আমনের মৌসুম ঘিরে বেশ কিছুদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন জেলায় ডিলার পর্যায়ে সার না পাওয়া এবং অতিরিক্ত দামে খুচরা বাজার থেকে কেনার অভিযোগ করছিলেন কৃষকরা। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই সারের সংকট নেই বলা হচ্ছে। এরই মধ্যে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সার না পাওয়ার অভিযোগে কৃষকরা জোট বেঁধে ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে ১৯৭ বস্তা বা ৯ হাজার ৮৫০ কেজি ইউরিয়া সার নিয়ে যান। গতকাল দুপুরের দিকে উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের ডিলার মেসার্স শাহ আমানত ট্রেডার্সের গুদামে এ ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনার পর পুলিশের তৎপরতায় ৩৩ কৃষক ৩৩ বস্তা সার ফেরত দিয়েছেন। তবে বাকি সার উদ্ধারে কাজ করছে পুলিশ।
কৃষকদের অভিযোগ, কয়েকবার শাহ আমানত ট্রেডার্সের মালিক তাইফুর রহমান মুকুলের ডিলার পয়েন্টে গিয়েও তারা সার পাননি। ডিলারের গুদামে সার না থাকলেও খোলাবাজারে বেশি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সকাল থেকে ডিলার পয়েন্টে দুই শতাধিক কৃষক সারের জন্য জড়ো হন। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও ডিলার পয়েন্ট না খোলায় কৃষকরা গুদামের দরজা ভেঙে ইউরিয়া সার নিয়ে যান। পরে পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল জব্বার জানান, চলতি মাসে উপজেলার প্রত্যেক ইউনিয়নের মতো শিলখুড়ি ইউনিয়নেও ১ হাজার ৩৬০ বস্তা ইউরিয়া, ১৭৭ বস্তা ডিএপি ও ৮৪ বস্তা টিএসপি সার বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে ওই ডিলার ১ হাজার ২০ বস্তা ইউরিয়া সার উত্তোলন করে কৃষকদের সরবরাহ করেছেন। চলতি মাসে শেষ কিস্তিতে বরাদ্দের বাকি ৩৪০ বস্তা উত্তোলন করে গুদামে সংরক্ষণ করেন। মাসের বরাদ্দ অনুযায়ী ডিলার সব সার উত্তোলন করেছেন বলে জানান তিনি।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, জেলায় চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ করা হচ্ছে। চলতি মাসে জেলায় ৫ হাজার ৮৭৫ টন ইউরিয়া, ৯২৪ টন টিএসপি, ১ হাজার ৫৭২ টন ডিএপি ও ১ হাজার ৬৪৮ টন এমওপির চাহিদা ছিল। সে অনুপাতে ডিলারদের কাছে সরবরাহও করা হয়েছে। তার পরও কোনো ইউনিয়নে চাহিদা বেশি থাকলে অন্য ইউনিয়ন থেকে তা পূরণ করা হয়। এর পরও এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটল। ওই ডিলার পয়েন্টে সার মজুদ ছিল। তবে আগামী মাসের বরাদ্দ চলতি মাসের চেয়ে আরো বেশি রয়েছে বলে জানান জেলা কৃষি কর্মকর্তা।
ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সার না পাওয়ার শঙ্কা থেকে কৃষকরা গুদাম থেকে ১৯৭ বস্তা সার নিয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাদের থামায়। এরই মধ্যে (গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত) ৩৩ কৃষক ৩৩ বস্তা সার ফেরত দিয়ে গেছেন। বাকিগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।’
তবে এ বিষয়ে ডিলার তাইফুর রহমানের মন্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে দেশে সারের চাহিদা ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টন। এর মধ্যে ইউরিয়া ২৬ লাখ ২২ হাজার, টিএসপি ৯ লাখ ১ হাজার ৫০০, ডিএপি ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০ ও এমওপি ৯ লাখ ৭০ হাজার টন। এছাড়া অন্যান্য সারের চাহিদা নিরূপণ করা হয়েছে ৯ লাখ ২১ হাজার ৩০০ টন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, চলতি আগস্টে সারের জাতীয় বরাদ্দ ছিল ৫ লাখ ১৪ হাজার ৪০০ টন। এর মধ্যে ইউরিয়ার বরাদ্দ ২ লাখ ৭৯ হাজার ৪০০ টন। এছাড়া টিএসপির ৬৮ হাজার ৭০০ টন, ডিএপির ৮৮ হাজার ৭০০ ও এমওপির বরাদ্দ ছিল ৭৭ হাজার ৬০০ টন। তবে ১২ আগস্টের এক প্রতিবেদনে বরাদ্দের চেয়েও বেশি সার বিতরণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়। ওই সময় পর্যন্ত বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলার পর্যায়ে ৫ লাখ ৮৪ হাজার ৯০০ টন সার বিতরণ করা হয়েছে।
