরিবহনের ভাড়া ডলারের ভিত্তিতে নির্ধারণের বিষয়টি পরিকল্পনায় আনে রেলওয়ে। ওই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর রেলওয়ের মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে মাসিক পরিচালন পর্যালোচনা সভায় কনটেইনার ভাড়া ডলারের ভিত্তিতে নির্ধারণের নির্দেশনা দেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৬ অক্টোবর চার সদস্যের কমিটি গঠন করে পূর্বাঞ্চলের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজারের কার্যালয়। ডেপুটি চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজারকে (আর) আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটিতে ছিলেন ডিএফএ (সদর), এওএম (আইসিডি) ও এসিপিএস (ফ্রেইটস)। বিদ্যমান ভাড়া এবং ভাড়া নির্ধারণকালীন ও বর্তমান বিনিময় হার বিবেচনায় বিভিন্ন আকারের বোঝাই ও খালি কনটেইনারের ভাড়া ডলারে নির্ধারণের সুপারিশ দিতে বলা হয় কমিটিকে। চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি জমা দেয়া প্রতিবেদনটি যাচাই-বাছাই শেষে সম্প্রতি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য রেল ভবনে পাঠানো হয়েছে।

রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাত্রী, পণ্য, জ্বালানি ও কনটেইনার পরিবহনের মূল ভাড়া এখনই বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই। তবে রেয়াতি সুবিধা ও বিভিন্ন সেবামূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে। যাত্রী ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের পর এবার কনটেইনারেও রেয়াত প্রত্যাহার ও পন্টেজ চার্জ আরোপের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। এসব পরিবর্তনের সময় ভাড়া নির্ধারণে ডলারের বিনিময় হারকে ভিত্তি ধরা হবে। এরপর বিনিময় হারের ওঠানামা অনুযায়ী প্রতি ছয় মাস অন্তর ভাড়া সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে।

১৯৯২ সাল থেকে ১০০ কিলোমিটারের বেশি রেলযাত্রায় দূরত্বভেদে ২০, ২৫ ও ৩০ শতাংশ ছাড় দেয়া হতো। ২০১২ সালে সেকশনভিত্তিক রেয়াত বাতিল হলেও দূরত্বভিত্তিক এ সুবিধা বহাল ছিল, যা প্রত্যাহার করা হয় ২০২৪ সালের ৪ মে। পরে ২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর পূর্বাঞ্চলের ছয়টি রুটে ১০০ মিটার বা তার বেশি দৈর্ঘ্যের সেতু ও ভায়াডাক্ট ব্যবহারে অতিরিক্ত দূরত্বের মাশুল বা পন্টেজ চার্জ আরোপ করা হয়। এতে রুটভেদে যাত্রীভাড়া ৫ থেকে ২২৬ টাকা বাড়ে। তবে কোনো ক্ষেত্রেই কনটেইনার পরিবহনের ভাড়া বাড়ানো হয়নি। এবার কনটেইনারেও রেয়াত প্রত্যাহার ও পন্টেজ চার্জ আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।

রেলওয়ের কনটেইনার ভাড়া পর্যালোচনায় দেখা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকা আইসিডিমুখী ২০ ও ৪০ ফুটের ছয়টি ওজনশ্রেণীতেই ১৯৯২ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে টাকার অংকে ভাড়া বাড়লেও ডলারের হিসাবে কমেছে। ২০ ফুটের ১৫ টন পর্যন্ত কনটেইনারের ভাড়া ১৯৯২ সালে ছিল ৬ হাজার টাকা বা ১৫৩ ডলার ৩৪ সেন্ট। ২০১২ সালে তা বেড়ে ৯ হাজার টাকা হলেও ডলারে কমে দাঁড়ায় ১০৯ ডলার ৭৬ সেন্টে। ২০১৬ সালে ভাড়া হয় ৯ হাজার ৭০০ টাকা বা ১২৩ ডলার ৫৭ সেন্ট। ২০ টন পর্যন্ত কনটেইনারের ভাড়া এ তিন বছরে যথাক্রমে ৮ হাজার টাকা বা ২০৪ ডলার ৪৫ সেন্ট, ১২ হাজার টাকা বা ১৪৬ ডলার ৩৪ সেন্ট এবং ১২ হাজার ৯০০ টাকা বা ১৬৪ ডলার ৩৩ সেন্ট। ২৫ টন পর্যন্ত কনটেইনারের ভাড়া ছিল যথাক্রমে ৯ হাজার টাকা বা ২৩০ ডলার, ১৩ হাজার টাকা বা ১৫৮ ডলার ৫৪ সেন্ট এবং ১৪ হাজার ৫০০ টাকা বা ১৮৪ ডলার ৭১ সেন্ট।

