দেশে ডায়রিয়া ও কলেরা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সংক্রামক বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে অগ্রগামী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরা হয় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশকে (আইসিডিডিআর,বি)। বিভিন্ন দাতা সংস্থার অনুদান, বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন ও নিজস্ব কিছু আয় থেকে পাওয়া তহবিলের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম। এতদিন সংস্থাটিতে অনুদান হিসেবে সবচেয়ে বেশি অর্থ এসেছে মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি) থেকে। আইসিডিডিআর,বি-তে দাতাদের অর্থায়নকৃত তহবিলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশেরই জোগান দিয়েছে ইউএসএআইডি।
তবে আইসিডিডিআর,বি-তে এখন মার্কিন সংস্থাটির অর্থায়ন স্থগিত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ইউএসএআইডির সহায়তা কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা দেন। এ আদেশের প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পক্ষ থেকে বলা হয়, এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিশ্বের অন্তত ৫০টি দেশ। প্রভাবিত হবে এইচআইভি, পোলিও, এমপক্স, যক্ষ্মা ও বার্ড ফ্লুর মতো রোগ মোকাবেলায় গৃহীত নানা কর্মসূচিও।
এরই মধ্যে বাংলাদেশে যক্ষ্মা গবেষণা ও প্রতিরোধ কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউএসএআইডির অর্থায়ন স্থগিত হয়ে পড়ায় এরই মধ্যে আইসিডিডিআর,বির বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পের সহস্রাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুতির চিঠি দেয়া হয়েছে। জানুয়ারির শেষ দিকে তাদের এ চিঠি দেয়া হয়। তাদের বেশির ভাগই যক্ষ্মাসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এ পরিস্থিতি চলমান থাকলে সামনের দিনগুলোয় সংস্থাটির সংকট আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে দেশের জনস্বাস্থ্যে দেখা দিতে পারে বড় ধরনের বিপত্তি।
দাতাদের কাছ থেকে দুই ধরনের অনুদান পেয়ে থাকে আইসিডিডিআর,বি। যেসব অনুদান সংস্থাটি স্বাধীনভাবে ব্যয় করতে পারে সেগুলোকে বলা হয় ‘আনরেস্ট্রিকটেড গ্র্যান্টস’। ২০২৩ সালে সংস্থাটি মোট ৩৪ লাখ ১২ হাজার ১৯৩ ডলারের আনরেস্ট্রিকটেড গ্র্যান্টস বা অবাধে ব্যয়যোগ্য অনুদান পেয়েছে। আর যেসব অনুদান সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য দেয়া হয় কিংবা আইসিডিডিআর,বির সঙ্গে দাতা সংস্থার স্বাক্ষরিত পারস্পরিক চুক্তি অনুসারে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রমে ব্যয় করার শর্ত থাকে সেগুলোকে বলা হয় ‘রেস্ট্রিকটেড গ্র্যান্টস’ বা সুনির্দিষ্ট খাতে ব্যয়যোগ্য অনুদান। ২০২৩ সালে আইসিডিডিআর,বি রেস্ট্রিকটেড গ্র্যান্টস হিসেবে ৬ কোটি ৫১ লাখ ৯২ হাজার ৩৬ ডলার আয় করেছে। একক দাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিডিডিআর,বি-কে সবচেয়ে বেশি অর্থ অনুদান দিয়েছে ইউএসএআইডি। এর পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৩৯ লাখ ৫১ হাজার ৭১৫ ডলার। সে হিসেবে ২০২৩ সালে সংস্থাটির অনুদান হিসেবে পাওয়া অর্থের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এসেছে ইউএসএআইডির কাছ থেকে।
আগের বছরের বকেয়া ও পরবর্তী বছরের জন্য ঘোষিত অনুদানের অগ্রিম যোগ করে ২০২৩ সালে আইসিডিডিআর,বির অনুকূলে দাতাদের কাছ থেকে অর্থছাড় হয়েছে সব মিলিয়ে ৭ কোটি ৫৯ লাখ ৯৩ হাজার ৮২২ ডলার। এর মধ্যে ইউএসএআইডির কাছ থেকে হাতে পাওয়া গেছে ১ কোটি ৩৫ লাখ ১৩ হাজার ১৬ ডলার।
খাতবিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে স্বাস্থ্য খাতে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, সেগুলোর সিংহভাগের অর্থায়নে ছিল ইউএসএআইডি। সংস্থাটির তহবিল বন্ধ করার প্রভাব এরই মধ্যে দেশের স্বাস্থ্য খাতে পড়তে শুরু করেছে। ইউএসএআইডির অর্থায়নে চলমান প্রকল্পের কাজ স্থগিত করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মীদের চাকরিচ্যুতও করছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইসিডিডিআর,বির কর্মকর্তারা কেউই আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পরিস্থিতি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। আশা করি এ স্থগিতাদেশ শেষে সবকিছু আবারো স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’
আইসিডিডিআর,বি-তে অনুদানদাতাদের তালিকায় শীর্ষস্থানে রয়েছে ইউএসএআইডি, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা (জিএসি), যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি), জাতিসংঘের উন্নয়ন গ্রুপ (ইউএনডিজি), যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ), দ্য গ্লোবাল ফান্ড টু ফাইট এইডস, টিউবারকুলোসিস অ্যান্ড ম্যালেরিয়া (জিএফএটিএম), বাংলাদেশ সরকার, যুক্তরাজ্য সরকারের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) এবং মার্কিন কিছু বেসরকারি সংস্থা।
