সারের সংকট ও বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠছে ভেজাল ও নকল সার তৈরির কারখানা। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন ও ভেজাল কীটনাশক তৈরি করে নামিদামি কোম্পানির মোড়কে বাজারজাতের ঘটনাও ধরা পড়ছে প্রশাসনের অভিযানে। কোথাও ইটের গুঁড়ো, চুন, বালি, সিমেন্ট ও বিভিন্ন রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে সার, কোথাও আবার মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিষিদ্ধ কীটনাশকের মোড়ক বদলে বাজারজাত করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভেজাল সার ও কীটনাশক, উৎপাদনের কাঁচামাল ও সরঞ্জাম জব্দ করেছে প্রশাসন। এসব ঘটনায় জরিমানা, কারাদণ্ড, পণ্য ধ্বংস ও কারখানা সিলগালার মতো ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে মানিকগঞ্জে বাজার থেকে সংগৃহীত সার ও কীটনাশকের নমুনা পরীক্ষা করে সাতটি কোম্পানির সারে ভেজাল পাওয়ার তথ্য জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার লাউতাড়া গ্রামে ১৬ সেপ্টেম্বর অভিযান চালিয়ে অবৈধ ও নিষিদ্ধ ঘাসমারা কীটনাশক এবং নামিদামি ব্র্যান্ডের নকল মোড়কে সার মজুদের অভিযোগে ব্যবসায়ী মশিউর রহমানকে এক মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়। একই সঙ্গে জরিমানা করা হয় ৫০ হাজার টাকা। অভিযানে প্রায় ৫ লাখ টাকা মূল্যের নকল ও ভেজাল সার-কীটনাশক জব্দ করা হয়।
এর কয়েকদিন আগে ১০ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জের হযরতপুর এলাকায় নকল সার ও নিষিদ্ধ কীটনাশক তৈরি ও মোড়কজাতের অভিযোগে একজনকে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। একই অভিযানে ছয়টি ব্যক্তিমালিকানাধীন কারখানা থেকে জব্দের পর ধ্বংস করা হয় বিপুল পরিমাণ নকল সার ও কীটনাশক। একই দিনে হযরতপুর ইউনিয়নের আলিপুর এলাকায় মেঘনা ফার্টিলাইজার লিমিটেড নামের একটি কারখানায়ও অভিযান চালিয়ে নকল সার ও নিষিদ্ধ কীটনাশক জব্দ করা হয়।
কেরানীগঞ্জের কালিন্দী ইউনিয়নে ৯ সেপ্টেম্বর একটি অবৈধ কারখানায় অভিযান চালিয়ে ভেজাল টিএসপি ও ডিএপি সার উৎপাদনের অভিযোগে এর মালিক মো. জামালকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। সেই সঙ্গে সিলগালা করে দেয়া হয় কারখানাটি। অভিযানে প্রায় ২৫০ বস্তা প্রস্তুতকৃত ভেজাল টিএসপি সার এবং সার তৈরির কাঁচামাল হিসেবে রাখা প্রায় ৩০০ বস্তা চুন, সিমেন্ট ও সিরামিক মাটি জব্দ করা হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, ডলোমাইট চুন, সিরামিক মাটি, সিমেন্ট ও হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন উপাদান দিয়ে এসব সার তৈরি করা হচ্ছিল। পরে তা চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও মৎস্য খামারিদের কাছে বিক্রি করা হতো।
এর আগে ২৭ আগস্ট রংপুরের পীরগাছা উপজেলার সৈয়দপুর বাজার এলাকায় একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ভেজাল সার ও বালাইনাশক তৈরির কারখানার সন্ধান পায় প্রশাসন। সেখান থেকে বিভিন্ন নামিদামি কোম্পানির মোড়ক, কাঁচামাল ও সরঞ্জামসহ ৭২ বস্তা ভেজাল সার জব্দ করা হয়।
একই দিন মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় ভেজাল সার বিক্রির অভিযোগে বিএডিসির এক ডিলারকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তার দোকান থেকে জব্দ করা হয় পাঁচ বস্তা ভেজাল সার।
রংপুরের পীরগঞ্জের কৃষক নাসির হোসেন বলেন, ‘গত মৌসুমে আলু ও এবার আমনে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেও ভালো ফল পাইনি। একাধিকবার সার ও কীটনাশক দিতে হয়েছে। তখন বুঝিনি। এখন ভেজাল ধরা পড়ার পর মনে হচ্ছে, আমিও হয়তো ভেজাল সার ব্যবহার করেছি।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৮ আগস্ট ভেজাল কীটনাশক তৈরি ও প্যাকেটজাতের অভিযোগে সদের আলী নামে এক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে এক বছরের কারাদণ্ড ও ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেন। তার দোকান থেকে ৩০৭ বস্তা ভেজাল ইউরিয়া, ২৪৪ বস্তা এমওপি, ১৯ বস্তা ডিএপি ও তিন বস্তা টিএসপি সার জব্দ করা হয়।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় গত ৩০ জুলাই ভেজাল সার ও কীটনাশক তৈরি এবং প্যাকেটজাত করে বিক্রির অভিযোগে এক ব্যবসায়ীকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অনুমোদিত বালাইনাশক ডিলার ছিলেন। অভিযানে তার দুটি গুদাম থেকে প্রায় ২০০ বস্তা সার তৈরির কাঁচামাল ও সরঞ্জাম এবং ১০ বস্তা নকল কীটনাশক জব্দ করা হয়। ফেনীতে ১৩ জুলাই বীজের মোড়ক জালিয়াতি, মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশকের মেয়াদ পরিবর্তন এবং ভেজাল কৃষিপণ্য বিক্রির অভিযোগে ‘মেসার্স নিউ ফকির ট্রেডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
