বিগত কয়েক বছর ধরেই শিক্ষার্থীদের হাতে সঠিক সময়ে বই তুলে দিতে পারছে না সরকার। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের সব বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাতে কয়েকটি জেলায় এপ্রিল পর্যন্ত সময় লেগেছিল। ২০২৬ সালে যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দিতে এবার অপেক্ষাকৃত আগেই পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। তবে এর পরও দরপত্র পরিবর্তনসহ বিভিন্ন জটিলতায় মাধ্যমিকের বই যথাসময়ে সরবরাহ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী কয়েকটি প্রেস ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণীর বই ছাপানো শুরু করলেও সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর বই ছাপানোর কাজ এখনো শুরুই হয়নি।
এবার ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ৩০ কোটি পাঠ্যবই ছাপা হবে। এর আগে বিগত বছরে ছাপা বইয়ের কপি ছিল প্রায় ৪০ কোটি। এ বছর বিগত বছরের চেয়ে সব মিলিয়ে প্রায় ১০ কোটি বই কম ছাপা হচ্ছে। মাধ্যমিকের বই ছাপা হবে প্রায় ১৮ কোটি। এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক স্তরের প্রায় ৯৪ শতাংশ বইয়ের মুদ্রণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। আগামী সপ্তাহে প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হতে পারে। তাদের মতে এবার জানুয়ারির প্রথম দিনেই প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা বই পাবে। তবে মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের ক্ষেত্রে অগ্রগতি কম।
এবার ষষ্ঠ শ্রেণীর জন্য ৪ কোটি ৪৩ লাখ ১৭ হাজার ৫০৯, সপ্তম শ্রেণীর ৪ কোটি ১৫ লাখ ৮৪ হাজার ৬৯২ এবং অষ্টম শ্রেণীর ৪ কোটি ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৯৮ এবং নবম শ্রেণীর জন্য ৫ কোটি ৭০ লাখ ৬৮ হাজার ২৮ কপি ছাপা হবে।
ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর পাঠ্যবই ছাপার জন্য প্রথমে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল গত মে-জুনে। তবে গত সেপ্টেম্বরে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এ দরপত্র বাতিল করা হয়। পরে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয় এবং ২২ অক্টোবর ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ৪২তম সভায় এ তিন শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়। এবারে ষষ্ঠ শ্রেণীর পাঠ্যবই ছাপার জন্য ১৩৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, সপ্তম শ্রেণীর পাঠ্যইয়ের জন্য ১৫০ কোটি ১ লাখ টাকা এবং অষ্টম শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ের জন্য ১৫৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
এর আগে ১৪ অক্টোবর মাধ্যমিক, দাখিল ও কারিগরির নবম-দশম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের ক্রয়াদেশ অনুমোদন দেয়া হয়। এবারে এসব বই ছাপাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৭৯ কোটি ৮২ লাখ ৪৪ হাজার ৯২৭ টাকা।
এদিকে মাধ্যমিকের বেশকিছু লটের বই মুদ্রণের এখনো চুক্তিই হয়নি। সর্বশেষ গত ৬ নভেম্বর এনসিটিবির ওয়েবসাইটে ষষ্ঠ, নবম ও দশম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকের ১৭টি লটের পুনঃদরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী দরপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন ২৫ নভেম্বর। এরপর চুক্তি স্বাক্ষর থেকে বই সরবরাহে দুই মাসের অধিক সময় প্রয়োজন হতে পারে।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে এনসিটিবির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এ বছর বই মুদ্রণের কার্যক্রম অপেক্ষাকৃত দ্রুত শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর পাঠ্যবই ছাপার দরপত্র সেপ্টেম্বরে বাতিল করা হয়। এরপর আবার দরপত্র আহ্বান করে এনসিটিবি। এ কারণে মাধ্যমিকের বই মুদ্রণ কার্যক্রম পিছিয়ে যায়। সাধারণত ক্রয়াদেশের পর চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য প্রেস মালিকরা প্রায় এক মাসের মতো সময় পেয়ে থাকেন আর চুক্তির পর বই সরবরাহের জন্য সময় থাকে প্রায় দুই মাস। সব মিলিয়ে এবারেও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের যথাসময়ে বই সরবরাহ করা সম্ভব হবে না।’
এনসিটিবির সচিব অধ্যাপক মো. সাহতাব উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এরই মধ্যে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর বই ছাপানোর চুক্তি হয়েছে। অনেক প্রেস ষষ্ঠ শ্রেণীর বই ছাপানোর কাজও শুরু করেছে। তবে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর বই ছাপানোর কাজ এখনো শুরু হয়নি। তবে শিগগিরই শুরু হবে। নবম শ্রেণীর বইয়ের বিষয়ে প্রেসগুলোর সঙ্গে চুক্তির কাজ চলছে। বিভিন্ন প্রেস বই ছাপানোও শুরু করেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আজকেও (বুধবার) উপদেষ্টা এনসিটিবির কর্মকর্তাসহ প্রেস মালিকদের সঙ্গে সভা করেছেন, যাতে দ্রুত সময়ে কাজ শেষ হয়। আমাদের কয়েকটি লটের কার্যাদেশ বিভিন্ন কারণে দেয়া সম্ভব হয়নি। সেগুলো এখন দেয়া হচ্ছে। তবে এ সংখ্যা খুবই কম। আমরা আশা করছি নভেম্বরের মধ্যেই আমাদের প্রেসগুলোর সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হবে এবং ডিসেম্বরের মধ্যেই মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানোর কাজ শেষ হবে।’