মার্কিন সহায়তার ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করা দেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে গত ২৫ জানুয়ারি এক চিঠি পাঠায় ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের ইউএসএআইডি দপ্তর। চিঠিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের কথা উল্লেখ করে বিভিন্ন এনজিও ও অংশীদার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গৃহীত সব ধরনের অনুদানভিত্তিক কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিতের কথা বলা হয়। বর্তমানে আইসিডিডিআর,বি-তে কাজ করছেন পাঁচ হাজারের বেশি গবেষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী। সংস্থাটির বেশকিছু গবেষণা ও কর্মসূচির মূল অর্থায়ন এসেছে ইউএসএআইডির কাছ থেকে।
আইসিডিডিআর,বি-তে অর্থায়ন স্থগিত করে দেয়া সম্পর্কে জানতে ইউএসএআইডির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি।
বাংলাদেশে শিশুদের ডায়রিয়াজনিত রোগের মৃত্যুহার কমানোয় সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে আইসিডিডিআর,বি। ডায়রিয়ার চিকিৎসায় ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপি (ওআরএস) উদ্ভাবনেও মুখ্য ভূমিকা ছিল গবেষণা কেন্দ্রটির। এছাড়া মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং ধনুষ্টংকার টিকার গবেষণা, মুখে খাওয়ার কলেরা ভ্যাকসিন তৈরি, গুরুতর অপুষ্টির চিকিৎসার জন্য গাইডলাইন প্রস্তুত এবং বৈশ্বিক পোলিও নির্মূল প্রচেষ্টায় অবদান রাখার ক্ষেত্রে আইসিডিডিআর,বির বড় ধরনের অবদান রয়েছে।
সংস্থাটির কার্যক্রম ব্যাহত হলে তা বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। সামনের দিনগুলোয় এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব এড়াতে আইসিডিডিআর,বির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুদাননির্ভরতা কমিয়ে আনা জরুরি বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে আইসিডিডিআর,বিসহ স্বাস্থ্যবিষয়ক অনেকগুলো প্রকল্পে অনেক বছর যাবত সহায়তা করে আসছে ইউএসএআইডি। এটি দেশের স্বাস্থ্যবিষয়ক খাতকে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সহযোগী সংস্থা হিসেবে কাজ করছে। ফলে ইউএসএআইডির অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেলে নিশ্চিতভাবে আমাদের স্বাস্থ্য খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা এরই মধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি। অনেকগুলো প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অনেকে চাকরিচ্যুত হচ্ছে। এ ধরনের সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় হলো আমাদের স্বাস্থ্য খাতের বিদেশী তহবিলের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে যে বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়, তা বাড়াতে হবে। যে প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলোকে চলমান করার জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে ভাবা জরুরি।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউএসএআইডির অর্থায়ন বন্ধে আইসিডিডিআর,বির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে বিপত্তিতে পড়বে দেশের জনস্বাস্থ্য। বিশেষ করে বাংলাদেশে যক্ষ্মা প্রতিরোধ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। গত বছরের জুনে আইসিডিডিআর,বির এক আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে উঠে আসে, দেশে গত তিন বছরে নতুন করে আরো প্রায় এক লাখ যক্ষ্মা রোগী বেড়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে সারা দেশে চার লাখের মতো যক্ষ্মা রোগী আছে এবং এর মধ্যে প্রতি বছর চার হাজারের মতো রোগীর মৃত্যু হয়।
বর্তমানে আইসিডিডিআর,বির মতো যক্ষ্মা মোকাবেলায় গঠিত বিশেষায়িত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে এতদিন যক্ষ্মা (টিবি) রোগের ওষুধ সরবরাহ করে আসছিল ইউএসএআইডি। অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালটিতে ওষুধ সরবরাহও বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে এখন আশঙ্কা করছে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ।
ইউএসএআইডির অর্থায়ন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়লে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মো. আবু জাফর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতি একটি প্রতিবন্ধকতা অবশ্যই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তটি সাময়িক। আমাদের স্থায়ী সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে আমরা পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি।’