অর্থ বিভাগের প্রতিবেদন

কর্মক্ষমতায় পিছিয়ে বিআরটিসি মানোন্নয়নে তিন বছর মেয়াদি পরিকল্পনা

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় সড়ক পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়ে এলেও বিআরটিসির যাত্রীসেবার মান ‘‌সন্তোষজনক নয়’।

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় সড়ক পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়ে এলেও বিআরটিসির যাত্রীসেবার মান ‘‌সন্তোষজনক নয়’। অনিয়ম, দুর্নীতি আর অদক্ষতার কারণে বছর বছর লোকসান গুনছে প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের করা ২০টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাষিত প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কর্মক্ষমতা মূল্যায়নেও (ইনডিপেনডেন্ট পারফরম্যান্স ইভালুয়েশন বা আইপিই) পিছিয়ে রয়েছে বিআরটিসি। আইপিই স্কোর কম হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দক্ষতা বৃদ্ধি ও যুগোপযোগী পরিচালন ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য বেশকিছু সুপারিশ এবং তিন বছরব্যাপী স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি ‌পারফরম্যান্স ইমপ্রুভমেন্ট স্ট্র্যাটেজি (পিআইএস) প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিআরটিসি বর্তমানে সনাতনী ‘‌ফিক্সড-রুট’ মডেলে বাস পরিচালনা করছে। এ মডেলে বাস পরিচালনার ক্ষেত্রে যাত্রী চাহিদার তুলনায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বেশি গুরুত্ব পেয়ে যাচ্ছে। ফলে যেসব রুটে যাত্রীর চাহিদা বেশি এবং লাভজনক, সেসব রুটে বাসের অভাব দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে যেসব রুটে চাহিদা ও যাত্রী কম, সেখানে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বাস চলাচল করছে। খালি বাস চালানোর কারণে বাড়ছে লোকসানের বোঝা।

এছাড়া আধুনিক পরিবহন ব্যবসায় জিপিএস ট্র্যাকিং, ই-টিকিটিং বা রুট অপ্টিমাইজেশন সফটওয়্যারের মতো বিষয়গুলো অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিআরটিসি এগুলোর বদলে এখনো সনাতনী ব্যবস্থায়ই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বেসরকারি পরিবহনগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বলেও জানানো হয় প্রতিবেদনে।

পরিচালন দুর্বলতার পাশাপাশি বিআরটিসির জনবলস্বল্পতার বিষয়টিও উঠে এসেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পিআইএস প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, বিআরটিসিতে যত জনবল অনুমোদিত আছে, তার এক-তৃতীয়াংশ পদ বর্তমানে শূন্য। বিশেষ করে কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে দক্ষ লোকের অভাব রয়েছে। আবার সংস্থাটির মানবসম্পদ বিভাগের দুর্বলতার কারণে সঠিক প্রশিক্ষণ ও কর্মক্ষমতা মূল্যায়নের ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি, যা কর্মীদের কর্মস্পৃহা কমিয়ে দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে বিআরটিসির আর্থিক অনিয়ম ও সক্ষমতার অভাবের কথাও উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিআরটিসির আর্থিক বিবরণী বা ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট আন্তর্জাতিক হিসাবমান মেনে তৈরি করা হয়নি। এমনকি সংস্থার সম্পদের সঠিক হিসাব রাখার জন্য কোনো ‌ফিক্সড অ্যাসেট রেজিস্টারও নেই। হিসাবরক্ষণ বিভাগ চলছে সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে। হিসাব ও অর্থ বিভাগে পেশাগতভাবে দক্ষ কোনো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা কস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট নেই। অদক্ষ জনবল দিয়ে হাজার কোটি টাকার হিসাব পরিচালনার ফলে অর্থের অপচয় এবং লিকেজ বা চুরির ঝুঁকি তৈরির উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিআরটিসির সামগ্রিক দুর্বলতা ও ব্যর্থতার জন্য সংস্থাটির সাংগঠনিক কাঠামোকে দায়ী করা হয়েছে অর্থ বিভাগের পিআইএস প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে ‘‌বিআরটিসি আইন ২০২০’ অনুযায়ী, সংস্থাটির চেয়ারম্যান একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিবেদনে বিষয়টিকে ‘‌স্বার্থের সংঘাত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের অন্য পরিচালকরাও সরকারি আমলা এবং তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্বে কর্মরত। পর্ষদ সদস্যরা যদি কোনো ভুল করে থাকেন, তাহলে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। আবার ‘‌অডিট কমিটি’, ‘‌নমিনেশন কমিটি’ বা ‘রিমুনারেশন কমিটির’ মতো কোনো সাবকমিটিও বর্তমানে বিআরটিসিতে নেই, যেগুলোকে বিশ্বমানের করপোরেট গভর্ন্যান্সের জন্য ‘‌অপরিহার্য’ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে বিআরটিসিকে একটি লাভজনক ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দেয়া হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‌পারফরম্যান্স ইমপ্রুভমেন্ট স্ট্র্যাটেজি প্রতিবেদনে।

স্বল্পমেয়াদে এক বছরের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনার মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ডস (আইএস) বা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ন্ডস (আইএফআর) অনুযায়ী আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করা, ত্রৈমাসিক ক্যাশ ফ্লো বিবরণী এবং বাজেটের বিচ্যুতি বিশ্লেষণের সুপারিশ করা হয়েছে।

এক-দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনার মধ্যে পরিচালনা পর্ষদের আকার কমিয়ে ৭ থেকে ৯ সদস্যের মধ্যে নামিয়ে আনা এবং পর্ষদ থেকে ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ আলাদা করা, সনাতন পদ্ধতির বদলে চাহিদাভিত্তিক বাস পরিচালনা শুরু, সাব ও অডিট বিভাগে পেশাদার ও যোগ্য জনবল নিয়োগ দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

আর তিন বছরের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনার মধ্যে ‘‌বিআরটিসি আইন ২০২০’ সংশোধন করে পরিচালনা পর্ষদ থেকে ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ আলাদা করা, পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয়া এবং একজন দক্ষ ও পেশাদার ব্যক্তির মাধ্যমে মানবসম্পদ বিভাগ পরিচালনার সুপারিশ করা হয়েছে।

সরকারের অর্থ বিভাগ এ ‌পারফরম্যান্স ইমপ্রুভমেন্ট স্ট্র্যাটেজি তৈরি করলেও এখনো এ সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌প্রতিবেদনটি আমরা এখনো হাতে পাইনি। পেলে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আরও