সর্বশেষ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে এ দুই বিভাগে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসন ফাঁকা ছিল। একদিকে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত সহপাঠী না থাকায় একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার কথা জানাচ্ছেন, অন্যদিকে বিভাগ দুটির শিক্ষকরা বলছেন, বর্তমান ভর্তি পদ্ধতিতে প্রকৃত আগ্রহী, দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা সুযোগ পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে বিভাগ দুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মাঝে। সংকট কাটাতে পৃথক ভর্তি পরীক্ষা ও স্বতন্ত্র অনুষদ গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে।
ভর্তি-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাঁচ বছর ধরে এ দুই বিভাগে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন ফাঁকা থাকছে। নৃত্যকলা বিভাগে প্রতি বছর ৩০টি আসনের বিপরীতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। তবে দেখা গেছে বিভাগটিতে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন ১২ জন, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ১৯ জন, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ২১ জন, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ১৮ জন এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে মাত্র সাতজন। অর্থাৎ চলতি শিক্ষাবর্ষে বিভাগের প্রায় ৭৭ শতাংশ আসনই পূরণ হয়নি। আর সব মিলিয়ে গত পাঁচ বছরে মোট ১৫০টি আসনের বিপরীতে ভর্তি হয়েছেন মাত্র ৭৭ জন শিক্ষার্থী। সে হিসেবে বিভাগের প্রায় অর্ধেক আসন ফাঁকা থেকেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নৃত্যকলা বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন নিয়েই ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু ক্লাসে এসে দেখি, আমাদের ব্যাচে মাত্র সাতজন শিক্ষার্থী। এত কম শিক্ষার্থী নিয়ে স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ তৈরি হয় না। অনেক সময় মনে হয়, বিভাগটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।’
২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত নৃত্যকলা বিভাগ ২০১৫ সালে ১০ শিক্ষার্থী নিয়ে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে বিভাগে ১৪ জন শিক্ষক রয়েছেন, যার মধ্যে নয়জন স্থায়ী ও পাঁচজন খণ্ডকালীন।
সংগীত বিভাগে গত পাঁচ বছরে ৩০০টি আসনের বিপরীতে ভর্তি হয়েছেন ১৭৯ শিক্ষার্থী। প্রায় ৪০ শতাংশ আসন ফাঁকা রয়েছে। বিভাগটিতে প্রতি শিক্ষাবর্ষে ৬০টি আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। কিন্তু ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন ৪৭ জন, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ৫০, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ৪২, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ২৪ এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে মাত্র ১৬ জন। অর্থাৎ চলতি শিক্ষাবর্ষে বিভাগের প্রায় ৭৩ শতাংশ আসন শূন্য রয়েছে।
সংগীত বিভাগের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রতি বছর আসন ফাঁকা থাকায় বিভাগে প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না। নতুন শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় সাংস্কৃতিক আয়োজন, দলীয় অনুশীলন ও একাডেমিক কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকেই সংগীত বিষয়ে ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্র নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভর্তি হতে চান না।’
বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা কমে যাওয়া প্রসঙ্গে সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রিয়াঙ্কা গোপ বলেন, ‘সংস্কৃতিচর্চার গুরুত্ব বাড়লেও বিভাগটি বর্তমানে শিক্ষার্থী সংকটে রয়েছে। কয়েক বছর ধরেই শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। একই সঙ্গে শিক্ষক সংকটও রয়েছে। এ সংকট নিরসনে নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং পৃথক ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য ও আগ্রহী শিক্ষার্থী ভর্তির প্রস্তাব প্রশাসনের কাছে দেয়া হয়েছে।’
বিভাগ দুটির শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান ভর্তি পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের যোগ্যতা প্রদর্শনের সুযোগ পান না। এ কারণে নৃত্যকলা, সংগীত ও থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ—এ তিন বিভাগকে নিয়ে পৃথক অনুষদ গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে। এছাড়া বিভাগগুলোর শিক্ষার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি ললিতকলাবিষয়ক সাধারণ জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা মূল্যায়নের মাধ্যমে পৃথক ভর্তি পরীক্ষারও দাবি জানানো হয়েছে। জানা গেছে, এরই মধ্যে বিষয়গুলো নিয়ে কলা অনুষদের ডিন ও উপ-উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা হলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
পরিস্থিতি নিয়ে নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক তামান্না রহমান বলেন, ‘তিনটি বিভাগকে নিয়ে পৃথক অনুষদ গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সেই অনুষদের নাম হতে পারে ললিতকলা অনুষদ। যদিও এখনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। এ বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। বর্তমান সাধারণ ভর্তি পদ্ধতিতে নৃত্যে দক্ষ অনেক শিক্ষার্থী সুযোগ পাচ্ছেন না। তাই বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা মূল্যায়নের মাধ্যমে পৃথক ভর্তি পরীক্ষার দাবি জানানো হয়েছে।’
বিভাগে অনেক আসন ফাঁকা থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চাইলেই কেউ এ বিভাগে ভর্তি হতে পারবেন না। ভর্তি হতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা থাকতে হবে। অন্য কোথাও ভর্তি হতে না পেরে এখানে আসতে চাইলে তাকে আমরা নিতে পারি না।’
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কিছু বিভাগে বছরের পর বছর আসন খালি থাকছে—বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করছে। তবে এটিকে কোনো বিভাগের বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট অনুষদের ডিনদের বিষয়টি পর্যালোচনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাদের সুপারিশ, একাডেমিক প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তড়িঘড়ি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না।’