নাগরিক প্লাটফর্মের প্রাক-বাজেট সংলাপে বক্তারা

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট তাদের সক্ষমতার পরীক্ষা

বাজেটের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আয়, ভোগ ও সম্পদের বৈষম্য কমানো। শুধু কর সংগ্রহ নয়, মানুষের আয় ও সক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই কর ব্যবস্থার মূলনীতি হওয়া উচিত।

বাস্তবায়ন ব্যবস্থার দুর্বলতা ও দুর্নীতির কারণে অনেক সময় বরাদ্দ থাকলেও তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যায় না। তাই নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হবে তাদের সক্ষমতার পরীক্ষা।

গতকাল রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত এক প্রাক-বাজেট সংলাপে অর্থনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, শিক্ষক ও নীতিনির্ধারকরা এমন অভিমত দেন। ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক ওই প্রাক-বাজেট সংলাপের আয়োজন করে ‘এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্ম, বাংলাদেশ’। এতে বক্তারা বাজেট বাস্তবায়ন, রাজস্ব সংস্কার, বৈষম্য হ্রাস ও সুশাসন নিয়ে বিভিন্ন মতামত তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘আগামী বাজেটে সরকারের অগ্রাধিকার থাকবে পিছিয়ে পড়া মানুষ, বিশেষ করে গ্রামীণ ও শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, নারী ও শিশুদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সরকারের লক্ষ্য বৈষম্যহীন একটি ইনক্লুসিভ সোসাইটি গড়ে তোলা।’ তিনি জানান, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে ৪০ লাখ ২০ হাজার পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে নারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে, যাতে পরিবারে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ে। ভবিষ্যতে “ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড” ব্যবস্থার পরিকল্পনা রয়েছে।’ তিনি প্রকল্প সময়মতো সম্পন্ন করার ওপরও গুরুত্ব দেন। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, শিশু শ্রম, বাল্যবিবাহ ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধেও আগামী বাজেটে গুরুত্ব বাড়ানো হবে বলে জানান সমাজকল্যাণমন্ত্রী।

সভাপতির আলোচনায় সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আগামী বাজেট হবে অর্থনীতির জন্য একটি বড় পরীক্ষা। বৈদেশিক ঋণ, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কারণে এটি কঠিন হবে।’ তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার, বিনিময় হার স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।’

বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মো. সাইফুল আলম খান মিলন বাজেট, দুর্নীতি, ব্যাংকিং ও জ্বালানি খাত নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। কর ও ভ্যাট ফাঁকি দিতে সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার ভূমিকা রয়েছে।’ তিনি কর আদায় ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়াতে দুই থেকে তিন বছরের বিশেষ কর্মসূচির প্রস্তাব দেন এবং কর ফাঁকি রোধে ডিজিটাল সলিউশন ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা জরুরি বলে মন্তব্য করেন।

সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবিবা বলেন, ‘এবারের বাজেট উচ্চাভিলাষী নয়, বরং এটি সংকট ব্যবস্থাপনা ও স্থিতিশীলতা রক্ষার বাজেট। তিনি বলেন, ‘বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং বাস্তবায়ন ব্যবস্থার দুর্বলতা ও দুর্নীতির কারণে অনেক সময় বরাদ্দ থাকলেও তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যায় না।’

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাজেটের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আয়, ভোগ ও সম্পদের বৈষম্য কমানো। এজন্য বেশি আয়ের মানুষের ওপর বেশি কর আরোপ এবং কম আয়ের মানুষের জন্য সরকারি ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে সম্পদের পুনর্বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় জনগণ যে পরিমাণ কর দেন এবং সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব পায়—এ দুইয়ের মধ্যে বড় একটি ফারাক রয়েছে, যা দুর্নীতির প্রতিফলন।’ এ ব্যবধান কমাতে পারলে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. একে এনামুল হক বলেন, ‘কর ব্যবস্থার মূলনীতি হওয়া উচিত মানুষের আয় ও সক্ষমতাকে কেন্দ্র করে, শুধু কর সংগ্রহ নয়, বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয়ের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে সব বরাদ্দ পুরোপুরি ব্যয় হয় না। ফলে ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবায়নের পার্থক্য থেকে যায়।’

বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, ‘দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও অপচয়ের কারণে অনেক খাতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে একই অর্থ দিয়ে অনেক বেশি ফল পাওয়া সম্ভব হতো।’ বাজেট বাস্তবায়ন ও দক্ষ ব্যয় ব্যবস্থাপনাকে তিনি প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মির মতে, বাজেট বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকারের ঘাটতি, কর আতঙ্ক ও এনবিআরের দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি করজাল সম্প্রসারণে শিক্ষার্থী সম্পৃক্ততা, সহজ রিটার্ন ব্যবস্থা ও কর সংস্কারের প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি ঋণ ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প ডিজাইন, অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ আস্থার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘এটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট, তাই জনগণ এবং বাজার—দুই পক্ষই খুব নিবিড়ভাবে এটি পর্যবেক্ষণ করবে। এটি শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্যতা, সংস্কার সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার পরীক্ষা।’

আরও