২৫ টনের বেশি ওজনের ২০ ফুট এবং ৩০ টন পর্যন্ত ৪০ ফুট কনটেইনারের ভাড়া ১৯৯২ সালে ছিল ১০ হাজার টাকা বা ২৫৫ ডলার ৫৯ সেন্ট। ২০১২ সালে তা হয় ১৫ হাজার টাকা বা ১৮২ ডলার ৯৩ সেন্ট এবং ২০১৬ সালে ১৬ হাজার ১০০ টাকা বা ২০৫ ডলার ১০ সেন্ট। ৩০ টনের বেশি ওজনের ৪০ ফুট কনটেইনারের ভাড়া এ তিন বছরে যথাক্রমে ১৪ হাজার টাকা বা ৩৫৭ ডলার ৭৮ সেন্ট, ২১ হাজার টাকা বা ২৫৬ ডলার ১০ সেন্ট এবং ২২ হাজার ৬০০ টাকা বা ২৮৭ ডলার ৯০ সেন্ট। ডলারের হিসাবে ভাড়া কমে যাওয়ায় আমদানি-রফতানির কনটেইনার পরিবহনে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে মনে করছে রেলওয়ে।

কনটেইনার ভাড়া পর্যালোচনা কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ডলারের হিসাবে ১৯৯২ সালের তুলনায় কনটেইনার পরিবহনে অনেক কম ভাড়া আদায় করছে রেলওয়ে। তিন দশক আগের ভাড়া এখন আর সমন্বয়ের সুযোগ নেই। তবে ভবিষ্যতে ভাড়া বৃদ্ধি কিংবা রেয়াতি মাশুল পরিবর্তনের সময় বিদ্যমান ভাড়াকে ভিত্তি ধরে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে কনটেইনার ভাড়াও সমন্বয় করা হবে। এতে বৈদেশিক বাণিজ্যের কনটেইনার পরিবহন থেকে উল্লেখযোগ্য বাড়তি রাজস্ব পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

ঢাকা আইসিডি থেকে চট্টগ্রাম বন্দরগামী কনটেইনার পরিবহনেও একই চিত্র। ২০ ফুটের ১৫ টন পর্যন্ত কনটেইনারের ভাড়া ১৯৯২ সালে ছিল ৩ হাজার টাকা বা ৭৬ ডলার ৬৭ সেন্ট। ২০১২ সালে তা বেড়ে ৪ হাজার ৫০০ টাকা হলেও ডলারে কমে দাঁড়ায় ৫৪ ডলার ৮৮ সেন্টে। ২০১৬ সালে ভাড়া হয় ৪ হাজার ৯০০ টাকা বা ৬২ ডলার ৪২ সেন্ট। ২০ ফুটের ২০ টন পর্যন্ত কনটেইনারের ভাড়া এ তিন বছরে যথাক্রমে ৪ হাজার টাকা বা ১০২ ডলার ২২ সেন্ট, ৬ হাজার টাকা বা ৭৩ ডলার ১৭ সেন্ট এবং ৬ হাজার ৫০০ টাকা বা ৮২ ডলার ৮০ সেন্ট। ২৫ টন পর্যন্ত কনটেইনারের ভাড়া ছিল যথাক্রমে ৪ হাজার ৫০০ টাকা বা ১১৫ ডলার, ৬ হাজার ৭৫০ টাকা বা ৮২ ডলার ৩২ সেন্ট এবং ৭ হাজার ৩০০ টাকা বা ৯২ ডলার ৯৯ সেন্ট।

