সরকারি হিসাব অনুযায়ী কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ১৬ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত মৃতের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫০-এ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ তথ্য জানান। তবে বিভিন্ন হাসপাতাল, নিহতদের স্বজন, পুলিশসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বেসরকারি সূত্রগুলোর হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত অন্তত ২১১ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা গেছে।
এ তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হয়েছেন বাবুল হাওলাদার (৫০)। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত রোববার রাতে তার মৃত্যু হয়। তিনি ঢামেকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। পেশায় রঙমিস্ত্রি বাবুল ১৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর হাতিরঝিল থানা এলাকার পলাশবাগ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন বলে হাসপাতালসংলগ্ন পুলিশ ফাঁড়ি সূত্রে জানা গেছে। মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার আপোর পশ্চিমপাড়া গ্রামের জাবেদ আলীর ছেলে বাবুল রাজধানীর রামপুরার উলন নারিকেলবাগ আবাসিক এলাকায় পরিবার নিয়ে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার শ্যালক সাজু ব্যাপারী জানিয়েছেন, বাম হাত ও গলার নিচে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন বাবুল। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
১৬ জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং একে ঘিরে ঘটে যাওয়া বিক্ষোভ-সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত মৃতদের মধ্যে শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক ও নিহতদের স্বজনরা জানিয়েছেন, মৃতদের অনেকেই সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে বা গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। একই সঙ্গে হাসপাতালে পৌঁছার কিছুক্ষণের মধ্যে মারা গেছেন বেশ কয়েকজন। এছাড়া গত কয়েক দিনে রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও মৃত্যু হয়েছে অনেকের।
রাজধানীর একটি বড় সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যেসব ব্যক্তি সংঘর্ষের দিনগুলোয় ভর্তি হয়েছিলেন, তাদের সিংহভাগকেই চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। কিছু মানুষ এখনো হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে কারো কারো অবস্থা সংকটাপন্ন। এখনো প্রাণ নিয়ে সংশয় রয়েছে কয়েকজনের।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১৫০। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ তথ্য জানান। এর আগে রোববার সচিবালয়ে মৃতের সংখ্যা ১৪৭ বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন তিনি। গতকাল এ তালিকায় যুক্ত হওয়া তিনজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
কোটা সংস্কার আন্দোলন সহিংস রূপ পাওয়ার পর রোববারই সরকারের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম মৃতের সংখ্যা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ওই সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারিভাবে রোববার পর্যন্ত ১৪৭ জনের মারা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে শিক্ষার্থী, পুলিশ সদস্যসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছে। এখনো অনুসন্ধান চলছে। এরপর যদি মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে সংখ্যাটি বাড়তে পারে।’
দ্বিতীয় দফায় কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয় চলতি মাসে। এর মধ্যে ১৪ জুলাই পর্যন্ত আন্দোলন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল। আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার সূত্রপাত ঘটে ১৫ জুলাই। ওইদিন পুলিশসহ ক্ষমতাসীন দল এবং এর অঙ্গ ও ভাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। হামলায় আহত হন তিন শতাধিক। ১৬ জুলাই ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রংপুরে ছয়জনের মৃত্যু হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বন্ধ ঘোষণা করা হয় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু সহিংসার তীব্রতা ও ব্যাপ্তি বাড়তে থাকে। ১৮ জুলাই সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি দেন আন্দোলনকারীরা। এদিন মৃত্যু হয় ২১ জনের। ওইদিন রাতেই সারা দেশে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেয় সরকার।
আন্দোলন ঘিরে সর্বোচ্চ প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায় ১৯ জুলাই। ওইদিন সারা দেশে অন্তত ৫৮ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে রাজধানীতেই প্রাণ হারায় ৪৯ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০ জুলাই অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে সরকার। সারা দেশে মোতায়েন করা হয় ২৭ হাজার সেনা। কারফিউর প্রথম দুদিনেও সারা দেশে প্রাণক্ষয়ী সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটে। তবে আহত অনেকেই গত কয়েক দিনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। সব মিলিয়ে ২৯ জুলাই পর্যন্ত অন্তত ২১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।