ইশতিয়াক আবেদিন

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি

উচ্চ শিক্ষায় বৈশ্বিক মান: বাংলাদেশের করণীয় শীর্ষক সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ এ আয়োজনের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই। আমি নির্ধারিত বিষয়ে (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: উন্নয়ন ও প্রবিধান)

উচ্চ শিক্ষায় বৈশ্বিক মান: বাংলাদেশের করণীয় শীর্ষক সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ এ আয়োজনের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই। আমি নির্ধারিত বিষয়ে (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: উন্নয়ন ও প্রবিধান) আলোকপাত করার সঙ্গে সঙ্গে আরো কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই, যার মধ্যে আছে পিএইচডি প্রোগ্রাম পরিচালনার অনুমোদনের বিষয়টি।

আপনারা জানেন যে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম কাজ হচ্ছে গবেষণার মাধ্যমে নতুন উদ্ভাবন বা নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি করা। সক্ষমতার বিচারে বাংলাদেশের বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে সক্ষম হলেও পিএইচডি প্রোগ্রাম পরিচালনার অনুমোদন না থাকায় অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। যথাশিগগির সম্ভব পিএইচডি প্রোগ্রাম অনুমোদন করা হলে উন্নত গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে সক্ষম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য অবদান রাখার সমান সুযোগ সৃষ্টি হবে। এক্ষেত্রে নির্ধারিত স্কোরিং পদ্ধতি ও নিরীক্ষা মানদণ্ডে উত্তীর্ণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিএইচডি প্রোগ্রাম পরিচালনা করবে। এ ব্যাপারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি যথাযথ ভূমিকা পালন করবে।

অন্য একটি বিষয় হলো সেমিস্টার পদ্ধতি: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে তিন সেমিস্টার পদ্ধতি প্রচলিত। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তিন সেমিস্টার পদ্ধতি সমূলে পরিবর্তন করার একক সিদ্ধান্ত জটিলতার সৃষ্টি করেছে বিধায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে দুই ও তিন সেমিস্টার উভয় পদ্ধতি বহাল রাখার সুপারিশ করছি।

ভ্যাট, ট্যাক্স আরোপের মতো দ্বৈতনীতি: আইন দ্বারা স্বীকৃত অলাভজনক উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে উপর্যুপরি ভ্যাট, ট্যাক্স আদায়ের ঘটনা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা ব্যতীত কেবল টিউশন ফি থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়মিত পরিচালনা ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি ক্যাম্পাস নির্মাণ, বর্ধিতকরণ, ল্যাব-লাইব্রেরি সম্প্রসারণের মতো অত্যাবশ্যকীয় সব কাজ করতে হয়। এ অবস্থায় কর প্রত্যাহার করা না হলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে, শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আশা করি, সমস্যাটির আশু সুরাহা হবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: উন্নয়ন ও প্রবিধান” প্রসঙ্গে বলতে গেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকাল থেকে আজ পর্যন্ত ৩০-৩২ বছরের পথচলার নানা অর্জন, সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা আসে। আমি বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে সংক্ষেপে বলতে চাই।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়-বিশ্বের নামিদামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শতবছরের ইতিহাসের বিপরীতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাত্র তিন দশকের পথচলায় জাতি গঠনে যে ভূমিকা বা জাতীয় অর্থনীতিতে যে অবদান রয়েছে, তা খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যার সীমাবদ্ধতার বিপরীতে উচ্চ শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটাতে শিক্ষানুরাগী উদ্যোক্তারা নিজস্ব তহবিল দিয়ে অলাভজনক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। বর্তমানে দেশে ১১৪টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় চার লাখ শিক্ষার্থী বিশ্বমানের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের বিদেশ গমনের প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে ও মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি মেধা পাচারও রোধ হয়েছে। উপরন্তু অনেক বিদেশী শিক্ষার্থী বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও অবদান রাখছে। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা ও পেশাজীবী তৈরিসহ বিপুল জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে।

