ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৬ চালুর পর সড়কপথে উত্তরা-মতিঝিল করিডোরে যাতায়াতের গতি খুব একটা বাড়েনি। গবেষণায় দেখা গেছে, এ সড়কপথে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। সড়কপথের যানজট কমাতে মেট্রোরেলের এ ভূমিকা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উত্তরা-মতিঝিল করিডোরে বাড়তে থাকবে যানবাহন, যা ধীরে ধীরে যাতায়াতের গতি কমিয়ে দেবে। জাইকা ওগাতা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমন তথ্য।
‘দ্য ইমপ্যাক্ট অব ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট অন রোড কনজেশন’ শিরোনামের গবেষণায় দেখানো হয়েছে, মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর উত্তরা-মতিঝিল সড়কপথে গাড়ির গতি কিছুটা বেড়েছে। অনেকে প্রাইভেট কার ও সড়কভিত্তিক যানবাহন বাদ দিয়ে মেট্রোরেলে যাতায়াত করছেন। ফলে রাস্তায় জায়গা খালি হয়েছে এবং গাড়ির গতি বেড়েছে।
গবেষণায় ঢাকায় মেট্রোরেল চালুর পর পরিবহন ব্যবহারের ধরন নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকরা গুগল ম্যাপসের বাস্তব সময়ের তথ্য ব্যবহার করে গাড়ির গতি পরিমাপ করেছেন এবং মেট্রোরেল চালুর আগে ও পরের ট্রাফিক ধরন বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, শুরুতে গাড়ির সংখ্যা ও যানজট কমে গেলেও এ সড়কপথে সময়ের সঙ্গে নতুন ট্রাফিক তৈরি হবে এবং যাতায়াতের গতি কমে আসবে।
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণে বাস্তবায়িত হয়েছে উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল। প্রকল্পটি এখনো চলমান। বর্তমানে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত অংশে লাইনটি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ঢাকার প্রথম মেট্রোরেলে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও করেছে জাইকা। নির্মাণকালীন পরামর্শক হিসেবেও রয়েছে এ সংস্থা।
যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক মনে করছেন, মেট্রোরেল চালুর পর নিচের সড়কের যানজট পরিস্থিতি কিছুদিন পর যে আবার আগের অবস্থায় চলে যাবে, তা জাইকার করা সমীক্ষাতেই উঠে আসার কথা ছিল। এমনটি যেন না হয়, সেজন্য যথাযথ সুপারিশও তাদের করা উচিত ছিল। জাইকা এ কাজটি করতে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্প গ্রহণের সময় জাইকা শুধু ভালো ভালো কথা বলেছে। ভবিষ্যতে কী হতে পারে, সে সম্পর্কে তাদের সমীক্ষায় প্রকৃত চিত্র উঠে আসেনি। মেট্রো-৬ প্রকল্প এলাকায় যানজট পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়ন না হওয়ার দায় জাইকার ওপরই বর্তায়। তারা কিন্তু এ ধরনের প্রকল্প নিজেদের দেশে সমন্বিতভাবেই বাস্তবায়ন করেছে। তাহলে বাংলাদেশে বিক্ষিপ্তভাবে শুধু মেট্রো করা হলো কেন?’
ঢাকায় বাস্তবায়নাধীন অন্য মেট্রো প্রকল্পগুলোয়ও একই পরিণতির আশঙ্কা করে তিনি বলেন, ‘কোনো এলাকায় শুধু মেট্রোরেল করেই যানজট কমানো যায় না, যাতায়াতের গতি বাড়ানো যায় না। এর জন্য সমন্বিতভাবে অনেকগুলো কাজ করতে হয়। মেট্রোরেলের পাশাপাশি সমন্বিতভাবে বিশেষায়িত বাস করিডোর, বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজের মতো ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়। এতে যেটা হয়, ওপরে মেট্রোরেল দিয়ে যাতায়াতে যত সময় লাগে, নিচের রাস্তায় বাসে চলাচলেও তত সময় লাগে। এ করিডোরে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের বাস। তাদের সবার কিন্তু মেট্রোতে ভ্রমণের সামর্থ্য থাকে না। এ ধরনের মানুষের জন্য কিন্তু বাসের মতো তুলনামূলক সাশ্রয়ী পরিবহন রাখার ব্যবস্থা করা দরকার।’ ভবিষ্যতে মেট্রো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়ার জন্য নীতি নির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকায় সব মিলিয়ে ছয়টি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে বিমানবন্দর-কমলাপুর ভায়া নতুন বাজার-পূর্বাচল মেট্রো (এমআরটি ১) ও হেমায়েতপুর-ভাটারা মেট্রোর (এমআরটি ৫, নর্দান রুট) কাজ চলমান রয়েছে। গাবতলী-আফতাবনগর-দাশেরকান্দি (এমআরটি ৫, সাউদার্ন রুট), গাবতলী-নিউমার্কেট-নারায়ণগঞ্জ (এমআরটি ২) ও কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের মদনপুরের মধ্যে আরেকটি মেট্রো (এমআরটি ৪) নির্মাণ পরিকল্পনাধীন রয়েছে।
মেট্রোর মতো প্রকল্প শহরের অন্যান্য পরিবহন এবং শহরের জমি ও অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বিত করা না হলে তা যানজট নিরসনে খুব একটা কার্যকরী হয় না বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোনো সড়কে যদি হঠাৎ করে যানজট কমে যায়, তখন মানুষের মধ্যে ওই সড়কটি বেশি ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়। ফলে দেখা যায়, কিছুদিন পর যানবাহনের চাপে যানজট পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় চলে যায়। বিশ্বজুড়েই পরিবহন ব্যবস্থায় এমন চিত্র দেখা যায়। ঢাকার মেট্রো ৬-এর ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সমন্বিত উন্নয়নের জন্য একটি নীতিমালা করা দরকার।’
অন্তর্বর্তী সরকার এমন কোনো নীতিমালা করছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে চার-পাঁচটি মন্ত্রণালয় পরিবহন নিয়ে কাজ করে। এতগুলো মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে সমন্বিত উন্নয়নের নীতিমালা প্রণয়ন করা একটি জটিল কাজ। আমার পরামর্শ থাকবে, পরবর্তী সময়ে যারা দেশের শাসনব্যবস্থার দায়িত্ব নেবেন, তারা যদি পরিবহন সম্পর্কিত সব কাজ একটি মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনতে পারেন, তাহলে এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়ন ও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।’