চসিকের বারইপাড়া খাল খনন প্রকল্প

ভূমি অধিগ্রহণ ও অর্থছাড় জটিলতায় কাজে ধীরগতি

চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৪ সালে প্রায় তিন কিলোমিটারের বারইপাড়া খাল খননের উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। পাঁচ দফা সময় বাড়িয়ে খালটি নির্মাণ করার জন্য সরকার চসিককে তাগাদা দিলেও ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন না হওয়া এবং প্রকল্পটির অর্থছাড় সময়মতো না হওয়ায় কাজে চলছে ধীরগতি। সর্বশেষ মার্চ পর্যন্ত নির্মাণাধীন খালটির কাজের অগ্রগতি মাত্র ৩৯ শতাংশ।

চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৪ সালে প্রায় তিন কিলোমিটারের বারইপাড়া খাল খননের উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। পাঁচ দফা সময় বাড়িয়ে খালটি নির্মাণ করার জন্য সরকার চসিককে তাগাদা দিলেও ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন না হওয়া এবং প্রকল্পটির অর্থছাড় সময়মতো না হওয়ায় কাজে চলছে ধীরগতি। সর্বশেষ মার্চ পর্যন্ত নির্মাণাধীন খালটির কাজের অগ্রগতি মাত্র ৩৯ শতাংশ। 

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বহদ্দারহাট বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খননের জন্য ২৫ একর জমি অধিগ্রহণে ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। এ ভূমি অধিগ্রহণে এরই মধ্যে ৯১৪ কোটি টাকার বেশি চসিককে বুঝিয়ে দিয়েছে সরকার। প্রকল্পটির জন্য ১৫ একর জমি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন চসিককে বুঝিয়ে দিয়েছে। তবে ১০ একরের অধিগ্রহণ নিয়েই মূলত জটিলতা রয়েছে। যার কারণে প্রকল্পটির স্বাভাবিক কার্যক্রমে কিছুটা বিঘ্ন হচ্ছে। তবে জেলা প্রশাসন জমি বুঝিয়ে না দিলেও পাঁচ একর জায়গার ওপর কাজ করছে চসিক।

এদিকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের মার্চের শেষের দিকে মাসিক সাধারণ সভায় খাল নির্মাণ প্রকল্পের বিষয়ে চসিকের কাছে জানতে চান চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফকরুজ্জামান। এ সময় চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খালটির কাজের অগ্রগতি মাত্র সাড়ে ৩৮ শতাংশ বলে জানান। প্রকল্পটিতে অর্থছাড়ের জটিলতার কারণে কাজ সম্পন্ন করতে দেরি হচ্ছে বলে জানান তিনি। পরে জেলা প্রশাসক বিষয়টি সমাধানে উচ্চপর্যায়ে কথা বলবেন বলে সাধারণ সভায় জানান।

চসিকের তথ্যমতে, ২০১৪ সালের ২৪ জুন একনেকের সভায় অনুমোদন হওয়া বহদ্দারহাটের বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ২৮৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। পরের বছর নতুন ব্যয় ধরা হয় ৩২৬ কোটি ৮৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা এবং প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০১৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৭ সালের ৩০ জুন। তবে বাজেট সংস্থান না হওয়া জমি অধিগ্রহণে জটিলতা দেখা দেয়ায় কাজ শুরু করতে পারেনি চসিক। যার কারণে প্রকল্পটির কাজ বন্ধ থাকায় ২০২২ সালের ১৯ এপ্রিল পঞ্চম দফায় ব্যয় বাড়িয়ে ১ হাজার ৩৬২ কোটি ৬২ লাখ টাকা অনুমোদন দেয় একনেক। নতুন মেয়াদ ধরা হয় ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত।

বারইপাড়া খাল খনন প্রকল্পটি সিডিএর ১৯৯৫ সালের নগরীর মাস্টারপ্ল্যানে তিনটি নতুন খাল খননের যে সুপারিশ করা হয়েছিল তার মধ্যে একটি। মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে নগরীর জন্য ২০১১ সালে খালটি খননের উদ্যোগ গ্রহণ করে চসিক। খালটির দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৯৭ কিলোমিটার ও প্রস্থ ৬৫ ফুট। খালের উভয় পাড়ে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ ও ২০ ফুট প্রস্থের সড়ক নির্মাণ করা হবে। ২০১৪ সালে চসিক মেয়র মো. মনজুর আলমের সময় প্রকল্পটির অনুমোদন হলেও কাজ শুরু হয়নি। এমনকি অর্থসংকটে জটিলতায় সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনও প্রকল্পটির কাজ শুরু করতে পারেননি। তবে চসিকে মো. রেজাউল করিম মেয়র নির্বাচিত হলে তিনি খালটি খননের মূল উদ্যোগ গ্রহণ করেন। অর্থছাড় কিংবা ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার সমাধান না হলেও মেয়র বিশেষ ব্যবস্থায় খালটির নির্মাণকাজ চালু রেখেছেন বলে জানান চসিক কর্মকর্তারা। 

চসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক ফরহাদুল আলম বলেন, ‘‌প্রায় ২৫ একরের মধ্যে ১৫ একর অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ১০ একরের অধিগ্রহণ সম্পন্ন না হলেও পাঁচ একরে আমাদের কাজ চলছে। মেয়র জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে বলেছেন। হয়তো দ্রুতই সমস্যাটির সমাধান সম্ভব হবে। তাছাড়া চলতি অর্থবছরের জন্য প্রকল্পটির জন্য অর্থ বরাদ্দ কম থাকায় কাজে কিছুটা ধীরগতিতে চলছে। মেয়র অর্থছাড়ে মন্ত্রণালয়ে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। অর্থছাড় হলে সময়সীমার মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব।’

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত সরকারের অর্থছাড় না হওয়ায় প্রকল্পটির কাজে অগ্রগতি আশানুরূপ নয়। চলতি অর্থবছরে শতকোটি টাকা এ প্রকল্পে বরাদ্দ পাওয়া গেছে। কিন্তু গত বছরের শেষের দিকে চাহিদাপত্রে আরো তিন গুণ বেশি অর্থ চাওয়া হয়েছিল। তাই বাজেট অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হয়নি। তবে খালের রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণকাজ চলছে। রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ সম্পন্ন হলে তারপর খাল খননের কাজ শুরু হবে।

চসিকের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌অর্থছাড় ও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় খালটির খননকাজ ধীরগতিতে চলছে। প্রকল্পটির জন্য গত বছর ৩০৭ কোটি টাকা চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়, সেখানে তিন ভাগের এক ভাগ বরাদ্দ পাওয়া গেছে। মেয়র এ বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে আমাদের দিয়ে কাজটি করাচ্ছেন। মন্ত্রণালয় অর্থছাড় দিলে প্রকল্পটির কাজ শেষ করতে কোনো বাধা নেই।’

চট্টগ্রামের নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের নেতারা বলছেন, চট্টগ্রামে একসময়ে ৭০টির বেশি খাল ছিল। অনেক খালের তো এখনো অস্তিত্বই নেই। নকশা বা খতিয়ান বের করে হারিয়ে যাওয়া খালগুলো যদি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় তাহলে নতুন খালের দিকে আমাদের চেয়ে থাকা লাগত না। সেক্ষেত্রে সরকারের অনেক অর্থ সঞ্চয় হতো। নগরীর যে পরিস্থিতি তাতে নতুন খাল খনন করতে হলে সরকারের অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। এতে অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নেই বলে মনে করছেন তারা।

আরও