২৫ টনের বেশি ওজনের ২০ ফুট এবং ৩০ টন পর্যন্ত ৪০ ফুট কনটেইনারের ভাড়া ১৯৯২ সালে ছিল ৫ হাজার টাকা বা ১২৭ ডলার ৭৮ সেন্ট। ২০১২ সালে তা হয় ৭ হাজার ৫০০ টাকা বা ৯১ ডলার ৪৬ সেন্ট এবং ২০১৬ সালে ৮ হাজার ১০০ টাকা বা ১০৩ ডলার ১৮ সেন্ট। ৩০ টনের বেশি ওজনের ৪০ ফুট কনটেইনারের ভাড়া এ তিন বছরে যথাক্রমে ৭ হাজার টাকা বা ১৭৮ ডলার ৮৯ সেন্ট, ১০ হাজার ৫০০ টাকা বা ১২৮ ডলার ৫ সেন্ট এবং ১১ হাজার ৩০০ টাকা বা ১৪৩ ডলার ৯৫ সেন্ট। অর্থাৎ বন্দরমুখী পথেও ২০১৬ সালের ডলারভিত্তিক ভাড়া ১৯৯২ সালের তুলনায় কম ছিল।

রেলওয়ের নথি অনুযায়ী, ২০১২ সালে পুনর্নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর হয় ১ অক্টোবর। পরে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র ও মহাপরিচালকের কার্যালয়ের আদেশে যাত্রী, পার্সেল, পণ্য ও কনটেইনারের ভাড়া ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ বাড়ানো হয়, যা কার্যকর হয় ২০১৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। তবে তখনো কনটেইনার ভাড়া নির্ধারণে ডলারের বিনিময় হার বিবেচনায় নেয়া হয়নি।

কমিটির প্রতিবেদনে কনটেইনার ভাড়া মার্কিন ডলারে নির্ধারণ যৌক্তিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে রেলের আয় সমন্বয় করা যাবে। ভবিষ্যতে দূরত্বভিত্তিক রেয়াত প্রত্যাহার বা পন্টেজ চার্জ আরোপ করা হলে ডলারভিত্তিক ভাড়ায় প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হবে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, বৈদেশিক বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট মাশুলে বন্দর ও কাস্টমসে আগে থেকেই ডলারের ব্যবহার রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ২০২৫ সালের ট্যারিফ অনুযায়ী, বিভিন্ন পাওনা ও চার্জ মার্কিন ডলারে অথবা জাহাজ আগমনের দিনে সোনালী ব্যাংকের ঘোষিত বিক্রয় হারে বাংলাদেশী মুদ্রায় পরিশোধ করা যায়। বন্দরের নিজস্ব আইন ও ট্যারিফের ভিত্তিতে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। রেলওয়েও আন্তঃদেশীয় তিনটি ট্রেনের যাত্রীভাড়া প্রতি ছয় মাস অন্তর ডলারের বিনিময় হারের সঙ্গে সমন্বয় করে। একইভাবে ভবিষ্যতে ভাড়া বৃদ্ধি ও বিভিন্ন মাশুল যুক্ত করার সময় কনটেইনার ভাড়া নির্ধারণে ডলারের বিনিময় হার বিবেচনায় নেয়া হবে। এতে পণ্য পরিবহনে রাজস্ব বাড়িয়ে পরিচালন আয়-ব্যয়ের ব্যবধান কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে রেলওয়ে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০১৬ সালের পর রেলের ভাড়া বাড়েনি। এরই মধ্যে জ্বালানির মূল্য প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। রেলওয়ে গত দুই বছরে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমিয়ে আনলেও ভাড়া সমন্বয় ছাড়া রেলওয়েকে লাভজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে কনটেইনার পরিবহনের ভাড়া ডলার মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করলে রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়ে যাবে। আমরা বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছি। রোলিং স্টকের সাময়িক সংকটগুলো নিরসনের কাজ শুরু হয়েছে। লোকোমোটিভ সরবরাহ বাড়িয়ে কনটেইনার পরিবহনের সুযোগ বৃদ্ধি করে নতুন এ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে।’

আরও