উত্তরাঞ্চলে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করতে দুই দশক আগে নওগাঁ সদর উপজেলার শাহাপুর এলাকায় আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার প্রতিষ্ঠা করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। কিন্তু দীর্ঘ ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো সংস্কার হয়নি খামারটির। ফলে ধীরে ধীরে তা হারাচ্ছে সক্ষমতা। আবার সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশদূষণেরও অভিযোগ উঠেছে এ খামারের বিরুদ্ধে।
এ খামার থেকে হাঁসের বাচ্চা সংগ্রহ করেই কর্মসংস্থান হয়েছে এ অঞ্চলের ১৬ জেলার হাজারো বেকার যুবক ও তরুণ উদ্যোক্তার। দেশে আমিষের উৎপাদন বৃদ্ধি ও বেকারত্ব লাঘবেও তা রাখছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। উদ্যোক্তাদের সফলতা দেখে অন্যরা অনুপ্রাণিত হওয়ায় ক্রমেই বাড়ছে হাঁসের চাহিদা। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুনজরের অভাবে উৎপাদন বাড়াতে অক্ষম হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তাই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠানটির সংস্কার করে উৎপাদন বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তারা।
নওগাঁ আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় হাঁস প্রজনন খামারটি গড়ে তোলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর থেকে সেখানে হাঁস প্রতিপালনসহ যাবতীয় কার্যক্রম শুরু করা হয়। বর্তমানে খামারটিতে ৪৫০ পিস খাকি ক্যাম্পবেল, ৯৪০ পিস জিন্ডিং এবং ৩৬০ পিস বেইজিং জাতের হাঁস রয়েছে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ লাখ বাচ্চা উৎপাদন, ৫ হাজার ৪০০টি বাচ্চা পালন ও ৩ লাখ ২৪ হাজার ডিম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি মাসে পাঁচদিন পরপর হ্যাচারি থেকে মোট ছয়বার বাচ্চা বের করা হয়। এরপর সরকার নির্ধারিত ন্যায্যমূল্যে প্রতি পিস ২০ টাকায় একদিনের বাচ্চা বিক্রি করা হয়। এরই মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার ৮৫ শতাংশ বাচ্চা উৎপাদন, ২৪ শতাংশ বাচ্চা পালন ও ৭০ শতাংশ ডিম উৎপাদন অর্জিত হয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে খামারে নিয়মিত ১৬ জন থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে ১২ জন কর্মরত রয়েছে। উপপরিচালক, হিসাবরক্ষক, অফিস সহকারী ও অতিরিক্ত একজন ডাক অ্যাটেনডেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ চারটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। যখন খামারটি গড়ে তোলা হয়েছিল, ওই মুহূর্তে খামারটির আশপাশে জনবসতি না থাকলেও বর্তমানে খামারটির চারদিকে আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি গড়ে উঠেছে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রবিহীন অবৈধ ইটভাটা এবং নানা ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এতে হুমকির মুখে পড়েছে খামার।
সাত একর জমিতে খামারটি স্থাপন করা হলেও ত্রুটি রয়েছে এর অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনায়। চারদিকের নিরাপত্তা বেষ্টনীর দেয়ালের খুব কাছাকাছি শেডগুলো নির্মাণ করায় এর পাশে গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের হাঁসের বিষ্ঠার দুর্গন্ধে ভুগতে হচ্ছে। আবার খামারের ভেতরে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় দুর্গন্ধযুক্ত পানি আবাসিক এলাকা এবং আশপাশের কিছু ফসলি জমিতে প্রবেশ করছে, যা ফসল ও মানবদেহের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে বিরক্ত হচ্ছেন আশপাশের বাসিন্দারা। এমনকি তারা শেডগুলোর হাঁসের ক্ষতিও করছেন কখনো কখনো। সম্প্রতি এসব কারণে হাঁসের মৃত্যুহার কমাতে বাধ্য হয়ে আটটি ব্রিডার শেডের মধ্যে চারটি বন্ধ রেখেছে হাঁস প্রজনন খামার কর্তৃপক্ষ।
আবার সময়ের ব্যবধানে দীর্ঘ ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সংস্কার না করায় খামারটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রতি বছর খামারের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের কথা লিখিতভাবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলার উদ্যোক্তা সাদ আহম্মেদ বলেন, প্রথমে বাইরে থেকে হাঁসের বাচ্চা কিনে প্রতিপালন করতে গিয়ে লোকসানের মুখে পড়েছিলাম। পরবর্তী সময়ে বন্ধুর পরামর্শে নওগাঁ হাঁস খামার থেকে একদিনের হাঁসের বাচ্চা কিনে প্রতিপালন করে স্বাবলম্বী হতে পেরেছি। কিন্তু আমাদের চাহিদা অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ কখনো সময়মতো বাচ্চা সরবরাহ করতে পারে না। এতে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে প্রভাব পড়ছে। অনেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তাত্ক্ষণিক বাচ্চা সরবরাহ না পাওয়ায় বাইরে থেকে বাচ্চা কিনে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তাই আমাদের দাবি খামারটির উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে দ্রুত সংস্কার করা হোক।
নওগাঁ আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামারের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, এ খামারে অতিসত্বর উৎপাদন বৃদ্ধি করে উদ্যোক্তাদের মাঝে বেশি বেশি বাচ্চা সরবরাহ করতে পারলে উদ্যোক্তারা যেমন লাভবান হবে, তেমন জাতীয় অর্থনীতিতেও এ হাঁস খামার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারবে। কিন্তু জনবল সংকটসহ অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকায় আমরা হাঁসের বাচ্চার উৎপাদন বাড়াতে পারছি না।
তিনি আরো বলেন, এরই মধ্যে আমাদের চারটি শেড বন্ধ রাখা হয়েছে। দিন দিন বাচ্চার উৎপাদন কমতে শুরু করেছে। অতিসত্বর খামারের সবকিছু নতুনভাবে সংস্কার করা না গেলে ভবিষ্যতে এ খামার সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। হাঁস খামারের উন্নয়নে চাহিদামাফিক একটা বরাদ্দ চেয়ে পাঠানো হয়েছে। উদ্যোক্তাদের স্বার্থে খামারটি দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) ডা. মোহাম্মদ রেয়াজুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, নওগাঁ আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামারের সমস্যাগুলোর বিষয়ে আমরা অবগত আছি। দীর্ঘ বছর সংস্কার না হওয়ায় খামারটি এখন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে উঠছে। ওই খামারটিকে আধুনিকায়ন এবং বিশ্বমানের করতে একটি প্রজেক্ট তৈরি করা হচ্ছে। পুরনো দিনের আঙ্গিকে গড়ে তোলা শেড খামারে আর রাখা হবে না। সেখানে আধুনিক শেড তৈরি করা হবে, যেখানে সবকিছু আধুনিকভাবে হবে এবং লোকবল কম লাগবে। তখন উদ্যোক্তারা এটি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে আধুনিক খামার গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ হবে। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে এবং সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন।