জাতীয় গ্রিডে ত্রুটির কারণে গত শনিবার শ্রীলংকাজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে দেশটির গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এ বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে না পেলেও দেশটির বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা মনে করছেন, চাহিদার তুলনায় সৌরবিদ্যুতের অতিরিক্ত সক্ষমতা গ্রিডে যুক্ত হওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে শ্রীলংকার ইউটিলিটি সংস্থাগুলো ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এর আগেও গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশটির জাতীয় গ্রিড পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেবারও সৌরবিদ্যুতের অতিরিক্ত চাপ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করলে গ্রিড বিপর্যয় হয়।
দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য সরকারের। এর বাইরে জাতীয় গ্রিডে চলতি বছরের মধ্যে পারমাণবিক কেন্দ্রের বিদ্যুৎও যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। অত্যাধুনিক ও নতুন প্রযুক্তিতে উৎপাদিত এ বিদ্যুতের জন্য গ্রিড কতটুকু প্রস্তুত রয়েছে তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, দেশের গ্রিড বিপর্যয়ের অতীত অভিজ্ঞতা, নতুন প্রযুক্তির বিদ্যুতে অন্যান্য দেশে দুর্ঘটনার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে গ্রিডের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিকায়নে আরো বেশি জোর দেয়া উচিত। বিশেষ করে উৎপাদন থেকে বিতরণ পর্যায়ে গ্রিড সুরক্ষায় যেসব সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, নীতিমালা রয়েছে সেগুলো যথাযথ অনুসরণ করা জরুরি। এতে বিদ্যুৎ বিপর্যয় কিংবা গ্রিডে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে বলে মনে করেন তারা।
যদিও পাওয়ার গ্রিড ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রিড দুর্ঘটনা, বিপর্যয় ও ত্রুটিসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করছেন তারা। সেখানে মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে তারা দেখছেন স্পিনিং রিজার্ভ। এটা ঠিক করা গেলে গ্রিডের বড় অংশে ঝুঁকি কমে যায়।
বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর বেশ কয়েকবার গ্রিড বিপর্যয় হয়েছে। এসব ঘটনার পেছনে মূল কারণগুলো মোটা দাগে প্রযুক্তিগত ত্রুটি, সঞ্চালন ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যহীনতা। প্রথমত, বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহ অর্থাৎ গ্রাহকের চাহিদার সঙ্গে বিদ্যুতের ভারসাম্য না থাকলে গ্রিড বিপর্যয় হয়।
দ্বিতীয়ত, ক্যাসকেড ট্রিপিং। অর্থাৎ একটি বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা সঞ্চালন লাইন কোনো কারণে হঠাৎ বন্ধ হলে বা ট্রিপ করলে, তার অতিরিক্ত চাপ অন্য লাইনগুলোর ওপর পড়ে। ফলে একের পর এক অন্যান্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সাবস্টেশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
তৃতীয়ত, সঞ্চালন ব্যবস্থার দুর্বলতা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। পাওয়ার গ্রিডের রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি এবং পুরনো সঞ্চালন লাইন ও সাবস্টেশনগুলোর ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে অতীতে বড় ধরনের বিপর্যয় হয়েছে। ২০২২ সালের অক্টোবরে ঘোড়শাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও আমিনবাজার সাবস্টেশনে ত্রুটি বা ট্রান্সফরমারে আগুনের ঘটনায় পুরো গ্রিডে বিপর্যয় হয়।
