লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসির) মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের অফিস ভবন ভাড়া দিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক আলমগীর হোসেন। আড়তদারদের থাকার জন্য অফিসের একাংশ ভাড়া দিয়ে নিজের পকেট ভারী করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে ওই ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে। নিয়মবহির্ভূত তার এমন কর্মকাণ্ডে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। অথচ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে আড়তদারদের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত পৃথক ভবন রয়েছে। অফিস ভবনের যে কক্ষটি ভাড়া দেয়া হয়েছে, সেটি ল্যাবরেটরি কক্ষ। এখানে অবতরণ কেন্দ্রে প্যাকিং উপযোগী বিভিন্ন প্রজাতির মাছের মান পরীক্ষা-নিরীক্ষা হওয়ার কথা। সরকারিভাবে সরবরাহকৃত মূল্যবান যন্ত্রপাতি ল্যাবরেটরি কক্ষ থেকে সরিয়ে ছাদের একটি চিলেকোঠা কক্ষে অযত্নে ফেলে রাখা হয়েছে। এছাড়া মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের শেডে দুটি চায়ের দোকান ভাড়াও দিয়েছেন তিনি। আর আড়ত ভবনের ভেতর স্থানীয় বাজারের দুটি হোটেলের জন্য কিচেন ভাড়া দিয়েছেন।
গতকাল সকালে সরজমিন দেখা যায়, রামগতি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের সীমানার ভেতরে দ্বিতল অফিস ভবনের নিচ তলায় তিনটি কক্ষ। এর মধ্যে একটি ব্যবস্থাপকের অফিস কক্ষ, একটি অফিস নথি সংরক্ষণে আরেকটি অফিসের অন্যান্য কর্মচারীদের কক্ষ। দোতলায় দুটি কক্ষ। এর একটি সেমিনার কক্ষ ও অন্যটি ল্যাবরেটরি কক্ষ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় সেখানে সেমিনার কক্ষে এক কোনায় একটি টেবিল পড়ে আছে। কোনো চেয়ার নেই। আর ল্যাবরেটরি কক্ষে অফিসেরই একটি সেমিনার টেবিলকে চকি হিসেবে ব্যবহার করে দুজন লোক বসবাস করছে। তাদের একজনের নাম তপন। আরেকজনের নাম শাহজান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা জানান, রামগতি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক আলমগীর হোসেন নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা করেন না। সরকারি অফিস বাইরের লোকের কাছে ভাড়া দিয়েছেন তিনি। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সঙ্গে আঁতাত করে চলায় তার কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কেউ কোনো অভিযোগ করার সাহস পান না।
আড়তদার ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে জানান, অবতরণ কেন্দ্রে আড়তদারদের জন্য নির্ধারিত ভবনের সব কক্ষ বরাদ্দ না দিয়ে বাইরের হোটেল মালিকদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন দুই-তিনটি কক্ষ। এমনকি আড়তদার ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি বিভিন্ন সুবিধা গোপন করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রামগতি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক আলমগীর হোসেন তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে অফিস কক্ষ ভাড়া দেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের সবকিছুই আড়তদারদের সুবিধার জন্য। এখানে আড়তদারদের নির্ধারিত ভবনে সব আড়তদারের সংকুলান হয়নি। তাই অফিসের ল্যাবরেটরি কক্ষ ভাড়া দিয়েছি। আর সম্মেলন কক্ষটি নামাজ আদায়ের জন্য ছেড়ে দিয়েছি।’ এগুলো অনিয়ম নয় দারি করে তিনি আরো বলেন, ‘প্রয়োজনে অফিস কক্ষ ভাড়া দেয়ার নিয়ম আছে। এর থেকে প্রাপ্ত ভাড়া সরকারের কোষাগারেই জমা হয়। এজন্য রসিদের মাধ্যমে টাকা আদায় করা হয়। তবে এ-সংক্রান্ত কোনো রশিদ কিংবা অফিস রেজুলেশন দেখাতে পারেননি ব্যবস্থাপক।
এ বিষয়ে বিএফডিসি চেয়ারম্যান (অ.দা) ফজলুল হক বলেন, ‘মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের অফিস কক্ষ ভাড়া দেয়ার কোনো বিধান নেই। খোঁজ-খবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
বিএফডিসি সূত্রে জানা যায়, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ভোক্তা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসম্মত মাছ পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে মেঘনা নদীর তীরে লক্ষ্মীপুরের রামগতি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। দুই একর ৭০ শতাংশ জমির ওপর এ অবতরণ কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে মাছ অবতরণে একটি বড় আকারের শেড, একটি প্যাকিং শেড, একটি ইন্সপেকশন কক্ষ ও একটি দ্বিতল আড়ত ভবন রয়েছে। আড়ত ভবনে ২২ জন আড়তদার ব্যবসায়ীকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা এখানে ব্যবসা পরিচালনাসহ আবাসিক সুবিধা ভোগ করে থাকেন। জেলেদের জন্য দুটি পাবলিক টয়লেট রয়েছে। একটি বরফ কল রয়েছে, সেটাতে একটি ক্র্যাশ মেশিন রয়েছে। একটি দ্বিতল অফিস ভবন ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি আবাসিক ভবন রয়েছে। এ অবতরণ কেন্দ্রে অভ্যন্তরীণ বাজারে স্বাস্থ্যসম্মত মাছ অবতরণ ও বিপণন করা হয় প্রতি মাসে গড়ে ১৩৭ টন। এছাড়া মাছের জন্য প্রয়োজনীয় বরফ সরবরাহ করা হয় মাসে গড়ে ১৫৮ টন। এ অবতরণ কেন্দ্রে আড়তদার, জেলেসহ প্রায় ১ হাজার ৫০০ মাছ ব্যবসায়ী সম্পৃক্ত। মাছ ব্যবসা, আমদানি-রফতানি ও পরিবহনকাজে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ কেন্দ্রটির সুবিধাভোগী।