সংগীত, নৃত্য ও নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য বিসিএস

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আসিফা সমাপ্তি (ছদ্মনাম)। ২০১৫-১৬ সেশনে ভর্তির সুযোগ পেয়ে এ বিভাগ বেছে নেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আসিফা সমাপ্তি (ছদ্মনাম)। ২০১৫-১৬ সেশনে ভর্তির সুযোগ পেয়ে এ বিভাগ বেছে নেন তিনি। শুরু থেকেই নাটকে ভালো করছিলেন এ শিক্ষার্থী। বিভাগের প্রযোজনায় নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে শিক্ষক, সহপাঠী ও দর্শকদের মাঝে ব্যাপক প্রশংসিত হন তিনি। গ্র্যাজুয়েশন শেষ হতে না হতেই শিল্পকলা একাডেমিতে নাট্যাঙ্গনের প্রথিতযশা শিল্পীদের সঙ্গেও এক মঞ্চে কাজের সৌভাগ্য হয় তার। তার সাফল্যে সহপাঠী ও শিক্ষকরা আশায় বুক বাঁধলেও হঠাৎই একদিন নাটক ছেড়ে দেন তিনি। শুরু করেন সরকারি চাকরির প্রস্তুতি। তবে নাটক ছাড়ার কারণ জানতে চাইলে কথা বলতে রাজি হননি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নাট্যকলা বিভাগের সাবেক এ শিক্ষার্থী। শুধু তিনিই নন, নাট্যকলা বিভাগের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই পেশাগত জীবনে নাট্যচর্চাকে বেছে নেন না। বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানান, খুব কমসংখ্যক শিক্ষার্থী নাট্যচর্চা কিংবা অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেন। অধিকাংশের মূল লক্ষ্য থাকে বিসিএস। এছাড়া অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি চাকরির চেষ্টাও করেন তারা।

পারিবারিক প্রত্যাশা, আর্থিক সংকট ও পেশা হিসেবে নাট্যচর্চার দুর্বল অবস্থানের কারণে শিক্ষার্থীরা একাডেমিক জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কহীন পেশায় যুক্ত হন বলে জানিয়েছেন বিভাগের ২০১৭-১৮ সেশনের শিক্ষার্থী তরিকুল সরদার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে আমরা যে বিষয়েই পড়াশোনা করি না কেন সবশেষে আমাদের পরিবারের কাছেই ফিরতে হয়। দেশের স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করার পর প্রত্যাশা থাকে যে সন্তান পরিবারের হাল ধরবে। অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে রুটি-রুজির তাগিদে অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত হতে হয়। ফলে অনেকের ইচ্ছে থাকলেও থিয়েটার চর্চা চালিয়ে যাওয়ার উপায় থাকে না। এছাড়া থিয়েটার যে একটি পেশা হতে পারে, তা অনেকেই চিন্তা করতে চায় না। যদিও আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশসহ ইউরোপে এ বিষয়টির বেশ চাহিদা রয়েছে।’ যাদের সামর্থ্য আছে তারা দেশের বাইরে সেটল হওয়ার চিন্তা করে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘বিশাল একটি অংশ বেকার থাকে কিংবা নামমাত্র বেতনের বিনিময়ে অন্য পেশা বেছে নেয়।’ এছাড়া সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য শিল্পকর্মের চর্চা ও প্রতিভা বিকাশে বাধা সৃষ্টি হয় বলেও জানান তরিকুল সরদার।

নাট্যকলা বিভাগকে বলা হয় সব কলার সংমিশ্রণ। দেশে প্রথম নাট্যশিক্ষার কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৬৯ সালে; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহায়ক কোর্স হিসেবে। পরে চারুকলা বিভাগের অধীনে নাট্যকলা যুক্ত হয়। ১৯৮৬-৮৭ শিক্ষাবর্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নাট্যকলায় প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে ঢাকা, রাজশাহী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে নাট্যকলা বিভাগে ডিগ্রি লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নাট্যকলা অধ্যয়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫টি আসন রয়েছে। দেশের ছয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বর্তমানে ৮৫০ শিক্ষার্থী নাট্যকলা বিভাগে অধ্যয়নরত। এ শিক্ষার্থীদের প্রায় সবারই লক্ষ্য পড়াশোনা শেষে সরকারি-বেসরকারি চাকরি।

তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ফাহমিদা আখতার জানালেন ভিন্ন কথা। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা এ বিভাগ থেকে যে ধরনের শিক্ষা পায় তা দিয়ে অন্য যেকোনো চাকরি করতে পারে। এখানে টিম ওয়ার্কের বিষয় আছে। সৃজনশীলভাবে কীভাবে কাজ করা যায়, সেই বিষয়গুলো আছে। সুতরাং নানা দিকে আমাদের কাজের সম্ভাবনা আছে। এমনকি ব্যাংকিং সেক্টরেও।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রফেশনাল থিয়েটার নেই যে থিয়েটার করে বাঁচবে। নাটকের সঙ্গে রেলেভ্যান্ট ডিফারেন্ট আর্ট যেমন মিডিয়ায় কাজ করবে; কেউ মিডিয়ায় প্রডিউসার হিসেবে কাজ করবে; কেউ ডেভেলপমেন্ট ফিল্ডে যাবে; কেউ টিচিংয়ে যাবে। আর আমাদের ইন্টারমিডিয়েট লেভেলে সব কলেজে এখনো নাটকটাকে আলাদা বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেকেই শিল্পকলা একাডেমিতে চাকরি করছে।’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য যেকোনো বিষয়ের তুলনায় নাট্যকলার শিক্ষার্থীদের চাকরির ক্ষেত্রটা ভালো বলে দাবি করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা অনুষদের অধীনে নাট্যকলা বিষয় ১৯৮৯ সালে ও সংগীত বিষয় ১৯৯৩ সালে সাবসিডিয়ারি কোর্স হিসেবে চালু হয়। ১৯৯৩-৯৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে ‘নাট্যকলা ও সংগীত’ বিষয়ে এমএ (প্রিলিমিনারি) কোর্স চালু হয়। এরপর ১৯৯৭-৯৮ শিক্ষাবর্ষে চালু হয় চার বছর মেয়াদি বিএ অনার্স কোর্স। ২০০৯ সালে বিভাগটি ভেঙে ‘সংগীত’ ও ‘থিয়েটার’ নামে দুটি পৃথক বিভাগ গঠিত হয়। বর্তমানে শুধু সংগীত বিভাগে প্রতি বছর ৬০ জন শিক্ষার্থীর ভর্তির সুযোগ রয়েছে। সে হিসাবে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বর্তমানে ৩০০ শিক্ষার্থী ভর্তি থাকার কথা। যদিও বাস্তবে এর চেয়ে কম শিক্ষার্থী রয়েছে বলে বিভাগসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের মতে, বেছে বেছে নেয়ার পরও শিক্ষার্থীর প্রায় অধিকাংশ সংগীতচর্চাকে পেশা হিসেবে নেন না। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর প্রথম লক্ষ্য সরকারি চাকরি; দ্বিতীয়ত বেসরকারি চাকরি। যেসব চাকরির সঙ্গে পঠিত বিষয় কোনোভাবেই সম্পর্কিত নয়।

বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থীর মধ্যে এখন পর্যন্ত সংগীতকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন হাতেগোনা কয়েকজন। এদের মধ্যে একজন আহমাদ আতাউল্লাহ সালমান। যিনি এরই মধ্যে ‘কাসীদা’ নামে একটি ব্রান্ড গঠন করেছেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০১৭ সাল থেকে সংগীতের প্রতি আমার ঝোঁক সৃষ্টি হয়। তাই সংগীতকেই পেশা হিসেবে নিয়েছি। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংগীতের সঙ্গে আমার সখ্য তৈরি হয় এ বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর।’ সংগীতচর্চা জোর করে হয় না; এজন্য ইচ্ছে ও সংগীতের প্রতি ভালোবাসা থাকতে হয় বলেও জানান সালমান।