টপিকের দ্বিতীয় অংশে উল্লেখ্য ‘উন্নয়ন ও প্রবিধান’ বিষয়ে আমি মনে করি, উন্নয়নের পূর্ব শর্ত হলো ইতিবাচক বিধিবিধান ও আইন দ্বারা স্বীকৃত কর্মকাণ্ড, যা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এবং সব ধরনের বৈষম্য ও যেকোনো দ্বৈতনীতির ঊর্ধ্বে। নব্বই দশকে নতুন অবস্থায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যে আইন প্রণয়ন করা হয়, সময়ের পরিক্রমায় সে আইন কয়েকবার পরিবর্তন করা হলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে তা সহায়ক হয়নি। নতুন করে আবার পরিবর্তন করার তাগিদ দেখা দিয়েছে। মাত্র ৩০ বছরের ব্যবধানে বারবার আইন পরিবর্তন করার চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও সত্যিকার অর্থে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে সেটি কাজে আসছে না। এর অন্যতম কারণ, প্রকৃত সমস্যা ও তার সঠিক সমাধান নির্ণয়ে অংশীজন হিসেবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করা। বাস্তবিক অর্থে, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সমস্যা বা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। এ সম্মেলন থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও কার্যকর করার লক্ষ্যে অংশীজনের সঙ্গে নিবিড় আলোচনার আহ্বান জানাই।

এ পর্যায়ে আজকের উচ্চ শিক্ষা সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ‘উচ্চ শিক্ষায় বৈশ্বিক মান: বাংলাদেশের করণীয়’ বিষয়ে কিছু সুপারিশ উল্লেখ করতে চাই:

১. পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন: বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিকুলাম পুনর্গঠন, উদ্ভাবনী এবং গবেষণাভিত্তিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করে শিল্প ৪.০-এর জন্য প্রস্তুত করা।

২. মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিতকরণ: শিক্ষক নিয়োগে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ ও শিক্ষক উন্নয়ন প্রশিক্ষণ (Faculty Development Programs) পরিচালনা। উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনে শিক্ষকদের জন্য বৃত্তি ও গবেষণা সুযোগ বৃদ্ধি করা।

৩. প্রযুক্তির ব্যবহার: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় স্মার্ট ক্লাসরুম, অনলাইন লার্নিং প্লাটফর্ম, এবং এডটেক (EdTech) চালু করা। ডিজিটাল লাইব্রেরি ও গবেষণা ডাটাবেজ অ্যাকসেস সহজলভ্য করা।

৪. কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা: ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ স্থাপন করে ইন্টার্নশিপ ও বাস্তবমুখী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি এবং শিক্ষার্থীদের শুধু চাকরি নয়, উদ্যোক্তা হতে উদ্বুদ্ধ করতে ইকোসিস্টেম তৈরি।

৫. উচ্চ শিক্ষায় প্রাপ্যতা বৃদ্ধি: আর্থিক সহায়তা, বৃত্তি এবং শিক্ষার্থী ঋণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত। দূরশিক্ষা এবং অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে গ্রামের শিক্ষার্থীদের কাছে উচ্চ শিক্ষা পৌঁছে দেয়া।

৬. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন: অলাভজনক উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কর ও ভ্যাট থেকে অব্যাহতি দেয়া। বৈষম্যমূলক ও সাংঘর্ষিক নীতি ও বিধিবিধান পরিহার করা।

৭. গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রমে সরকারি অনুদান নিশ্চিত করা। পিএইচডি প্রোগ্রাম অনুমোদন ও গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেয়া। গবেষণা ল্যাবরেটরি ও ফান্ডিং ইনিশিয়েটিভ বাড়ানো।

৮. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি: আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম এবং যৌথ গবেষণা কার্যক্রম চালু করা। বিদেশী শিক্ষার্থী আকর্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া।

৯. কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়ন: শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এবং স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করা। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির জন্য ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন।

১০. টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক দায়বদ্ধতা: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় টেকসই উন্নয়নের কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা। কমিউনিটি সার্ভিস ও সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক প্রকল্প পরিচালনা।

উপরোক্ত সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষা খাতের মান উন্নয়ন সম্ভব এবং তা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করবে বলে বিশ্বাস করি।

আমরা বিশ্বাস করি, প্রাইভেট বা পাবলিক ভেদাভেদ নয়, সব বিশ্ববিদ্যালয়ের একটিই কাজ, আর তা হলো বিশ্বমানের দক্ষ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রজন্মকে গড়ে তোলা। যারা কিনা আগামী দিনের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে আমাদের দেশ ও মানুষের সম্মান বৃদ্ধিতে সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য।

—ইশতিয়াক আবেদীন: সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি (এপিইউবি)

[‘‌উচ্চ শিক্ষায় বৈশ্বিক মান: বাংলাদেশের করণীয়’ শীর্ষক শিরোনামে বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম বাংলাদেশ উচ্চ শিক্ষা সম্মেলন ২০২৪ অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]

আরও