কোনো কাজে শ্রম ও শক্তি কাজে লাগানোর সময় না চাইতেই একজন শ্রমিকের ফুসফুস থেকে বাতাস বেরিয়ে আসে। তৈরি হয় শব্দ। অনর্থক সেই শব্দ লাঘব করে শ্রমের কষ্ট। মানুষ সেই বিষয়টা টের পাওয়ার পর চিন্তা করেছিল অনর্থক শব্দকে অর্থবোধক করে তোলা যাক। কিন্তু সাধারণ শব্দ বা কথা তা করে না। এরপর তারা ছন্দে কথা বলতে শুরু করল। তারপর তৈরি করল গান। আর কাজের সময় গাইতে শুরু করল এক ধারার গান, যা পরে ‘শ্রমসংগীত’ বলে পরিচিত হয়। বাংলার সারি গান তার অন্যতম উদাহরণ। নৌকার দাঁড় বা গুণ টানা এবং বৈঠা বাওয়ার কায়িক শ্রমকে সংগীতে রূপ দিয়েই মাঝিদের মধ্যে সারি গানের প্রচলন ঘটে। এখনো নৌকাবাইচে এ গান গাওয়া হয়।
বিজয়গুপ্তের পদ্মাপুরাণে সারি গানের উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায়। নৌকার মাঝিরা এ ধারার গান গাইতেন বলেই গবেষকরা মনে করেন। এছাড়া হাল চাষ, খেত নিড়ানো, চাপ পেটানোর সময়ও সারি গাওয়ার চল আছে। দীর্ঘ যাত্রা বা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে তবে বহু দাঁড়িসহ নৌকায় এ ধারার গান বেশি প্রচলিত। কথিত আছে মোগল নৌবাহিনীর দ্বারা যখন নৌকাবাইচ শুরু হয় তারাও সারি গান গাইতেন। বাংলাদেশে এখন যেসব অঞ্চলে নৌকাবাইচ হয় সেসব অঞ্চলে ও বাইচে সারি গাওয়া হয়।
সারি মূলত সমবেত পুরুষ কণ্ঠের গান। তবে কখনো নারী-পুরুষ একত্রেও সারি গেয়ে থাকেন। এ গানে একজন প্রধান শিল্পী থাকেন। তিনি বয়াতি। তার সঙ্গে থাকেন দোহাররা। বয়াতি নিয়ে মূল গান করেন এবং সঙ্গে কখনো কখনো দোহারদের দিশা ধরিয়ে দেন।
শ্রমসংগীতের অন্যান্য ধারার মতো সারিও তালপ্রধান। এর অবশ্য কারণ আছে। বাইচের কথা ভাবা যাক। নদীর ঢেউয়ে নৌকা কখনো ওপরের দিকে ওঠে, কখনো নামে। আবার মাঝি কখনো বৈঠা নিজের দিকে টানে কখনো ঠেলে দেয়। এ দুই সময়ের শ্রমের ধরন আলাদা, ফলে তালও আলাদা হওয়া বাঞ্ছনীয়। বাইচে যখন নৌকার গতি দ্রুত হয়, গানও তখন দ্রুত গাওয়া হয়। আবার কোনো কারণে মন্থর হলে বা কাজের গতি কমানোর সময় গান ধীর লয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সারি গানের প্রচলন আছে। ছাদ পেটানো, গাছ কাটা, ফসল তোলার সারি গান সারা দেশেই হয়। তবে আলাদা করে বাইচের সারি গান নেত্রকোনা, সিলেট, সিরাজগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নড়াইল, বরিশাল, খুলনায় প্রচলিত।
সারি গান নানা বিষয় নিয়ে লেখা হয়। এতে পুরাণ, লোককথা ও কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিষয়ের উল্লেখ থাকে। তবে প্রেম, রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক গল্প, নিমাইয়ের সন্ন্যাস, বদর পীর ইত্যাদি বিষয় উঠে আসে। একটি সারি গানের কথায় আছে—ওরে আল্লাহ বল নাও খোল/ শয়তান যাবে দূরে।/ ওরে কলমা পইড়া দেছে/ মোহাম্মদ রসুলরে।
আবার নড়াইলের সারি গানে আছে—রাবণের শক্তিশেলে লক্ষণ পৈলো/ গাও তোলোরে ও ভাই লক্ষণ রাম কেঁন্দে মলো।
এছাড়া ‘নাও ছাড়িয়া দে’, ‘এপার গোন বাইয়া মোরা’, ‘ও কানাই পার করে দে আমারে’র মতো গানগুলো বাংলায় জনপ্রিয়। এসব গান এখন নাগরিকদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে নানা মাধ্যমে। কোক স্টুডিওর মতো আয়োজন এসব গানের ফিউশন করছে। ‘হাত ছাইড়া দাও সোনার দেওয়া’ও একটি সারি গান।