ভালোবাসা ও পছন্দের জায়গা থেকে সংগীতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম বলে স্বীকার করেছেন বিভাগটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দেবপ্রসাদ দাঁ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘যেখানে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা আলাদাভাবে গ্রহণ করছে, সেখানে এখনো আমরা ইউনিটভিত্তিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া পরীক্ষার্থীর ব্যবহারিক পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করে ভর্তি করছি। এখানে দেখা যায় সংগীত চর্চা করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম থাকে। তবে ভবিষ্যতে যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সংগীত, নাট্যকলা, নৃত্যকলা, ফিল্ম ও মিডিয়া বিভাগ নিয়ে আলাদা একটা পারফরমিং আর্ট অনুষদ তৈরি করে, সেক্ষেত্রে বাংলা সংস্কৃতির উন্নয়নের পাশাপাশি আমরা ভালো কণ্ঠশিল্পী, নৃত্যশিল্পী ও গবেষক পাব বলে আশা করি।’

এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘সংগীত ও নাট্যতত্ত্ব’ বিভাগ ২০১৪ সালের ২৬ এপ্রিল পৃথক হয়ে ‘নাট্যকলা’ ও ‘সংগীত’ নামে স্বতন্ত্রভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৫ সালে; জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৬ এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৯ সাল থেকে সংগীত বিভাগ স্বতন্ত্রভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সংগীত বিভাগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০টি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৫, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪০টি আসন রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশে সংগীতের মতো বিভাগগুলোর জন্য পৃথক ভর্তি পরীক্ষা হলেও শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ পঠিত বিষয়কে পেশা হিসেবে নেন না। সে হিসেবে সারা দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সংগীতের শিক্ষার্থী সংখ্যা ১ হাজার ৭৫ শিক্ষার্থীর সিংহভাগই বিভাগসংশ্লিষ্ট পেশার সঙ্গে যুক্ত নন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাদিরা ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগে এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েকটা ব্যাচ গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছে। ফলে মূল্যায়ন করার সময় আসেনি। তবে অনেকেই সংগীতকে পেশা হিসেবে নেবে বলে প্রত্যাশা করছি।’

সংগীত ও নাট্যকলা বিভাগের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিভাগসংশ্লিষ্ট পেশায় যাওয়ার হার কম। ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে মাত্র ১০ শিক্ষার্থী নিয়ে কলা অনুষদের অধীনে নৃত্যকলা বিভাগ চালু হয়। বর্তমানে এ বিভাগের আসন সংখ্যা ৩০। সে হিসেবে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভাগটিতে বর্তমানে ১৫০ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।

সরজমিনে বিভাগে গিয়ে বিভাগটির কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাইলে তারা জানান, নৃত্যকলা থেকে যারা বের হয়েছেন তাদের অধিকাংশই বিসিএসসহ অন্য সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে যুক্ত হয়েছেন। কেউ কেউ নাচের স্কুল খুলেছেন। পাশের দেশ ভারতে নৃত্যশিল্পীদের প্রচুর চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশে এ বিভাগের চাহিদা কম বলেই শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন পেশা বেছে নিচ্ছেন।

এ বিষয়ে বিভাগটির চেয়ারপারসন সহকারী অধ্যাপক তামান্না রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের অনেক শিক্ষার্থী বিভাগসংশ্লিষ্ট পেশায় যুক্ত হলেও দেশে এ সম্পর্কিত কাজের সুযোগ কম। অন্য অনেক বিভাগেই একই অবস্থা বিরাজমান। আমাদের শিক্ষার্থীরা ছোট দল করে অনুশীলন করছে। বাসায় কিংবা নাচের স্কুলে তালিম দিচ্ছে।’ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ বিভাগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞান ও গবেষণার জন্য উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে এ বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আমাদের দেশে নৃত্য নিয়ে গবেষণা নেই বললেই চলে।’

আরও