ফরিদপুর সদর উপজেলার ভাজনডাঙ্গা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। এরপর আট বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শেষ হয়নি সেতুটির নির্মাণ। প্রায় ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মার শাখা নদীর ওপর নির্মাণাধীন ৫৫০ মিটার দীর্ঘ সেতুটির কাজ নানা জটিলতায় কয়েক বছর বন্ধ ছিল। পরে সেতুর দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে ৫৮০ মিটার করা হলেও এখনো বাকি রয়েছে নির্মাণকাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। অন্যদিকে শেষ হয়নি সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণের প্রক্রিয়াও। ফলে দুর্ভোগে পড়েছে চরাঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সেতুটি চালু হলে নদী পারাপারের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি চরাঞ্চলে যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন, চিকিৎসাসেবা গ্রহণ ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়া অনেক পরিবার আবার নিজেদের এলাকায় ফিরে আসার সুযোগ পাবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ ঝুলে থাকায় সে প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ফরিদপুর সদর উপজেলার ভাজনডাঙ্গা পদ্মা নদীর ওপর সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০১৮ সালে প্রায় ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে সেতুটির দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫৫০ মিটার। পরে তা সংশোধন করে ৫৮০ মিটার করা হয়।
নির্মাণ শুরুর দুই বছরের মাথায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট মামলার কারণে প্রকল্পটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এ নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হলে দীর্ঘ সময় আটকে থাকে নির্মাণকাজ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাফিয়া কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী রুবেল-বরকত আলোচিত ২ হাজার কোটি টাকা অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলার আসামি হওয়ার পর ২০২০ সালে কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর নতুন করে সেতুটি নির্মাণের কার্যাদেশ পায় ফরিদপুর জান্নাত কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানো হলেও কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ বিরতির পর আদালতের নির্দেশনা ও পুনঃদরপত্র প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের শুরুতে নতুন করে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সেতুটির প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে বাকি নির্মাণকাজের পাশাপাশি সংযোগ সড়ক নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
স্থানীয়দের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০০-০৬ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলে তীব্র নদীভাঙনে প্রায় দুই লাখ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র চলে যায়। তাদের অনেকে বিভিন্ন স্থানে ভাড়া বাসায় কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন। আবার কেউ কেউ পরে চরাঞ্চলে ফিরে এসেছেন। সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা সামনে আসার পর থেকেই অনেকে নিজেদের পুরনো বসতভিটায় ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
ডিগ্রিচর ইউনিয়নের বাসিন্দা তোতা মিয়া বলেন, ‘আমরা চার-পাঁচ বছর আগে চরে ফিরে আসছি। নদীভাঙনের পর এত বছর অন্যের জায়গায় ভাড়া থাকছি। কিছুদিন রেলের সরকারি জায়গায়ও ছিলাম। চরে থাকা অনেক কষ্ট। রাতে নদী পার হওয়া যায় না, সবসময় খেয়া থাকে না। দিনের বেলায়ও ইচ্ছামতো যাতায়াত করা যায় না।’
নদীতে পানি বাড়লে পারাপারের ঝুঁকি আরো বেড়ে যায় বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, নৌকাডুবির ভয় থাকে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও অসুস্থ ব্যক্তিদের নদী পার হয়ে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বেশ কষ্টকর। সেতুটি চালু হলে এসব দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে বলে আশা করছেন তারা।
একই এলাকার বাসিন্দা আন্না বেগম বলেন, ‘এখানে বসবাস করা ভীষণ কষ্টের। আমাদের ভিটেমাটি নাই, তাই চরে থাকতে হচ্ছে। ব্রিজটা হয়ে গেলে মনে হয় একটু শান্তি পাব। কবে শেষ হবে, সেটা কে জানে! তবে ব্রিজ হলে অনেক মানুষ আবার চরে বাড়িঘর করবে।’
এলজিইডি ফরিদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা আগামী জুনের মধ্যে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। এরই মধ্যে অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে।’
তবে সেতুর মূল কাঠামোর নির্মাণ শেষ হলেই যে স্থানীয়রা এর সুবিধা পাবেন, তা নিশ্চিত নয়। কারণ, দুই পাশের সংযোগ সড়ক নির্মাণের প্রক্রিয়া এখনো চলমান। সংযোগ সড়ক নির্মাণের অগ্রগতি জানতে চাইলে ফরিদপুর সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত কিছু নথিপত্র চাওয়া হয়েছিল। সেগুলো জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় জমা দেয়া হয়েছে। বাকি কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’