শর্তসাপেক্ষে নির্দোষ সোনা মিয়ার মুক্তি

অন্যের জন্মনিবন্ধন-পরিচয়ে গ্রেফতার, জামিন নিয়ে লাপাত্তা মৃত্যুদণ্ডের প্রকৃত আসামি

এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা জব্দের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ‘সোনা মিয়া’ আসলে রোহিঙ্গা নাগরিক রমজান।

তিনি গ্রেফতারের সময় সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করেছিলেন। জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে যান রমজান। পরে জন্মনিবন্ধন সূত্রে প্রকৃত সোনা মিয়াকেই গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে কারা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ও পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা।

ঘটনাটি সামনে আসার পর কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হয়, কারাগারে থাকা সোনা মিয়া ওই ইয়াবা মামলার সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি নন। পরে আদালতের নির্দেশে গতকাল বেলা ১১টার দিকে তাকে শর্তসাপেক্ষে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২ মার্চ কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়া’, পিতা নজির আহমদ, কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া ও স্থায়ী ঠিকানা রামু উপজেলার গর্জনিয়া উল্লেখ করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে দেয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশের মাধ্যমে অনুসন্ধান করেও তার পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এর পরও মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলতে থাকে। ২০২২ সালের ১৩ জুন আদালত থেকে জামিন পান ‘সোনা মিয়া’ পরিচয় দেয়া ব্যক্তি। জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মামলার পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়।

কারাগারে নেয়ার দুই-তিনদিন পর সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করে জানান, তিনি ওই মামলার আসামি নন। তাকে কেন কারাগারে আনা হয়েছে, সে বিষয়েও তিনি কিছু জানেন না।

কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেলার মো. দেলোয়ার জাহান বলেন, ‘কারাগারে আনার পর রোলকলে সোনা মিয়া জানতে চান, কী অপরাধে তাকে এখানে আনা হয়েছে। তাকে জানানো হয়, তিনি মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। এ কথা শুনে তিনি বিস্মিত হয়ে জানান, কোনো মামলায় তিনি কখনো আসামি ছিলেন না এবং এর আগে কখনো কারাগারেও যাননি।’

পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, রমজান ও সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন। পরে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে তারা কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস শুরু করেন। কোনো একসময় সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন রমজানের কাছে থেকে যায়। সেই জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি ব্যবহার করেই রমজান নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়েন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সোনা মিয়াকে মুক্তি দেয়া হলেও তার ওপর কয়েকটি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। তাকে নিজের এনআইডি ও পাসপোর্ট আদালতে জমা দিতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিদেশ যেতে পারবেন না। এছাড়া প্রতি মাসের প্রথম মঙ্গলবার কক্সবাজার সদর থানায় হাজির হয়ে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। প্রতি তিন মাস পর সদর থানা সোনা মিয়ার উপস্থিতি ও অবস্থান-সংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করবে।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নাজির মো. বেদারুল আলম এসব নির্দেশনার কথা জানিয়েছেন। কারাগার থেকে মুক্তির পর সোনা মিয়া ও তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, ‘রোহিঙ্গা রমজানের সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই তাদের জীবনে এমন ভয়াবহ বিপদ নেমে এসেছিল। নিজের জন্মনিবন্ধন অন্যের হাতে চলে যাওয়ায় সে পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করা হয়।’

আরও