সরকারিভাবে ইউরিয়া সার উৎপাদন, আমদানি ও বিতরণ করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। আর নন-ইউরিয়া (ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি) আমদানি ও বিতরণ করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। ইউরিয়ার জন্য বিসিআইসি আর নন-ইউরিয়ার জন্য ডিলার নিয়োগ দিত বিএডিসি। তবে নতুন নীতিমালার অধীনে এসব ভিন্ন ডিলারশিপ প্রথা বাতিল করা হয়েছে। নতুন নীতিমালায় সব ডিলারের নিয়ন্ত্রণ কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেয়া হয়েছে এবং একই ডিলার ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া উভয়ই বিতরণের বিধান রাখা হয়েছে। একই নীতিমালার অধীনে খুচরা বিক্রেতা পদ্ধতি বাতিল করে ডিলারের অধীনে বিক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগের রীতি চালুর কথা বলা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, নতুন নীতিমালার ফলে অনেক পুরনো ডিলার বাদ পড়তে পারেন। আবার অনেক খুচরা বিক্রেতা নতুন করে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত হওয়ার সুযোগ বঞ্চিত হতে পারেন। এ আশঙ্কায় নতুন নীতিমালা নিয়ে অনেকে অসন্তুষ্ট। তাদের কেউ কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন। নতুন নীতিমালার অধীনে ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিও দেয়া হয়েছে। আবেদনের শেষ সময় ৩১ আগস্ট।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সারের সংকটটি কৃত্রিম। তারা সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে এসব করছেন। কিছু ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা কৃষককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ফায়দা তুলতে চাচ্ছেন।’
দেশে এখন আমনের মৌসুম চলছে। বেশকিছু দিন ধরে কয়েকটি জেলায় সার সংকটের অভিযোগ করছিলেন কৃষকরা। সেখানে সরকার নির্ধারিত দামে সার না পাওয়ার অভিযোগ ছিল কৃষকের। কৃষক পর্যায়ে প্রতি বস্তা সারের দাম ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।
এরই মধ্যে ঠিকমতো সার মনিটরিংয়ে গাফিলতি পাওয়ার অভিযোগে রাজশাহী, জয়পুরহাট ও মেহেরপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালককে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে বলে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন কৃষি সচিব মো. সেলিম খান।
তিনি বলেন, ‘দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। আমরা সঠিক তথ্য ও দায়িত্ব নিয়েই বলছি। কুড়িগ্রামের ঘটনাটি পরিকল্পিত। সেখানে পর্যাপ্ত সার ছিল। আর ছিল বলেই তারা পেয়েছে। এখনো ওই গুদাম সারে ভর্তি। এটি পূর্বপরিকল্পিত, যেখানে ইউরিয়া সারের কোনো ক্রাইসিসই নেই। অন্য সারেরও নেই। সেখানে বস্তা বস্তা ইউরিয়া নিয়ে গেছে। এখন আবার ওই সার ফেরত দিচ্ছ। সার না থাকলে তারা নেয়ার জন্য কীভাবে পেল? সারের সরবরাহসহ সামগ্রিক বিষয় মনিটরিংয়ের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে উচ্চপর্যায়ের কমিটি করা হয়েছে। সেখানে দুজন করে জয়েন্ট সেক্রেটারি ও দুজন করে ডেপুটি সেক্রেটারি রয়েছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে এখানে পরিবর্তন দেখতে পাবেন আশা করি।’
যারা সংকট সৃষ্টি করছে তাদের বিষয়ে পদক্ষেপের বিষয়ে কৃষি সচিব আরো বলেন, ‘যেখানে যেখানে মনিটরিংয়ে আমাদের কোনো অফিসারের গাফিলতি পাচ্ছি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। গতকাল (শনিবার) তিনজনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করেছি। অভিযুক্ত ডিলারদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসকরা জেলা সার মনিটরিং কমিটির সভাপতি। তাদের তদন্ত করে ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি