রংপুরে বাদামের ফলন ভালো হলেও বৃষ্টি নিয়ে চিন্তায় কৃষক

রংপুরে তিস্তা নদীবেষ্টিত কাউনিয়া, পীরগাছা ও গঙ্গাচড়া ব্যাপক হারে বাদাম চাষ হয়। শুরু থেকে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফলনও ভালো হয়েছে।

রংপুরে তিস্তা নদীবেষ্টিত কাউনিয়া, পীরগাছা ও গঙ্গাচড়া ব্যাপক হারে বাদাম চাষ হয়। শুরু থেকে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফলনও ভালো হয়েছে। উজানে ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে নেমে আসা ঢলে তিস্তা নদীর পানি বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। গত শুক্রবার পানি বৃদ্ধি পেয়ে আশপাশের জমিতে ঢুকে পড়ে। যদিও পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছেন বাদামচাষীরা। তবে পানি বাড়লে চরাঞ্চলের বাদামখেত প্লাবিত হতে পারে। এতে দেখা দিতে পারে ফলন বিপর্যয়।

চাষীরা বলছেন, ফলন ভালো হলেও শেষ পর্যন্ত ঘরে তোলা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে কিছু বাদাম ঘরে তুলেছেন কৃষক। ১০-১৫ দিনের মধ্যেই বেশির ভাগ জমির বাদাম ঘরে তোলার প্রস্তুতিও রয়েছে তাদের। তবে তিস্তার পানি বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ হাজার ৩৭৫ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। চাষ হয়েছে ১ হাজার ৩৯০ হেক্টর জমিতে, যা গত বছর আবাদকৃত জমির চেয়ে ১০ হেক্টর বেশি। গত বছর ১ হাজার ৩৮০ হেক্টর জমিতে বাদামের আবাদ হয়েছিল।

জেলায় সবচেয়ে বেশি বাদাম চাষ হয় কাউনিয়া, পীরগাছা ও গঙ্গাচড়ায় তিস্তার চরে। চলতি বছর শুধু কাউনিয়া উপজেলায় আবাদ হয়েছে ৮৭৫ হেক্টর জমিতে।

তিন উপজেলার বাদামচাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের চেয়ে অর্ধেকেরও বেশি কম দামে এবার বীজ সংগ্রহ করতে পেরেছেন তারা। এছাড়া শুরু থেকে বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় দেখা না দেয়ায় ফলনও ভালো হয়েছে।

গঙ্গাচড়া উপজেলার উত্তর কোলকোন্দ গ্রামের বাদামচাষী আবু তালেব দুলাল প্রায় ৪০ শতক জমিতে বাদাম চাষ করেছেন। এরই মধ্যে জমি থেকে এক মণ বাদাম উত্তোলন করেছেন। আশা করছেন এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো জমি থেকে বাদাম ঘরে তুলতে পারবেন। কিন্তু হঠাৎ করে গত শুক্রবার তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে আশপাশের জমিতে ঢুকে পড়ে। তবে পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় আপাতত তার জমি রক্ষা পেয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সব ঠিক থাকলে চাষকৃত জমি থেকে প্রায় ১১ মণের মতো বাদাম পাওয়া যাবে। এজন্য আমার খরচ হয়েছে সাড়ে ৭ হাজার টাকা। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ বাদাম বিক্রি হচ্ছে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। এবার স্থানীয় জাতের বাদামবীজ প্রতি মণ ৮ হাজার টাকায় কিনেছি। অথচ গত বছর দাম ছিল ১৬ হাজার টাকা।’

পীরগাছা উপজেলার রহমত চরের কৃষক মো. সোলেমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলতি বছর ১৫০ শতক জমিতে হাইব্রিড জাতের (বারি-৮) বাদাম আবাদ করেছি। ২২ শতক জমি আবাদ করতে খরচ হয়েছে ৫ হাজার টাকা। গত বছরের চেয়ে অর্ধেকেরও কম দামে বীজ কিনতে পারায় এবার ভালো লাভ থাকবে। তবে অতিবৃষ্টি ও নদীর পানি বৃদ্ধির প্রবণতায় এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। ১০-১৫ দিন সময় পেলেই সব জমির বাদাম ঘরে তোলা সম্ভব হবে।’

কাউনিয়া উপজেলার চর নাজিরদহ ইউনিয়নের কৃষক মো. একরামুল হক ৩৬ শতক জমিতে বাদাম আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আগাম আলু তুলে মাঘ মাসে ওই জমিতে স্থানীয় জাতের বাদাম চাষ করেছি। সব মিলিয়ে বীজ লেগেছে ২০ কেজি। আলুর জমি হওয়ায় খুব একটা পরিচর্যা করতে হয়নি। এমনকি সারও কম লেগেছে। তার পরও খরচ হয়েছে প্রায় ৭ হাজার টাকা।’

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, উজানে ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে তিস্তাসহ উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীতে পানি বাড়তে পারে। তবে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা কম।

এ ব্যাপারে রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আরো দুই-একদিন বৃষ্টি হলেও বন্যা পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা নেই।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আহসান হাবিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তিস্তা নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে বৃষ্টিজনিত কারণে। এখানে যেমন বৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি উজানেও বৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে পানি স্থিতিশীল রয়েছে। আগামীতেও পানি বৃদ্ধি পাওয়ার তেমন কোনো পূর্বাভাস নেই।’

সার্বিক বিষয়ে রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চীনা বাদাম চাষ বাড়াতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। এবার জেলায় ২০০ বিঘা জমিতে বাদাম আবাদের জন্য প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষীদের বীজ ও সার প্রণোদনা হিসেবে দেয়া হয়েছে।’

তিস্তা নদীতে পানি বৃদ্ধির কারণে আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রংপুরে পানি সহজে আটকে থাকে না। পানি বৃদ্ধি পেলেই তা অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকায় চলে যায়। তার পরও আমরা চরাঞ্চলগুলোয় খোঁজখবর রাখছি।’

আরও