দুই বছর ধরে পড়ে আছে ১১৪ কোটি টাকার শিশু হাসপাতাল

চাপ সামলাতে হিমশিম খুলনা মেডিকেলের শিশু ওয়ার্ড

শয্যা না পেয়ে মেঝে, ভেতর ও বাইরের বারান্দা, সিঁড়ির নিচে এমনকি বাথরুমের সামনের ফাঁকা জায়গায় বিছানা পেতে রোগীদের স্থান সংকুলান করা হয়েছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ৪৮ শয্যার বিপরীতে বুধবার সকাল পর্যন্ত ভর্তি ছিল ২১২ শিশু। শয্যা না পেয়ে মেঝে, ভেতর ও বাইরের বারান্দা, সিঁড়ির নিচে এমনকি বাথরুমের সামনের ফাঁকা জায়গায় বিছানা পেতে রোগীদের স্থান সংকুলান করা হয়েছে। কোথাও আবার শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন স্বজনরা। চলতি বছর হাম ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ একসঙ্গে বাড়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। অথচ দুই বছর ধরে পড়ে রয়েছে ১১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিভাগীয় সরকারি শিশু হাসপাতাল।

নগরের সোনাডাঙ্গা বাইপাস সড়কের পাশে কেডিএর ময়ূরী আবাসিক এলাকা ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যবর্তী প্রায় পাঁচ একর জমিতে নির্মিত সরকারি শিশু হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২৪ সালের জুনে। জমি অধিগ্রহণসহ প্রথম ধাপেই এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১৪ কোটি টাকা। ছয়তলা দৃষ্টিনন্দন ভবন, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও বিদ্যুৎ সংযোগসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর বড় একটি অংশ তৈরি হলেও এখনো সেখানে শুরু হয়নি চিকিৎসাসেবা। আগাছায় ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ। নেই প্রধান ফটক ও পূর্ণাঙ্গ সীমানা প্রাচীরও।

গত জুনে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, খুলনা ও বরিশালের ২০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল দুটি আগস্টের প্রথম দিকে চালুর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামও জুলাইয়ের মধ্যে পৌঁছার কথা ছিল। কিন্তু আগস্ট শেষ হয়ে সেপ্টেম্বর চললেও খুলনার হাসপাতালটি চালু হয়নি। এর ফলে একদিকে সরকারি অর্থে নির্মিত হাসপাতালের অবকাঠামো পড়ে রয়েছে, অন্যদিকে শিশু রোগীর অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হচ্ছে খুমেক হাসপাতালকে।

খুমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দা রোকসানা পারভীন বলেন, ‘‌৪৮ শয্যার বিপরীতে প্রায় সবসময়ই তিন গুণের বেশি রোগী থাকে। বর্তমানে একই সময়ে হাম ও ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত রোগীর কারণে চিকিৎসক ও নার্সদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অক্সিজেন সরবরাহে সংকট দেখা দেয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে, বিশেষ করে শ্বাসকষ্টসহ সংকটাপন্ন শিশুদের জন্য।’

শুধু সরকারি হাসপাতালেই নয়, খুলনার বেসরকারি শিশু হাসপাতালসহ আরো কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরেও কোনো শয্যা ফাঁকা পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ভর্তি শিশু রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের চাপ বেশি। বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও এ রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পৃথক শিশু হাসপাতালটি দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নাগরিক ও উন্নয়নকর্মীরা।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে প্রায় ৪ দশমিক ৮০ একর জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয় ৫২ কোটি ২ লাখ টাকা। এরপর ২০২০ সালে হাসপাতালের বেজমেন্ট ও একতলা নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ের কাজে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২৬ কোটি টাকা। পরে দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা নির্মাণ, রান্নাঘর, সাবস্টেশন, পাম্প হাউজ, সড়ক, ড্রেন ও গভীর নলকূপসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। অর্থাৎ জমি অধিগ্রহণসহ প্রকল্পের প্রথম ধাপেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১৪ কোটি টাকা। এ ধাপে পাঁচতলা পর্যন্ত অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। পূর্ণ প্রকল্পে ভবনটি ১০ তলা করে ২০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

হাসপাতালটি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তর খুলনা-১ সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ দেখানো হয়।

হাসপাতালটি এরই মধ্যে খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন গণপূর্ত বিভাগ খুলনা-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান। ‌এখন হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্ব স্বাস্থ্য বিভাগের।

খুলনার সিভিল সার্জন মাহফুজা খাতুন বলেন, ‘‌হাসপাতালের কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় আসবাব ও জনবলের ব্যবস্থা এখনো হয়নি।’

বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালটি কবে নাগাদ চালু হবে জানতে চাইলে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শেখ মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘‌হাসপাতালটির প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ২০০ শয্যার প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। লোকবলের বাজেটও করা হয়েছে।’

আরও