পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ড তদন্তের জন্য গঠিত জাতীয় স্বাধীন কমিশন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তদন্ত কমিশন বলেছে, বিডিআর হত্যাকাণ্ডে দলগতভাবে জড়িত আওয়ামী লীগ। আর মূল সমন্বয়কারী ছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস।
গতকাল কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান ও অন্য সদস্যরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ প্রতিবেদন জমা দেন।
এ সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জাতি দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকারে ছিল। আপনারা সত্য উদ্ঘাটনে যে ভূমিকা রেখেছেন জাতি তা স্মরণে রাখবে। জাতির পক্ষ থেকে আপনাদের প্রতি ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘ইতিহাসের এ ভয়াবহতম ঘটনা নিয়ে জাতির অনেক প্রশ্ন ছিল, এ কাজের মধ্য দিয়ে সেসব প্রশ্নের অবসান ঘটবে। এ প্রতিবেদনে শিক্ষণীয় বহু বিষয় এসেছে। জাতির জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে এটি।’
কমিশনপ্রধান ফজলুর রহমান বলেন, ‘তদন্তকাজ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও ত্রুটিমুক্ত করার স্বার্থে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব বজায় রাখা হয়েছে। আমরা যখন কাজ শুরু করি তখন ১৬ বছর আগের এ ঘটনার বহু আলামত ধ্বংস হয়ে গেছে। এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকে বিদেশে চলে গেছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা দুটো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছি। সাক্ষীদের ডাকলাম, কারো কারো ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বক্তব্য শুনেছি আমরা। যতক্ষণ তিনি বলতে চেয়েছেন। যারা তদন্তে জড়িত ছিলেন তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের তদন্তের রিপোর্ট কালেক্ট করেছি, অন্যান্য এলিমেন্ট কালেক্ট করেছি। এ তদন্তের মাধ্যমে বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে জনমনে থাকা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে। উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা হয়েছে কার কী ভূমিকা ছিল। কেন সেনাবাহিনী দাঁড়িয়ে থাকল, অ্যাকশন নিল না।’
ফজলুর রহমান বলেন, ‘তদন্তে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সরাসরি জড়িত থাকার শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে।’
এ সময় কমিশনের ফাইন্ডিংস সম্পর্কে তদন্ত কমিশনের সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার বলেন, ‘এ ঘটনার কিছু বাহ্যিক ও প্রকৃত কারণ বের করেছে কমিশন। এ হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত এবং এর পেছনে প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস।’
তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের রক্ষা করতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। তারা ২০-২৫ জনের একটি মিছিল নিয়ে পিলখানায় ঢুকেছে এবং বের হওয়ার সময় সেই মিছিলে দুই শতাধিক মানুষ ছিল। পুরো ঘটনাটি সংঘটিত করার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গ্রিন সিগন্যাল ছিল।’
এ ঘটনার দায় নিরূপণের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, ‘দায় তৎকালীন সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সেনাপ্রধানেরও। এ ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও রয়েছে চরম ব্যর্থতা।’
তিনি বলেন, ‘ওই ঘটনার সময় কিছু প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং কয়েকজন সাংবাদিকের ভূমিকা ছিল অপেশাদার। ওই সময় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যেসব বিডিআর সদস্যের সঙ্গে শেখ হাসিনা বৈঠক করেছেন, তাদের সঠিক নাম-পরিচয় ও তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি।’
কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বেশকিছু সুপারিশ করে, যাতে ভবিষ্যতে বাহিনীগুলোতে এ ধরনের ঘটনা এড়ানো যায় এবং এ ঘটনার ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পান।
তদন্ত কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. সাইদুর রহমান বীরপ্রতীক, অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ, অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি ড. এম আকবর আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন।
এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ ও স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি।
পরে গতকাল রাতে রাজধানীর বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টস (বিআরআইসিএম) মিলনায়তনে গণমাধ্যমের সামনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন এবং নানা প্রশ্নের জবাব দেন কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান। ‘বিডিআর বিদ্রোহের মূল কারণ কী’—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এর অনেকগুলো কারণ ছিল। যেমন ডাল-ভাত কর্মসূচি; বিডিআর শপ নিয়ে বিডিআরের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। তাদের ডিউটি অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এমন অনেক কাজ করতে হতো যা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ত না। আবার কিছু বিডিআর সদস্য যেমনভাবেই প্ররোচিত হয়ে থাকুক, তারা সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের এখানে রাখতে চাইছিল না। বিডিআরের মধ্যেই নানা ধরনের টানাপড়েন ছিল, যা আমরা তদন্তে বের করতে সক্ষম হয়েছি। সে সময় সরকার নিজের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছিল। আবার প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে এবং সেনাবাহিনী ও বিডিআরকে (বর্তমানে বিজিবি) দুর্বল করতে চেয়েছিল।’
