অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন কেবল জিডিপি বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সবস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছানোই প্রকৃত উন্নয়নের শর্ত। অথচ বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও আয়, সম্পদ ও সুযোগের বৈষম্য ক্রমেই বেড়েছে। রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সংকট, ন্যায়বিচারের দুর্বলতা, অর্থনীতিতে লিকেজ মডেলের বিস্তার এবং নীতিগত অকার্যকারিতার কারণে প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে প্রত্যাশিতভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
গতকাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ ও বেসরকারি গবেষণাকারী সংস্থা পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টার (পিটিইআরসি) কর্তৃক যৌথভাবে আয়োজিত ‘ইনক্লুসিভ গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন আলোচকরা। সেমিনারে মিডিয়া পার্টনার ছিল বণিক বার্তা।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি মানে শুধু জিডিপি বাড়ানো নয় বরং সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণীর মধ্যে ন্যায্যভাবে বণ্টিত হচ্ছে কিনা সেটিই মুখ্য বিষয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক দশকে গড়ে ৫-৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রত্যাশিত প্রভাব পড়েনি। আয়বৈষম্যের সূচক বর্তমানে প্রায় দশমিক ৫-এর কাছাকাছি, যা উচ্চ বৈষম্যের স্পষ্ট ইঙ্গিত। দেশের ১০ শতাংশ মানুষ প্রায় ৪০ শতাংশ সম্পদ নিয়ন্ত্রণে রাখছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।
তিনি আরো বলেন, ‘খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার ও দুর্নীতির কারণে অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ অর্থ মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সম্পদ যা একটি প্রভাবশালী শ্রেণী আত্মসাৎ করছে। এর ফলে ভবিষ্যৎ সরকারগুলোকে একটি “মেঘাচ্ছন্ন অর্থনীতি” উত্তরাধিকার হিসেবে বহন করতে হবে। সমতা নয় বরং ন্যায়সংগত বণ্টন, সুশাসন ও সৎ নেতৃত্বের মাধ্যমেই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি সম্ভব বলে আমি মনে করি।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তাসলিম উদ্দিন বলেন, ‘উন্নয়ন মানে কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি নয়। জিডিপির আকার বড় হলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয়—এমন ধারণা থেকে বিশ্ব অনেক আগেই সরে এসেছে। উন্নয়ন চিন্তায় ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ, হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট ধারণা গুরুত্ব পেয়েছে। ইনক্লুসিভ গ্রোথ মূলত নীতিনির্ভর ধারণা, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব গোষ্ঠীর মধ্যে ন্যায্যভাবে বণ্টন হচ্ছে কিনা সেটি গুরুত্বপূর্ণ।’
অমর্ত্য সেনের ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইনক্লুসিভ গ্রোথের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষতা ও সমবণ্টনের ভারসাম্য। এই ভারসাম্য আনতে প্রগ্রেসিভ ট্যাক্সেশন একটি কার্যকর নীতি হাতিয়ার। যার মাধ্যমে ধনীদের কাছ থেকে বেশি কর নিয়ে দরিদ্রদের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। এ কর রাজস্বের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ। একই সঙ্গে গ্রাম ও শহরের মধ্যে অবকাঠামোগত বৈষম্য দূর করা, অর্থনীতির বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল এমপাওয়ারমেন্ট নিশ্চিত করাও ইনক্লুসিভ ও টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘জিডিপি বৃদ্ধি হলেও যদি তার সুফল সমানভাবে বণ্টিত না হয়, তবে প্রবৃদ্ধি অসম হয়ে পড়ে। বাস্তবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ভূমি, শ্রম, পুঁজি ও উদ্যোক্তার অবদান সমান নয়, কারো আয় বেশি আবার কারো কম। ফলে সবাই সমানভাবে প্রবৃদ্ধির অংশীদার হতে পারে না।’
পিটিইআরসির চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক বলেন, ‘গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও বাস্তবতায় আয়, ভোগ ও সম্পদবৈষম্য বেড়েছে। বৈষম্যের সূচক দশমিক ৫-এ পৌঁছানো তারই প্রমাণ। জাতীয় সম্পদের বড় অংশ সীমিত জনগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার মূল কারণ হলো অর্থনীতিতে লিকেজ বা নিঃসরণ মডেলের বিস্তার। রাষ্ট্রীয় সম্পদ অনৈতিকভাবে ব্যক্তি খাতে প্রবাহিত হয়ে বিদেশে পাচার হচ্ছে, ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের কল্যাণে রূপ নিচ্ছে না।’
বাজেট ও নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতার ঘাটতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাজেট ট্রান্সপারেন্সি কম, বাজেট ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার প্রত্যাশার নিচে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে না পৌঁছানোয় দারিদ্র্য হ্রাস কার্যকর হচ্ছে না। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর পরোক্ষ করের চাপ বাড়লেও ধনীদের ক্ষেত্রে কর ছাড় অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমন্বয়হীনতায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। সুশাসনের ঘাটতি, দুর্নীতি ও দুর্বল তথ্য ব্যবস্থাপনা এ সংকটকে আরো গভীর করেছে।’
সমাপনী বক্তব্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ‘ইনক্লুসিভ গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট নতুন বিষয় নয়, তবে নতুন রিসোর্স পারসন ও নতুন ভাবনা জানার জন্য এ সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে। দেশে সমস্যার অভাব নেই, নীতিগত সমাধানও আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এর মূল কারণ দুটি—এক. অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিবেশের অভাব এবং ২. ন্যায়বিচারের দুর্বলতা। রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া বিচার নিশ্চিত করা যায় না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যখন সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন লিকেজ মডেল তৈরি হয় এবং বিচার ব্যবস্থা প্রভাবিত হয়। এ দুই জায়গায় সংস্কার ছাড়া নীতির সুফল আসবে না।’
সেমিনারের শেষে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাবে আলোচকরা বলেন, ‘বাংলাদেশে দেশীয় ও বিদেশী বিনিয়োগ কম আসার প্রধান কারণ নীতিগত অস্থিতিশীলতা, দুর্বল দেশীয় রেটিং, দক্ষ শ্রমশক্তির ঘাটতি এবং বাজার বৈচিত্র্যের অভাব। বিনিয়োগ আকর্ষণে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতি, দক্ষ মানবসম্পদ, আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং বহুমুখী উৎপাদন কাঠামো জরুরি। গ্রামীণ অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সমতা নিশ্চিত করলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত হবে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফাহিম শাহারিয়ারের উপস্থাপনায় সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী রবিউল ইসলাম, মোহাম্মদ ফয়সাল, প্রভাষক কাজী মান্না ইয়াসমিন, ফারহানা ইয়াসমিন, মুবাসিরা চৌধুরী নাবিলা, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. শহিদুল হকসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
সেমিনারে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয়ে অর্থনৈতিক গবেষণা প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। এসব প্রস্তাবনার মধ্য থেকে তসলিমা জান্নাত, ওসমান ফারুক ও সুমাইয়া তাবাসসুমের গবেষণা প্রস্তাবনাকে পুরস্কৃত করে পিটিইআরসি। পাশাপাশি গবেষণা প্রস্তাবনা উপস্থাপনকারী আরো পাঁচজন শিক্ষার্থীকে সংস্থাটির বিভিন্ন অর্থনৈতিক গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দেয়া হয় সংস্থাটির পক্ষ থেকে।