দেশের বিদ্যুৎ খাতে চলতি বছর কিংবা আগামী বছরের শুরুতে পাবনার রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে ধাপে ধাপে যুক্ত হবে। এরই মধ্যে এ বিদ্যুৎ গ্রিডে নিতে বেশ কয়েকটি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এ কেন্দ্র চালু করার ক্ষেত্রে বারবার স্পিনিং রিজার্ভ রাখার পরামর্শ দিয়েছে এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটম। যদিও এখনো স্পিনিং রিজার্ভ রাখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানিয়েছে বিপিডিবি।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্রিডভিত্তিক নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সক্ষমতা ১ হাজার ২২৯ মেগাওয়াট, যা মোট সক্ষমতার ৩ দশমিক ৮১ শতাংশ। বিদ্যুতের বিদ্যমান এ সক্ষমতা অব্যাহত থাকলে এবং আগামী ২০৩০ সালে গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের আরো ১০ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত হলে দেশে মোট বিদ্যুতের সক্ষমতা তৈরি হবে ৪০ হাজার মেগাওয়াট। যদি দিনের বেলায় এ নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের পুরোটা (সিংহভাগ সোলার) ব্যবহার করা হয় এবং দিন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রিড থেকে সৌরবিদ্যুতের বড় সক্ষমতা চলে যায়, সেক্ষেত্রে অন্য জ্বালানি থেকে তা তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ করা না গেলে গ্রিড স্থিতিশীল রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রিড স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে কিংবা গ্রিড বিপর্যয় এড়াতে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। সেই সঙ্গে গ্রিড আধুনিকায়ন, স্পিনিং রিজার্ভ এবং ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেমও গড়ে তোলা জরুরি বলে মনে করেন তারা।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল হাসিব চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্রিড স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবস্থাপনা। প্রতিটি পর্যায়ে রিলায়াবিলিটি ও রেজিলিয়েন্স নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু উৎপাদন খাতে নিউক্লিয়ার এবং বড় আকারে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যুক্ত হবে সামনে, তাই তিন পর্যায়ের দক্ষ কারিগরি ব্যবস্থাপনায় আরো জোর দিতে হবে।’
দেশের গ্রিডে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিদ্যুৎ প্রবেশ এবং সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে স্টোরেজ ক্যাপাসিটি গ্রিড ব্যবস্থাপনার জন্য জরুরি বলে মনে করেন পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান এবং ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসির্টির প্রফেসর ইমিরেটাস এম রিজওয়ান খান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্রিডের আওতায় অত্যাধুনিক ও নতুন প্রযুক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্র যুক্ত হচ্ছে, সামনে সৌরবিদ্যুতের আরো বড় কেন্দ্র যুক্ত হবে, এসব কেন্দ্র বিদ্যুৎ গ্রিডের আওতায় এলে বড় প্রশ্ন হবে গ্রিডের স্ট্যাবিলিটি। সেক্ষেত্রে স্পিনিং রিজার্ভ এবং ব্যাটারি ব্যাকঅ্যাপ অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। বলছি না আমাদের গ্রিডে ঝুঁকি নেই। তবে বিপর্যয় এড়ানোর মতো সক্ষমতা রয়েছে। সেক্ষেত্রে গ্রিড আধুনিকায়ন ক্রমান্বয়ে আরো বাড়াতে হবে। তবে এখানে বিনিয়োগের বড় ব্যাপার রয়েছে যদিও, সেগুলো হচ্ছে পর্যায়ক্রমে।’ তিনি মনে করেন, গ্রিড নিয়ে আরো কেয়ারফুল হতে হবে। কারণ এখানে নানা প্রযুক্তির বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে। এগুলো গ্রিডে যুক্ত হওয়ার জন্য গ্রিডের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি।’
নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ গ্রিডে সফলভাবে প্রবেশ করাতে হলে গ্রিড উন্নত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন এ খাত নিয়ে কাজ করা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তারাও।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সাবেক চেয়ারম্যান মো. আলাউদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে সরকার যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমাদের গ্রিডের বড় একটা পার্ট রয়েছে। সেখানেও সিস্টেম উন্নত করতে হবে। সেক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন নিয়ে চিন্তা করলে চলবে না, ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেমে বিনিয়োগ করতে হবে। যাতে গ্রিডে উৎপাদনগত জটিলতা দেখা দিলে ব্যাটারির মাধ্যমে ব্যাকআপ দেয়া যায়। এখানে বড় বিনিয়োগের ব্যাপার রয়েছে। বাংলাদেশে ব্যাটারি ব্যাকআপ বিষয়টি নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ ছিল না, যদি সার্ক গ্রিড নেটওয়ার্ক তৈরি করা যেত। যেখানে আঞ্চলিকভাবে কোনো একটি দেশের গ্রিডে ক্রটি দেখা দিলে অন্য দেশ থেকে ব্যাকআপ নিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেয়া যায়।’
দেশের বিদ্যুতের গ্রিড লাইনে বর্তমানে ১৮ হাজার ৮১৭ সার্কিট কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন রয়েছে। গত পাঁচ বছরে ৪০০ কেভি, ২৩০ কেভি ও ১৩২ কেভি আরো ৫ হাজার ৪৯৬ সার্কিট কিলোমিটার লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া ২৩০, ১৩২ ও ৩৩ কেভি সাবস্টেশনও নির্মাণ করা হয়েছে। এসব সঞ্চালন অবকাঠামো গ্রিডের আধুনিকায়নের বড় অংশ বলে জানিয়েছেন পাওয়ার গ্রিডের কর্মকর্তারা।
পাওয়ার গ্রিডের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন খাতে এখনো বহু পুরনো সঞ্চালন অবকাঠামো ও লাইন রয়েছে, যা দিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালনে বড় ট্রান্সমিশন লস রয়েছে পাওয়ার গ্রিডের। বিশেষ করে ৪০০ কেভি থেকে নিম্নস্তরের কেভিতে বিদ্যুৎ ট্রান্সমিট করতে হলে গ্রিডে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। এছাড়া সঞ্চালন লাইন থেকে ডিস্ট্রিবিউশন পর্যায়ে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে গেলে সেখানেও ত্রুটি রয়েছে। পাওয়ার গ্রিড পর্যায় থেকে আধুনিকায়ন ও নতুন করে সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু ডিস্ট্রিবিউশন পর্যায়ে আধুনিকায়ন আরো বিস্তৃত পরিসরে করা না গেলে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পাওয়ার গ্রিডের শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের গ্রিড স্থিতিশীল রাখতে বড় চ্যালেঞ্জ স্পিনিং রিজার্ভ। এটা আবার পাওয়ার গ্রিডের হাতে নেই। স্পিনিং রিজার্ভ ঠিক রাখা গেলে গ্রিড বিপর্যয় সিংহভাগ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। আমরা এটা নিয়ে প্রতিনিয়ত মিটিং করছি। মন্ত্রণালয়কে জানাচ্ছি। আর গ্রিডে নতুন প্রযুক্তির যে বিদ্যুৎ আসছে সেগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্রিডে নিতে পাওয়ার গ্রিড থেকে সৌরবিদ্যুতে স্টোরেজ সিস্টেম তৈরির পরামর্শও দিচ্ছে। পিজিসিবি নিজেও ঈশ্বরদী ও ঘোড়াশালে ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি ব্যাটারি স্টোরেজ ক্যাপাসিটির পাইলট প্রকল্প হাতে নিয়েছে।’
গ্রিড স্থিতিশীলতার বিষয়টি নিয়ে বিপিডিবি কীভাবে কাজ করছে জানতে চাইলে এর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্রিডের সক্ষমতা, স্থিতিশীলতা নিয়ে একটা স্ট্যাডি চলছে। সেখানে গ্রিডের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। গ্রিডের সক্ষমতা বাড়াতে আরো কী কী করা যায় তা নিয়ে কাজ চলছে। এরই মধ্যে দুটি বৈঠক হয়েছে। সেখানে নিউক্লিয়ার পাওয়ার ও সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে পর্যায়ক্রমে যুক্ত হলে বছরভিত্তিক কী পরিমাণ হবে তা নিয়ে ইউটিলিটি কোম্পানিগুলো, পিজিসিবি ও বিপিডিবি মিলে ক্রমান্বয়ে আলোচনা হচ্ছে।’