সম্প্রতি রেলপথে কনটেইনারবাহী একাধিক ট্রেন দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে চট্টগ্রাম, আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ একাধিক স্থানে মালবাহী ট্রেনের দুর্ঘটনায় শঙ্কায় ছিল রেলওয়েসহ আমদানিকারক ব্যবসায়ীরাও। রেলপথে পরিবহনের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারের সংখ্যাও কমে গেছে অস্বাভাবিক হারে। তবে তদন্তে কনটেইনারে বোঝাইজনিত ত্রুটিতে দুর্ঘটনার প্রমাণ পেয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
গত ১০ এপ্রিল চিটাগং পোর্ট গুডস ইয়ার্ডে (সিজিপিওয়াই) ঢাকা কমলাপুর আইসিডিতে পাঠাতে কনটেইনার (নং-এইচডিএমইউ-২৭৫০৩৪৬) বিএফসিটি (নং-৯৩২৬২) লোড করা হয়। কনটেইনারবাহী ট্রেনটি চলা শুরুর পরই একপাশ কাত হয়ে পড়ে যায়। অন্যর একটি বিএফসিটিতে (নং-৯৩২৯২) লোড দিয়ে পরের দিন একই কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে ফেরত পাঠানো হয়। এ সময় ইসহাক ডিপো রেলগেট অতিক্রম করার সময় একইভাবে পড়ে যায়। একইভাবে আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের একাধিক স্থানে কনটেইনারবাহী বেশকিছু ট্রেন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।
কয়েকটি দুর্ঘটনার পর আতঙ্কে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনারগুলো রেলপথে পাঠানোর প্রবণতা কমে আসে। ১৮ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে কনটেইনারবাহী ট্রেন চলাচল করেছে মাত্র ৩৬টি। যেখানে এপ্রিলে কনটেইনার ট্রেন পরিবহনের সংখ্যা ছিল ৭০। মার্চে ছিল ৭২টি। ৪ জুন থেকে কোরবানির ঈদ উপলক্ষে যাত্রীবাহী ট্রেনের চলাচল স্বাভাবিক রাখা ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে মালবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যে কারণে ঈদের আগে কোরবানির পণ্য আমদানির স্বার্থে এ সময় কনটেইনারবাহী ট্রেনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরপর দুর্ঘটনার কারণে ট্রেনের পরিবর্তে সড়কপথেই কনটেইনার নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, একই কনটেইনার দুই দফায় দুর্ঘটনার পর নিজেদের ত্রুটি-বিচ্যুতি খোঁজার চেষ্টা করে রেলওয়ে। কিন্তু রেলওয়ে ট্রাফিকের ত্রুটি না পাওয়ায় রেলওয়ে কনটেইনার মালিক পক্ষ ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে কনটেইনারটি খুলে দেখা হয়। গত ২২ এপ্রিল কনটেইনারটি খুলে দেখা যায়, ভেতরে যথাযথভাবে পণ্য ল্যাসিং/প্যাকিং না করায় মালামাল একপাশে জমা হয়ে (অসম বোঝাই) আছে। এতে কনটেইনারের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। রেল কিংবা পরিবহন ট্রেনের ত্রুটি না থাকলেও এতে বারবার একই স্থানে কনটেইনার ট্রেন দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশ না করে রেলের পরিবহন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলের দুর্ঘটনা নানান কারণে ঘটে। কিন্তু স্বল্প সময়ের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দুর্ঘটনা হওয়ায় পরিবহন বিভাগ ত্রুটি অনুসন্ধান করে কনটেইনারের বোঝাই সমস্যা খুঁজে পেয়েছে। এখন থেকে রেলের নিজস্ব ত্রুটির পাশাপাশি পণ্য বা কনটেইনারের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে। মাত্র ২৬ ঘণ্টার ব্যবধানে সাতটি ট্রেনের দুর্ঘটনার কারণে রেলপথে পণ্য পরিবহনের ঝুঁকি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় সাম্প্রতিক সময়ে কনটেইনার সরবরাহ কমে গেছে। বিশেষ করে আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সর্বোচ্চ পরিমাণ কনটেইনার রেলে যাওয়ার কথা থাকলেও রেকর্ড পরিমাণ সরবরাহ কমে গেছে।’
গত ২৭ এপ্রিল এ ধরনের ভারসাম্যহীন কনটেইনারগুলো রেলপথে পরিবহন না করতে বন্দরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয় রেলওয়ে। রেলওয়ের সহকারী পরিবহন কর্মকর্তা (২) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের দেয়া ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ভেতরের মালামাল এক পাশে জমা হওয়া কনটেইনারগুলো রেলপথে পরিবহন সম্ভব নয়। এজন্য বন্দরে রেলের জন্য অপেক্ষা না করে এ ধরনের কনটেইনার বিকল্প পদ্ধতিতে পরিবহনের জন্য বন্দরসহ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুরোধ জানায় রেলের পরিবহন বিভাগ।
জানা গেছে, রেলের আপত্তির কারণে রেলপথে কনটেইনার পরিবহনের হার অস্বাভাবিক কমে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর ও সিজিপিওয়াই এলাকায় এক হাজারের বেশি কনটেইনার জমা থাকলেও বর্তমানে সেটি নেমে এসেছে কয়েকশটিতে। সর্বশেষ ১৯ মে বন্দরে কনটেইনার মজুদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৪০-এ। এর মধ্যে ১৩ মে কনটেইনার এসেছে ৩১৫টি, ১৪ মে ২৩টি, ১৫ মে ২৮টি, ১৬ মে ৭টি, ১৮ মে ৭৫টি এবং ১৯ মে ২৬৬টি কনটেইনার পরিবহনের জন্য রেলের হিসাবে দেয়া হয়েছে। যদিও ১৭ মে রেলপথে পরিবহনের জন্য কোনো কনটেইনার পাওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) আনিসুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বারবার একই ট্রেন ও কনটেইনার দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ায় রেলওয়ে বিষয়টি অনুসন্ধান করেছে। পরে কনটেইনারের ভেতর পণ্য বোঝাইয়ের মজুদজনিত সমস্যা উদ্ঘাটন করা হয়েছে। বিষয়টি আমরা বন্দরসহ সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছি। আশা করি ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কনটেইনারে পণ্য মজুদের সময় অধিক সতর্কতা ও নিয়ম প্রতিপালন করা হবে।’