শুধু অভিযানেই নয়, বাজারে বিক্রি হওয়া পণ্যের পরীক্ষাতেও ভেজালের প্রমাণ মিলছে। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার কৃষকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাজার থেকে ১৬টি প্যাকেটজাত কৃষিপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে কৃষি বিভাগ। উপজেলার চর তিল্লী, কুষ্টিয়া, চর সাটুরিয়া ও বালিয়া বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার ১০টি দোকান থেকে এসব নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে পরীক্ষার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সংশ্লিষ্ট গবেষণা কেন্দ্রে পাঠানো হয়। ৮ সেপ্টেম্বর পরীক্ষার ফল হাতে পাওয়ার পর কৃষি বিভাগ জানায়, সাতটি কোম্পানির সারে ভেজাল পাওয়া গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও ডিলারদের এসব পণ্য বাজার থেকে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, এসব ভেজাল পণ্য ব্যবহারে কাঙ্ক্ষিত ফলন না পাওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। সাটুরিয়ার কামতা এলাকার চাষী আব্দুর রশিদ বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর ধরে সবজি চাষ করছি। গত বছর কিছু প্যাকেটজাত সার ব্যবহারে খেতের ক্ষতি হয়। বাজারে চমকপ্রদ মোড়কে এ ধরনের সার পাওয়া যায়। কিন্তু এসব সার ব্যবহারে কোনো লাভ হয়নি।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মানিকগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ বলেন, ‘যেসব সারের মান খারাপ পাওয়া গেছে, সেগুলো বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ভেজাল সার ব্যবহারে কৃষকের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা বা অন্য সহযোগিতা দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি ভেজাল সার বাজারজাত ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভেজাল সার ও কীটনাশকের ক্ষতি কৃষকের জন্য দ্বিমুখী। একদিকে কৃষক আসল পণ্যের দাম দিয়ে এমন পণ্য কিনছেন, যাতে প্রয়োজনীয় কার্যকর উপাদান নেই। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফলন না পেয়ে তাকে আবার সার বা কীটনাশক কিনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে নিম্নমানের বা ভুল উপাদানের কীটনাশক ব্যবহারে পোকামাকড় দমন না হওয়ায় ফসল নষ্টের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সার ও কীটনাশক কৃষির অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। এগুলোর প্রয়োগের ওপর ফসলের উৎপাদনশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে। এসব উপকরণের মান খারাপ হলে কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ভেজালের বিস্তার বাড়লে কৃষকের পাশাপাশি সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনশীলতা ও অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই সরকার ও কৃষি বিভাগকে কঠোর তদারকি করতে হবে। অনিয়ম পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। অন্যথায় এর বিস্তার খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।’
কৃষির মাঠপর্যায়ে কাজ করে থাকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। সার ও কীটনাশকের মান যাচাই এবং কৃষক পর্যায়ে তা ব্যবহারের অনুমোদনসহ নানা বিয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত সংস্থাটি। বাজারে বিক্রি হওয়া ভেজাল পণ্য নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভেজাল সার ও কীটনাশকের কিছু অভিযোগ আছে। তবে ভেজাল এসব পণ্য দিয়ে কেউ যাতে কৃষকের সঙ্গে প্রতারণা করতে না পারে সেজন্য আমাদের কর্মকর্তারা কাজ করছেন। যেসব অভিযান হয়েছে সেখানে আমাদের কৃষি কর্মকর্তারাও ছিলেন। অভিযানের পাশাপাশি কোনো সার ও কীটনাশক নিয়ে সন্দেহ হলে সেগুলো ল্যাব টেস্টের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অনিয়ম পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আমরা এ বিষয়ে সতর্ক আছি।’