সামগ্রিকভাবে নগরের স্বাস্থ্য সূচক গ্রামাঞ্চলের তুলনায় ভালো হলেও নগরের বস্তিগুলোয় বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে অর্ধেকের বেশি খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। নিয়মিত আয়ের মাধ্যমে দৈনন্দিন খাবার সংস্থান করতে না পেরে এসব পরিবার ঋণ নিচ্ছে। খাদ্য সংকটে থাকা পরিবারগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি ঋণগ্রস্ত। প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে বস্তিতে বসবাসকারী ও সেখানকার শিশুরা প্রায় ৫০ শতাংশ খর্বাকৃতির হিসেবে বেড়ে উঠছে।
গতকাল ঢাকার মহাখালীর আইসিডিডিআরবি’র সাসাকাওয়া অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত এক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
‘নিউট্রি-ক্যাপ’ শীর্ষক এ গবেষণা পরিচালনা করেছে আইসিডিডিআর,বি, কানাডা সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ‘অ্যাডভান্সিং সেক্সুয়াল অ্যান্ড রিপ্রডাকটিভ হেলথ অ্যান্ড রাইটস’ (এডসার্চ) প্রকল্পের আওতায়। গবেষণাটি মূলত ঢাকার মিরপুরের বাউনিয়াবাঁধ বস্তিতে বসবাসরত নিম্নবিত্ত গর্ভবতী নারী, কিশোরী ও দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য নিয়ে পরিচালিত হয়।
২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত চলা এ গবেষণায় ১৬ হাজার ৫৩২টি পরিবারের প্রায় ৬০ হাজার ৭৮৬ জন মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৭২১ জন গর্ভবতী নারী, ৪ হাজার ২৩৪ জন কিশোরী এবং ২ হাজার ৪৯৭ জন শিশু অন্তর্ভুক্ত ছিল। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন গবেষক দলের প্রধান ড. মোস্তফা মাহফুজ।
গবেষণায় দেখা গেছে, বস্তির প্রতি চারটি পরিবারের একটি খাদ্য সংকটে ভুগছে। খাদ্য সংকটে থাকা পরিবারের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি ঋণ নিয়ে পুষ্টির চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা রয়েছে ৫৯ শতাংশের ক্ষেত্রে, উচ্চতা কম ২৭ শতাংশের এবং ওজন কম ২০ শতাংশ শিশুর।
গর্ভবতী নারীরা প্রয়োজনের তুলনায় ৮০ শতাংশ কম ক্যালসিয়াম, ৭৮ শতাংশ কম ভিটামিন-এ, ৫৮ শতাংশ কম আয়রন ও ৪৪ শতাংশ কম জিংক গ্রহণ করছেন। তবে তারা ৩১৪ শতাংশ বেশি শর্করা গ্রহণ করছেন, যা অপুষ্টির পুষ্টিগত ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে। শহরের সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৫৩ শতাংশ নারী গর্ভাবস্থায় প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে চার বা ততধিক সেবা পেলেও বস্তিতে এ সেবার আওতায় রয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ নারী।
গবেষণায় বস্তির গর্ভবতী নারী, কিশোরী ও দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য একীভূত পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজ চালু করা হয়। এর আওতায় পুষ্টি পরামর্শ ছাড়াও আয়রন, ফলিক অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-এ সরবরাহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওজন, রক্তচাপ, হিমোগ্লোবিন ও শর্করার মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যবিধি প্রচারণা চালানো হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, এ সেবার আওতায় গর্ভবতী নারীদের গর্ভকালীন ওজন বেড়েছে, হাসপাতালে প্রসবের হার বেড়েছে এবং গর্ভপাত ও নবজাতকের মৃত্যুহার কমেছে। কিশোরীদের হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বেড়েছে এবং শিশুদের উচ্চতা ও ওজনেও উন্নতি দেখা গেছে।
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ‘দেশে অপরিকল্পিত নগরায়ণ হচ্ছে। শহরের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ বস্তিতে বাস করে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়—দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মাঝখানে থাকা বস্তিবাসী নানা সেবা থেকে বঞ্চিত। বস্তির মানুষের জীবনমান খারাপ। বস্তিবাসীরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘদিন অবহেলিত। নিউট্রি-ক্যাপ প্রকল্প প্রমাণ করেছে, অভিযোজিত মডেল শুধু কার্যকর নয়, বরং তা অন্যান্য বস্তি ও আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতেও সম্প্রসারণযোগ্য। সেবার বাণিজ্যিকীকরণ, ব্যথা ব্যবস্থাপনা, মানুষের ইচ্ছা—এসব কারণে দেশে অস্ত্রোপচারে শিশু জন্মহার অনেক বেশি।’
কানাডা দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি এডোয়ার্ড ক্যাবরেরা বলেন, ‘এমন একটি গবেষণা প্রকল্পে সহায়তা করতে পেরে আমরা গর্বিত। আইসিডিডিআর,বির গবেষণার ফলাফল বিশ্ববাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়।’
গবেষণা প্রকল্পের পরিচালক ও আইসিডিডিআর,বির প্রফেসর ইমেরিটাস ড. শামস এল আরিফিন বলেন, ‘অপুষ্টি মোকাবেলায় এ গবেষণা একটি কার্যকর মডেল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এর সম্প্রসারণ নিয়ে ভবিষ্যতে আরো কাজ হওয়া উচিত।’