বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা

‘আইকাও’ অডিট সামনে রেখে নিরাপত্তা নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে বেবিচক

এ এভিয়েশন বিশেষজ্ঞের মতে, আইকাও একটি নির্দিষ্ট বিমানবন্দর নয়, দেশের সামগ্রিক এভিয়েশন সিকিউরিটি তদারকি ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থা খতিয়ে দেখবে।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একাধিক নিরাপত্তা স্তর পেরিয়ে ৩১ রাউন্ড তাজা গুলিভর্তি একটি ব্যাগ বিমানে দিল্লি চলে যায়। ঘটনাটি গত ১৬ জুলাইয়ের। ঢাকায় দুই দফা নিরাপত্তা স্ক্যানিংয়ে শনাক্ত হয়নি এ গোলাবারুদ। দিল্লি বিমানবন্দরে ধরা পড়ার পরই বিষয়টি জানাজানি হয়। শনাক্তহীন অবস্থায় বিমানবন্দর থেকে গুলি পার হওয়ার ঘটনা তদন্তে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের, অন্যটি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদর দপ্তর থেকে। গুলিভর্তি ব্যাগ বিমানবন্দরের চেকিং পয়েন্ট পার হওয়ার ঘটনায় দুই স্ক্রিনারের দায়িত্বে গাফিলতি পায় তদন্ত কমিটি। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দুই স্ক্রিনিং অপারেটরকে শাস্তির আওতায় আনার জন্য বেবিচক সদর দপ্তরে লিখিতভাবে সুপারিশ করা হয়েছে। আলোচিত এ ঘটনার পর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এমন এক ঘটনার কিছুদিন পর সামনে আসছে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নিরাপত্তা অডিট। ২৬ অক্টোবর থেকে আগামী ৬ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ইউনিভার্সাল সিকিউরিটি অডিট প্রোগ্রাম—কন্টিনিউয়াস মনিটরিং অ্যাপ্রোচ অডিট হওয়ার কথা রয়েছে। এতে বেবিচকের সদর দপ্তর, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন কাঠামো খতিয়ে দেখা হবে।

অডিট সামনে রেখে নিজেদের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে দাবি করছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। সংস্থাটির সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর মো. আসিফ ইকবাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অডিটের প্রস্তুতি প্রায় ৯৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। নিজেদের ঘাটতি খুঁজে বের করে তা ঠিক করতে তিন ধাপে প্রাক-অডিট চলছে। এরই মধ্যে শাহজালাল বিমানবন্দর, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের অভ্যন্তরীণ অডিট শেষ হয়েছে। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও অডিট চলছে। এসব অডিটে (অভ্যন্তরীণ) ছোটখাটো যেসব ঘাটতি বা “গ্রে এরিয়া” পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো অডিটের আগেই ঠিক করার নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে।’ আসন্ন অডিটে বেবিচকের স্কোর ৭৫ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশাবাদী তিনি।

গত ১৬ জুলাই স্ক্যানে গুলি ধরা না পড়ার ঘটনা নিয়ে আসিফ ইকবাল বলেন, ‘বিশ্বের বড় বড় বিমানবন্দরেও মাঝেমধ্যে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে।’ তার মতে, ওই ঘটনায় শুধু গুলিই ছিল, বড় ধরনের কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়নি এবং নির্দিষ্ট এই একটি ঘটনার কারণে আন্তর্জাতিক অডিটে বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। তবে এমন ঘটনার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হওয়াটা স্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার দাবি, বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা তদারকি কঠোর রাখা হয়েছে।

তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে বিষয়টি বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক উইং কমান্ডার এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আইকাও অডিটে কাগজে-কলমে থাকা প্রটোকলের চেয়ে মাঠ পর্যায়ে বাস্তব প্রয়োগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অস্ত্র বা গুলি পার হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা কিংবা বিমানবন্দরের কর্মীদের অনিয়ম নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’

এ এভিয়েশন বিশেষজ্ঞের মতে, আইকাও একটি নির্দিষ্ট বিমানবন্দর নয়, দেশের সামগ্রিক এভিয়েশন সিকিউরিটি তদারকি ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থা খতিয়ে দেখবে।

