নির্বাচন কমিশন (ইসি) পাঁচ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের আয়োজন করতে চায়। কমিশনের সদস্য এবং নির্বাচন পরিচালন ও ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, আগের সাত ধাপে নির্বাচনের রূপরেখা থেকে সরে এসে পাঁচটি ধাপে আগামী মের মধ্যে ইউপি নির্বাচন সম্পন্ন করতে চায় ইসি। এছাড়া এবার আলাদা কোনো ‘রিজার্ভ ধাপ’ রাখা হচ্ছে না। তবে কোনো কারণে যেসব কেন্দ্রে বা ইউপিতে ভোট গ্রহণ ব্যাহত হবে, সেগুলো জুনের শেষে বিশেষ ধাপে সম্পন্ন করা হবে।
এদিকে নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণে আজ প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে সভায় বসবে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের উপসচিব মো. শাহ্ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ সভায় নির্বাচনের সময়সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
তারিখ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে, তৃতীয় সপ্তাহে ও শেষ সপ্তাহে কিংবা প্রয়োজনে ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে প্রথম তিন ধাপের ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া মে মাসের ৬ ও ১৭ তারিখে আরো দুই ধাপের ভোটের প্রস্তাব জানানো হয়েছে। তবে সব দিক বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কমিশন সভার আলোচনায় নেয়া হবে। সেক্ষেত্রে ভোটার তালিকা বিতরণ, ব্যালট পেপার পৌঁছানো, অন্যান্য সক্ষমতার দিক দেখে এবং এক ধাপ থেকে অন্য ধাপের প্রয়োজনীয় বিরতি বিবেচনা করে বৈঠকে ভোটের সুনির্দিষ্ট তারিখ ও স্লট চূড়ান্ত হবে।
এর আগে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কমিশন সদস্য বলেন, ‘আমি এখনো ডিটেইল প্ল্যানটা জানি না। মিটিংয়ে যা সিদ্ধান্ত হবে সেটাই চূড়ান্ত। তবে রমজান মাসের আগে আমরা তিনটা ফেজ কমপ্লিট করার চেষ্টা করব, পারব কিনা জানি না। জুনে অনুষ্ঠিতব্য এইচএসসি পরীক্ষার আগেই সব শেষ করা সম্ভব হবে কিনা তাও নিশ্চিত নই।’
সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত জানানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে এ সদস্য বলেন, ‘আলাদা করে জানানোর মতো তেমন কিছু নেই। মিডিয়ার মাধ্যমেই সরকার ও কমিশনের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে। আমরা যা বলছি আপনাদের মিডিয়ায় বলছি। তারাও মিডিয়ায় বলছে। আমাদের মিডিয়ার মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে।’
ইউপি নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ ও উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ১৩তম সভা আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ইসি সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, আজ কমিশন সভা শেষে ইউপি নির্বাচনের চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করা হবে এবং বৈঠকের পর বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে। এ নিয়ে ইসির উপসচিব মো. শাহ্ আলম নিশ্চিত করে জানান, ইসির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আজ সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে সিইসির সভাপতিত্বে তার সভাকক্ষে সব কমিশনার ও ইসি সচিবের উপস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
রমজানের আগে নির্বাচনের পরিকল্পনা নিয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রমজান যদি ফেব্রুয়ারির ৭/৮ তারিখে শুরু হয়, তাহলে আমরা তিনটা ধাপে প্রতি ফেজে ৮০০ করে কমপক্ষে দুই-আড়াই হাজার ইউনিয়নে নির্বাচন করার চেষ্টা করব। আর সেটা ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখের মধ্যেই। অর্থাৎ ৬ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে করতে চেষ্টা করব।’
তিনি বলেন, ‘এবার আমরা পাঁচটা ধাপে ইউপি নির্বাচন করতে চাচ্ছি। গতবার যে সাত ধাপের মধ্যে দুই ধাপ রিজার্ভ রাখার পরিকল্পনা ছিল, সেটা এবার রাখতে চাচ্ছি না। তবে রিজার্ভ এমনিই একটা হয়ে যাবে। যেগুলোতে মামলা, সীমানাসহ অন্যান্য আইনি ইস্যু থাকবে বা কোনো কারণে করা না গেলে ওইটা আরেকটা ধাপে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ভোটার তালিকা ছাড়তে কতদিন লাগে, ব্যালট পেপার ছাড়তে কতদিন লাগে, এক ধাপ থেকে আরেক ধাপের ব্যবধানটা কতদিন হলে ভালো হয়—এসব বিবেচনা করে কালকে (আজ) ঠিক করব একটা নির্বাচন থেকে আরেক নির্বাচনের মধ্যবর্তী দূরত্ব। তবে তারিখগুলো আমরা মিডিয়ায় ঘোষণা নাও দিতে পারি।’
গত ১৪ সেপ্টেম্বর কমিশনের প্রাক-প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক পরিকল্পনা প্রকাশ করেন ইসি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। বিভিন্ন বার্ষিক পরীক্ষা ও ধর্মীয় উৎসব বিবেচনা করে ১২ নভেম্বর শুরু করে ২৭ মের মধ্যে ভোট গ্রহণের সেই প্রাথমিক সূচি তৈরি করা হয়। তিনি বলেছিলেন, দেশের মোট ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ২৭২টিতে আইন অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের বাধ্যবাধকতার কারণে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করতে হচ্ছে।
পরবর্তী সময়ে প্রতিক্রিয়ায় সরকারের বিভিন্ন পক্ষ থেকে তারিখ নিয়ে ইসির সঙ্গে সমন্বয়হীনতার কথা বলা হলে ইসি জানায়, ঘোষিত তারিখ চূড়ান্ত কিছু নয়। এরপর ইসি ও সরকার উভয় পক্ষ থেকেই বলা হয়, আগামী বছরের জানুয়ারিতে ইউপি নির্বাচন শুরু হয়ে জুনে শেষ হবে।
চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া ৪ হাজার ৩১০ ইউপিতে ১৮০ দিন আগে নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নিয়ে জানতে চাইলে ইসি মাছউদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সময়টা তো একদিকে বাধ্যতামূলক, আবার একদিকে পরিস্থিতির বাস্তবতার কারণেই এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। পূর্বে প্রস্তুত করা খসড়া সময়সূচির পর শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পরীক্ষা, বিশেষ করে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার সময়সূচি সামনে আসে। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে কারণেই ভোটের সময় কিছুটা পিছিয়ে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর পরই দ্রুততম সময়ে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এজন্যই এখন আমরা যত তাড়াতাড়ি পারি নির্বাচন করতে চাচ্ছি।’