গৃহহীনদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চর রমণী মোহন ইউনিয়নের মেঘনা নদীর পাড়ে গুচ্ছগ্রামে টিনশেড ব্যারাক নির্মাণ করে সরকার। ২০০১ সালে নির্মিত টিনশেড ঘরে ৪০টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। তবে নির্মাণের পর দুই যুগের বেশি সময় পার হলেও ঘরগুলো আর সংস্কার করা হয়নি। সব ঘরই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে ১০টি পরিবার ঘর ছেড়ে চলে গেছে। তবে বাসযোগ্য বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বছরের পর বছর মানবেতর জীবন যাপন করছেন বাকি ৩০টি পরিবারের দেড় শতাধিক মানুষ।
গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, একদিকে মেঘনা নদীর ভাঙন, অন্যদিকে চালহীন অবকাঠামো। নেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা। ২৫ বছরেও ঘরগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তবে শুধু গৃহনির্মাণ করাই যথেষ্ট নয়, মৌলিক সুবিধা সংযোজন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে সেনাবাহিনীর অধীনে চর রমণী মোহন ইউনিয়নের মজুচৌধুরীরহাট থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পশ্চিমে মেঘনার পাড়ে নির্মাণ করা হয় টিনশেড ব্যারাক। ভূমি ও গৃহহীন ৪০টি পরিবারকে সেখানে পুনর্বাসন করা হয়। বসবাসরত এসব পরিবারের প্রধান জীবিকা মৎস্য শিকার ও কৃষিকাজ। সন্তানদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিতে ওই গ্রামেই নির্মাণ করা হয় একটি স্কুল ও যাতায়াতের সড়ক। তবে ২৫ বছর পরও গুচ্ছগ্রামের ঘরগুলো সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার। ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে ঘরগুলোর ভৌত অবকাঠামো। কেউ কেউ পলিথিন টানিয়ে রোদ-বৃষ্টিতে দিন পার করছেন।
বর্ষায় মেঘনার ভাঙনের কবলে রয়েছে গুচ্ছগ্রামের ঘরগুলো। এরই মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে গ্রামের বেশকিছু জমি ও প্রকল্পের পাশে থাকা গাছপালা। ভাঙন আতঙ্কে রয়েছেন গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা।
সরজমিনে দেখা গেছে, গ্রামটিতে নেই চিকিৎসার সুব্যবস্থা, সুপেয় পানির ব্যবস্থাও নেই। অকেজো হয়ে পড়েছে দুটি নলকূপ। জোয়ারে ভেঙে গেছে যাতায়াতের সড়কটিও। প্রাকৃতিক দুর্যোগে স্কুলের অবকাঠামো ভেঙে পড়ায় ১০ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম।
গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা জানান, স্কুলটি বন্ধ থাকায় কয়েক মাইল পাড়ি দিয়ে ছেলেমেয়েদের অন্যত্র পড়ালেখা করতে যেতে হয়। অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত তারা।
আবুল কালাম, খোরশেদ ও আলাউদ্দিনসহ কয়েকজন বলেন, জোয়ারে আমাদের ঘরগুলোর মেঝে ও টিনের বেড়া ক্ষয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। তীব্র ভাঙনে ঘরের কোণে চলে এসছে নদী। দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও সংশ্লিষ্টরা এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। প্রকল্প প্রণয়নের সময় সঠিক পরিকল্পনা করা হলে হয়তো আমাদের এ দুরবস্থা দেখতে হতো না।
কুলছুম বেগম ও সফুরা বিবি বলেন, স্বামী-সন্তান নিয়ে ভাঙা ঘরে থাকছি। বর্ষায় ঘরে থাকা যায় না। আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।
রতন ও বারেক নামে গুচ্ছগ্রামের আরো দুই বাসিন্দা বলেন, ‘গুচ্ছগ্রামের মানুষ বলে আজ আমরা অবহেলিত। একে তো ভাঙা ঘর, তার ওপরে জোয়ারে রাস্তাও ভেঙে গেছে। কয়েক কিলোমিটার ঘুরে মজুচৌধুরীরহাট যেতে হয়। আমাদের ভোগান্তির শেষ কোথায়?
চর রমণী মোহন গুচ্ছগ্রামের সভাপতি আবদুল ব্যাপারী বলেন, নদীতে ভেঙে গেছে গ্রামের অনেকাংশ, ঘরগুলো একেবারেই হুমকির মুখে। আমরা খুব কষ্টে দিন পার করছি। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।’ ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধসহ পাকা ঘর নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
চর রমণী মোহন গ্রামের আইনজীবী মো. সজিব হোসেন বলেন, ‘২৫ বছর আগে গৃহহীন ৪০টি পরিবারকে মেঘনার পাড়ে গুচ্ছগ্রামে আশ্রয় দেয় সরকার। ওই সময় সুবিধাভোগী পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিতে একটি সেমি পাকা স্কুল ঘর নির্মাণ করা হয়। একজন শিক্ষক দ্বারা পাঠ কার্যক্রমও শুরু করে। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিকূলতায় স্কুলটি ভেঙে পড়লে শিক্ষকও চলে যান। গত ১০ বছর ধরে গ্রামের শিশুরা শিক্ষাবঞ্চিত। যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় স্বাস্থ্যসহ নাগরিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত তারা।’
জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত জেলার রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি, কমলনগর ও সদর উপজেলায় তিন ধাপে ২৩৭টি সরকারি ব্যারাক নির্মাণ করা হয়েছে। ভূমিহীন প্রায় ১ হাজার ৯৯০টি পরিবারকে এসব ব্যারাকে পুনর্বাসন করেছে সরকার। তবে এর মধ্যে রামগতি উপজেলার চর গজারিয়া এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৯০টি ব্যারাক মেঘনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে ৯০০টি পরিবার।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক রাজীব কুমার সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নদীভাঙনের ঝুঁকি এড়াতে ও জরাজীর্ণ ঘর সংস্কারসহ মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গুচ্ছগ্রামের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে প্রশাসন যথেষ্ট আন্তরিক।’