প্রতিবেশী দেশ কারা—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ফজলুর রহমান বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশ বলতে আমরা ভারতকে বোঝাচ্ছি, যেখানে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দলবল নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।’
কমিশনপ্রধান বলেন, ‘এ বাহিনীকে দুর্বল করা এবং বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য ষড়যন্ত্র হয়েছিল। ডাল-ভাত কর্মসূচি, বিডিআর শপ, আর্মি অফিসার বিডিআরে কেন কমান্ড করছেন—এসব বিষয় সামনে এনে তা ব্যবহার করা হয়েছে। চক্রান্তটি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে উঠেছে; এটি একদিনে হয়নি। যেমন তাপস এসে মসজিদে বসে মিটিং করেছেন; বিভিন্ন ট্রেনিং গ্রাউন্ডে মিটিং হয়েছে; অন্যদের নিয়ে এসে জুমার নামাজ শেষে মিটিং হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। এটি ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে শুরু হয়ে ২০০৯ সালে গিয়ে ঘটেছে। আমরা তদন্তে পেয়েছি, সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একটি প্রয়াস ছিল।’
সে সময় সেনা অভিযান কেন পরিচালনা করা হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেনা অভিযান না হওয়ার পেছনে কারণ ছিল, সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন সেনা সদর পরিত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চলে যান। সেখানে তিনি সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ছিলেন। ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। অফিসারদের লাশ বের হয়ে আসার তথ্য জানানো হলেও তিনি সেখান থেকে আর সেনা সদরে ফিরে যাননি। নৌ ও বিমান বাহিনীপ্রধানও সেখানে ছিলেন। ওই সময় পিলখানায় বিডিআরদের কমান্ড করার মতো কোনো অফিসার ছিল না। কাজেই তখন সেনা অভিযান চালালে বিডিআররা পরাজিত হতো—কিন্তু তা করা হয়নি। কারণ এটি ছিল একটি ষড়যন্ত্র এবং সেভাবেই অফিসারদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। দুইদিনে যদি একটি দেশের ৫৭ জন সেনা অফিসারকে হত্যা করা হয়, তাহলে সে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব আর থাকে না।’
বিডিআর বিদ্রোহে গোয়েন্দা ব্যর্থতা কমিশন পেয়েছে কিনা—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘গোয়েন্দা ব্যর্থতা পর্বতসম ছিল। তবে কীভাবে এটিকে কাটিয়ে ওঠা যায় এবং আমরা কীভাবে আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি, সে বিষয়ে সাজেশন দেয়া হয়েছে। সংস্কারের কথাও বলা হয়েছে; আমাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তা তুলে ধরা হয়েছে। তাছাড়া জেনারেল মঈন অনলাইনে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন, সে সময় পিলখানায় সেনা অভিযান পরিচালনা করলে ভারত হস্তক্ষেপ করত এবং একাত্তরে তারা ফিরলেও এবার তারা আর ফিরত না। গোয়েন্দা সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য যা যা করা যায়, তার সুপারিশ করেছি।’
কমিশনপ্রধান বলেন, ‘ওই সময় প্রায় ৯২১ জন ভারতীয় বাংলাদেশে ঢুকেছিল। এর মধ্যে ৬৭ জনের হিসাব মেলেনি। আমরা সরকারকে বিষয়টি অনুসন্ধানের সুপারিশ করেছি। এছাড়া ভারত যে জড়িত ছিল, সে বিষয়ে সরকারকে ভারতের কাছে জবাব চাওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিডিআর বিদ্রোহের সময় ৪৬ ব্রিগেড সময়মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সেনাবাহিনী প্রধান যখন সদর দপ্তর থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চলে যান, তখন একটি প্যারালাল কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর সুযোগ নেন জেনারেল তারেক সিদ্দিকী। ওই সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর এমএসপিএম ছিলেন। ধীরে ধীরে যখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছিল, তখন সেনাবাহিনীকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পেছনে আবাহনী মাঠের দিকে সরিয়ে নেয়া হয়।’
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে কমিশনের কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা দেন কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা মোট ২৪৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করছি। তাদের মধ্যে শহীদ পরিবারের সদস্য ১৪ জন, রাজনৈতিক ব্যক্তি ১০, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা দুজন, সামরিক কর্মকর্তা ১৩০, বেসামরিক কর্মকর্তা চার, পুলিশ কর্মকর্তা ২২, বেসামরিক ব্যক্তি নয়জন, সাবেক ও বর্তমান বিডিআর-বিজিবি সদস্য ২২, কারাগারে আটক ২৬, জাতিসংঘ আবাসিক সমন্বয়কারী একজন এবং সাংবাদিক তিনজন।’