বিমানবন্দরে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না; মাঠ পর্যায়ে সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করাই বড় পরীক্ষা।’ বেবিচকের তদারকি বাড়ানো, স্ক্যানারগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিমানবন্দর পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা আলাদা করার ওপর জোর দেন তিনি।

ছবি: এআই

অন্যদিকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় কোনো ধরনের ছাড় না দেয়ার ওপর জোর দিয়েছেন এয়ারএশিয়া ও কুয়েত এয়ারলাইনসের জেনারেল সেলস এজেন্ট প্রতিষ্ঠান টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের (টাস গ্রুপ) চেয়ারম্যান কেএম মজিবুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তার ক্ষেত্রে “জিরো টলারেন্স” থাকতে হবে। থার্ড টার্মিনালে যে আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম বসানো হচ্ছে ধীরে ধীরে একই মানের সরঞ্জাম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরনো টার্মিনালগুলোতেও আনা দরকার। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনবলকে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ইউরোপ ও আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হলে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা মান আরো উন্নত করতে হবে। এ কাজ কোনো একক সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। এয়ারলাইনস, বেবিচক, বিমান বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একটি নির্দিষ্ট এসওপি অনুযায়ী জনবলকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তা বাস্তবে নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি ভুলও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই বিষয়টিকে জাতীয় ইস্যু হিসেবে নিয়ে আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা জরুরি।’

আইকাওয়ের আসন্ন নিরাপত্তা অডিটের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এভিয়েশন ‘ক্যাটাগরি-১’ অর্জনের সরাসরি সম্পর্ক নেই। বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, আইকাওয়ের অডিটে মূলত আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী, কার্গো ও মেইল পরিবহনে নিরাপত্তা প্রটোকল ও স্ক্রিনিং ব্যবস্থা ঠিকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা তা দেখা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাটাগরি-১ অর্জনের সঙ্গে সম্পর্কিত সেফটি অডিট আগামী বছর হওয়ার কথা।

আইকাও অডিটের আগে অবশ্য একটি ইতিবাচক ফল পেয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর ট্রান্সপোর্টের (ডিএফটি) সর্বশেষ নিরাপত্তা অডিটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ৯৪ শতাংশ এবং ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ৯৮ শতাংশ স্কোর করেছে। ২০২৫ সালের মূল্যায়নে এ দুটি বিমানবন্দরের স্কোর ছিল যথাক্রমে ৯৩ ও ৯৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শাহজালালের স্কোর ১ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং ওসমানীর ৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। কার্গো-সংক্রান্ত অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল্যায়নে শতভাগ কমপ্লায়েন্সও পাওয়া গেছে।

বেবিচকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ডিএফটি অডিটের এ ফলাফল আসন্ন আইকাও অডিটের প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে। তবে একই সঙ্গে ডিএফটি অডিটে পাওয়া পর্যবেক্ষণ থেকে ঘাটতি চিহ্নিত করে তা সংশোধনের সুযোগও তৈরি হয়েছে। এর আগে ২০১৭ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চ ঝুঁকির কার্গো ও মেইল ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে বাংলাদেশ। ফলে ইউরোপগামী কার্গো ও মেইলে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সময় ও ব্যয়ের প্রয়োজন হয়।

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে অননুমোদিত ড্রোন, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেয়ার সক্ষমতা। গতকাল শাহজালাল বিমানবন্দরে আয়োজিত ‘এয়ারপোর্ট ইমার্জেন্সি এক্সারসাইজ (ফায়ার) ২০২৬’ অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ‘শিগগিরই আইকাও অডিট হবে। তাদের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি জড়িত। তাই আইকাওর পক্ষ থেকে যেসব বিষয়ে পর্যবেক্ষণ আসতে পারে, সেগুলোতে আগে থেকেই কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে হবে।’ ভিআইপি, সিআইপিসহ সবার জন্য একই নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণের কথাও বলেন তিনি।

বিমানমন্ত্রী আরো জানান, বিমানবন্দরকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) হিসেবে বিবেচনা করে অননুমোদিত ড্রোন ঠেকাতে অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম বসানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও স্ক্যানার রাখার ওপরও জোর দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিমানবন্দরে দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ডের পর প্রথম কয়েক মিনিটকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিস, বিমানবন্দর পরিচালনা, নিরাপত্তা ও চিকিৎসা দলের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ ও সমন্বয় নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

আরও