নাটোরে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। গতকাল ভোরের এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩২ জন। সড়কে এমন প্রাণহানি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রায়ই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪ হাজার ১৫৭ জন। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১৫ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দুর্ঘটনার সংখ্যা সামান্য কমলেও বেড়েছে নিহত ও আহত মানুষের সংখ্যা। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আগামীকাল পালিত হতে যাচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস।
বিআরটিএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দেশে ৪ হাজার ২৮৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৩১৮। অর্থাৎ দুর্ঘটনা কমেছে ৩৩টি বা দশমিক ৭৬ শতাংশ। তবে দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ২০২৫ সালের ৪ হাজার ১৫০ থেকে বেড়ে চলতি বছরে ৪ হাজার ১৫৭ হয়েছে। একই সময়ে আহতের সংখ্যা ৫ হাজার ২৩ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৯১-এ। ফলে দুর্ঘটনা কমলেও নিহতের সংখ্যা দশমিক ১৬ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা ৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়েছে।
বিআরটিএর দুর্ঘটনার তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিআরটিএর প্রকাশিত দুর্ঘটনার তথ্য অসম্পূর্ণ। দেশে প্রায় চার হাজার বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে। এর যেকোনো একটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীর হিসাব নিলেই বিআরটিএর প্রকাশিত বার্ষিক পরিসংখ্যানের সঙ্গে বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া যেতে পারে।’
তার ভাষ্য, বর্তমানে দুর্ঘটনা, নিহত ও আহত—তিনটি সূচকেই পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সড়ক নিরাপত্তার সমস্যা সমাধানে সরকার এখনো কার্যকর কৌশল নির্ধারণ করতে পারেনি বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
অন্যদিকে দেশে সড়ক অবকাঠামোর উন্নতি হলেও যানবাহন ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আসেনি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তিনি এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখনো ফিটনেসবিহীন ও জরাজীর্ণ বাস চলাচল করছে। পাশাপাশি রয়েছে অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ চালকের সমস্যা। ফলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সড়ক নিরাপত্তায় প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘দুর্ঘটনা কমাতে চালকদের দক্ষতা বাড়ানো, ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং মহাসড়কে দ্রুত ও ধীরগতির যানবাহন চলাচলের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। হালকা ও ভারী যানবাহনের গতির পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে সড়ক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পাশাপাশি বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।’
এদিকে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে চালকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিআরটিএ। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে মানুষ ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিআরটিএর উদ্যোগও জোরদার করা হচ্ছে। দক্ষ চালক তৈরিতে ৬০০ জনকে নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে সচেতনতামূলক কর্মসূচির পাশাপাশি টেলিভিশন ও ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্যচিত্র প্রচার করা হচ্ছে।’
চালকদের কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, একজন চালক একটানা সর্বোচ্চ ৫ ঘণ্টা গাড়ি চালাতে পারবেন। এরপর অন্তত আধা ঘণ্টা বিরতি দিতে হবে। দৈনিক সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানোর সুযোগ নেই। এ নিয়ম বাস্তবায়নে পরিবহন মালিকদের পর্যাপ্ত বিকল্প চালক নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে বিআরটিএ।’
এক সড়ক দুর্ঘটনায় ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর প্রাণ হারান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন। তার মৃত্যুর পর সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠে। সে ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তবে দিবসটি পালনের প্রায় এক দশক হতে চললেও এখনো নিশ্চিত করা যায়নি সড়কের নিরাপত্তা।
নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে গতকাল ভোর সাড়ে ৪টার দিকেও বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১৪ জন একসঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন। এ ঘটনায় আরো অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। তারা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
নিহতরা হলেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরহাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে বাসচালক সোহেল রানা (৩৫), একই জেলার বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া এলাকার বাবর আলীর ছেলে আনোয়ার হক (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার পূর্ব সুবিধখালী এলাকার আজাহার হাওলাদারের ছেলে শহিদুল ইসলাম, শহিদুল ইসলামের মেয়ে তাসফিয়া (৮), শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের জহিরউদ্দিন মাতবরের ছেলে জুয়েল মাতবর (৪০), একই উপজেলার ডুবি সাহিবর এলাকার ইউনুস শিকদারের ছেলে সোহাগ, (৩০) একই গ্রামের জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে শাহ লাল (৪৬), একই গ্রামের আরব আলার ছেলে আব্দুস সামাদ (৭০), একই উপজেলার কাশেম (৩৫), জহুর উদ্দিন ও কাথুরিয়া গ্রামের রাজ্জাক ব্যাপারীর ছেলে শাহিন (৩২), ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বড় মান্দারবাড়িয়া এলাকার জাকির হোসেনের ছেলে ট্রাকচালক আবু কালাম (৪৮), নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ঘোনটোলা এলাকার সাজ্জাদের ছেলে রাসেল এবং ফরিদপুর সদর থানার বাখোন্দিয়া এলাকার ওমর কুমার জমাদারের ছেলে হিমেশ জমাদার।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বরগুনা থেকে পঞ্চগড়গামী আরপি পরিবহনের যাত্রীবাহী একটি বাস ভোরে বড়াইগ্রাম এলাকায় পৌঁছলে পাবনাগামী বালি বোঝাই ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে নয়জন এবং বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো পাঁচজন মারা যান। এ ঘটনায় সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। তিনি বলেন, ‘নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ১ লাখ করে টাকা দেয়া হবে। এছাড়া যারা আহত হয়েছেন তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
এদিকে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শুধু জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও চালকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের কারিগরি মান ও ফিটনেস নিশ্চিত করা, ত্রুটিপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধ করা, চালকদের দক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাই এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে সড়কের নকশা ও অবকাঠামোগত ত্রুটি দূর করা, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, গতিসীমা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত যানবাহন পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগ এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাদের মতে, এসব উদ্যোগের সমন্বিত বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা গেলে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব হবে।
প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নাটোর প্রতিনিধি মাহবুব হোসেন