তাদের মধ্যে নয়জনকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাখা হয়েছে। অন্য একজন সচিব পদে পদোন্নতি ও পদায়ন পেলেও এখনো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব নেননি।
জনপ্রশাসন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সচিব। প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আর্থিক শৃঙ্খলা ও নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ফলে কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগে দীর্ঘ সময় পূর্ণকালীন সচিব না থাকলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি ও সমন্বয়হীনতার ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে বর্তমান সরকার সদ্য দায়িত্ব নেয়ায় শীর্ষ পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা, যাতে কোনো ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি না হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সচিব পদে কোনো কর্মকর্তা কর্মরত নেই। এসব দপ্তরের কার্যক্রম আপাতত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পরিচালনা করছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কর্মরত মোট ৮৪ জন সিনিয়র সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার মধ্যে ১০ জন বর্তমানে কোনো দপ্তরের দায়িত্বে নেই। তাদের মধ্যে নয়জনকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাখা হয়েছে। আর একজন এখনো কোনো দপ্তরে যোগদান করেননি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাত চৌধুরী, মো. সাইফুল্লাহ পান্না, মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী, ফারজানা মমতাজ, মো. ওবায়দুর রহমান, মো. কামাল উদ্দীন, জাহেদা পারভীন, মো. মফিদুর রহমান এবং কাজী আনোয়ার হোসেন জনপ্রশাসনে সংযুক্ত। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব থেকে পদোন্নতি পেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে নিয়োগ পেলেও মো. আতাউর রহমান খান এখনো দায়িত্ব নিতে পারেননি। ফলে তাকে যুক্ত
করলে বর্তমানে কার্যত দপ্তরহীন সচিবের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ জনে।
সার্বিক বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার মাত্র চার মাস হলো এসেছে। ১৭ বছর দেশে ফ্যাসিস্ট সরকার চলেছে, তার আগে ছিল দুই বছর সেনাসমর্থিত সরকার। ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গেছে। এখন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে দেখে-শুনে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা হলো সততা, স্বচ্ছতা, মেধা ও দক্ষতাকে মূল্যায়ন দিতে হবে। সে অনুযায়ী সব বিভাগে কাজ চলছে। সরকার নতুন এসেছে, দীর্ঘদিনের এ পরিস্থিতির পরে সেটআপ করতে একটু সময় তো লাগবেই। সবকিছুই ঠিকভাবে চলছে। যেসব জায়গায় পদায়ন প্রয়োজন, সেভাবেই পদায়ন হচ্ছে। যেকোনো সময় খালি পদগুলো পূরণ হয়ে যাবে। একজন কর্মকর্তা এক জায়গায় গেলে আরেক জায়গা খালি হয়, কিন্তু কাজ তো বন্ধ নেই।’
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সততা ও দক্ষতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘প্রশাসন মোটামুটি সেটআপ হয়ে গেছে, দুই-একটি জায়গা আছে, সেগুলোও হয়ে যাবে। সব জায়গায় ইতিবাচকভাবে কাজ চলছে। কোথাও কোনো ডেডলক নেই।’
বর্তমানে ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এটি বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের কার্যালয়। তবে বিএনপি সরকার গঠনের পর দপ্তরে এখনো পর্যন্ত কোনো সচিব নিয়োগ হয়নি। এর অধীনস্থ দপ্তরগুলো হলো গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট (জিআইইউ), বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (পিইপিজেড), এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপি), জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ), স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)।
বিশ্ব বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ দপ্তর-সংস্থাগুলো হলো বাংলাদেশ ট্রেড এবং ট্যারিফ কমিশন, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর, আমদানি ও রফতানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের অফিস, বাংলাদেশ চা বোর্ড, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট, বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল, দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টস অব বাংলাদেশ, দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ এবং ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ।
গত ১৭ এপ্রিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মাহবুবুর রহমান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সচিব পদে কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। ওই সময়ে মন্ত্রণালয়ে সচিবের চলতি দায়িত্ব পালন করছিলেন অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খান। গত ঈদের ছুটির মধ্যে আতাউর রহমানকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব থেকে সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ দেয় সরকার। তবে এখনো তাকে যোগ দিতে দেখা যায়নি। ফলে এখনো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সচিবের পদটি ফাঁকা রয়েছে।
সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। এর অধীনে রয়েছে বিজেএমসি, বিটিএমসি, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড, পাট অধিদপ্তর, বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড, বস্ত্র অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পাট করপোরেশন, জেডিপিসি এবং লিকুইডেশন সেল। তবে মন্ত্রণালয়ে বর্তমানে কোনো সচিব কর্মরত নেই। রুটিন দায়িত্বে রয়েছেন আরিফুর রহমান খান। এর আগে ৯ জুন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব আব্দুন নাসের খানকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব (চুক্তিভিত্তিক) হিসেবে পদায়ন করা হয়। যদিও তিনি দপ্তরটির দায়িত্ব পান চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল। তিনি তৎকালীন সচিব বিলকিস জাহান রিমির স্থলাভিষিক্ত হন।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীনস্থ দপ্তরগুলো হলো বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি), বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক অথরিটি, ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর সার্টিফিকেট প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (সিসিএ), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি, বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড (বিডিসিসিএল), স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড এবং এজেন্সি টু ইনোভেট (এটুআই)। বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে কোনো সচিব কর্মরত নেই। দপ্তরটিতে ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্বে রয়েছেন মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা। চলতি বছরের ২৬ মার্চ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান কাজী আনোয়ার হোসেন। এর আগে তিনি স্থানীয় সরকার বিভাগে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চলতি বছরের ২৫ মে তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের এক সচিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিভিল সার্ভিসে দলাদলি, বিভাজন ও একে অন্যকে পেছনে ফেলার প্রবণতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এটাকে গুছিয়ে আনা বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। আমলাতন্ত্রে যোগ্য ও উপযুক্ত কর্মকর্তাদের বাছাই, সঠিক পদায়ন এবং পুরো ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা অত্যন্ত কঠিন কাজ। সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো এ পরিস্থিতি সামাল দেয়া। কারণ প্রশাসনে এখনো ব্যাপক দলাদলি, নানা ধরনের লবিং এবং পদ-পদবিকে ঘিরে উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া সহজ নয়।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারকে কিছুটা সময় দিতে হবে। দীর্ঘদিনের নানা বিশৃঙ্খলার পর তারা দায়িত্ব নিয়েছেন। সিভিল সার্ভিসের ভেতরের বিভাজন ও দলাদলি মোকাবেলা করে প্রশাসনকে গুছিয়ে আনতে সময় লাগবে। তাই পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই, গবেষণা ও খোঁজখবর নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। কারণ সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা বিলম্ব হলেও সমস্যা নেই, কিন্তু তড়িঘড়ি করে নেয়া কোনো সিদ্ধান্ত পরে নড়বড়ে প্রমাণ হলে তা আরো বেশি নেতিবাচক বার্তা দেয়।’