নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে জাল সিল-ভোট নিয়ে নতুন শঙ্কা

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের বাকি আছে মাত্র এক সপ্তাহ। এমন সময় ভোটের অবৈধ সিল জব্দ, জাল ভোটের শঙ্কা ও নির্বাচনী নিরাপত্তা সরঞ্জাম চুরির মতো ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের বাকি আছে মাত্র এক সপ্তাহ। এমন সময় ভোটের অবৈধ সিল জব্দ, জাল ভোটের শঙ্কা ও নির্বাচনী নিরাপত্তা সরঞ্জাম চুরির মতো ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে। বিভিন্ন দল ও প্রার্থীদের পক্ষ থেকে এসব নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন বলছে, সব ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে তাদের কঠোর নজরদারি রয়েছে।

মঙ্গলবার লক্ষ্মীপুর শহরের একটি ছাপাখানা থেকে ভোটে ব্যবহারের অবৈধ ছয়টি সিল, একটি কম্পিউটার ও একটি মুঠোফোন জব্দ করে সোহেল রানা নামে এক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় গতকাল লক্ষ্মীপুর সদর থানায় মামলা হয়েছে, যেখানে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর এক ওয়ার্ড সেক্রেটারিসহ দুজনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই রাজনৈতিক কর্মী সিল তৈরির অর্ডার দিয়েছিলেন—এমন তথ্য প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া গেছে। তবে তাকে গতকাল পর্যন্ত গ্রেফতার করা যায়নি। পুলিশ বলছে, জব্দ আলামত ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যের ভিত্তিতে সিল তৈরির পেছনের উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এসেছে। লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, ‘সিলগুলো যিনি বা যারা বানিয়েছেন, নিশ্চয়ই এর পেছনে অনেক কলকব্জা রয়েছে, একটা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের হিসাবনিকাশ রয়েছে।’

প্রতিটি কেন্দ্রে জাল ভোট ও জালিয়াতি বন্ধের ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়ে একইভাবে আরো অনেক সিল বানানো হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি আরো বলেন, ‘সিলের পাশাপাশি ব্যালট ছাপানোর ঘটনাও ঘটতে পারে।’

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী অভিযোগটি অস্বীকার করে বলেছে, গ্রেফতার ব্যক্তির সঙ্গে তাদের সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের নাম জড়ানো হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, সিলগুলো প্রশিক্ষণমূলক কাজে নাকি ভোট কারচুপির উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে—এমন দুইদিকই মাথায় রেখে তদন্ত চলছে।

নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে জাল সিল তৈরি এবং জাল ভোট নিয়ে শঙ্কার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লক্ষ্মীপুরে সিল উদ্ধার এবং এ ঘটনায় মামলা—বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাল ভোট বা জাল সিল নিয়ে এ মুহূর্তে আমরা নির্দিষ্ট কোনো আশঙ্কার কথা বলছি না, তবে ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, কারা জড়িত—এসব খতিয়ে দেখতে কঠোর তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া সিলের সঙ্গে নির্বাচনে ব্যবহৃত আসল সিলের মিল থাকার কথা নয়। আমাদের সিল আলাদা এবং এতে নির্দিষ্ট কোড ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য থাকে, যেগুলোর মাধ্যমে আসল-নকল সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব। তবে সার্বিকভাবে আমরা সতর্ক আছি। যেখানে এমন কিছু ধরা পড়বে, সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপচেষ্টা নিরুৎসাহিত হবে বলে আমরা মনে করি।’

জাল ভোট ও জাল সিলকে কেন্দ্র করে তাদের আশঙ্কার কথা জানাচ্ছেন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা। গতকাল বরিশাল নগরীর বেলস পার্ক ময়দানে বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিউজে আমরা কিছু খবর দেখতে পাচ্ছি। ওই যে যারা নতুন জালেম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, ওই যে যাদের বাংলাদেশের মানুষ গুপ্ত হিসেবে চেনে, আমরা দেখেছি কীভাবে তাদের লোকজন বিভিন্ন জায়গায় ভুয়া সিল তৈরি করছে, আমরা বিভিন্নভাবে শুনতে পাচ্ছি যে তাদের পরিচিত যেসব প্রেস আছে, সেখানে তারা ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছে, যেটি তারা পকেটে করে নিয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, আমরা এর মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি, বিশেষ করে নিরীহ মা-বোন যারা আছেন, তাদের কাছে গিয়ে তারা এনআইডি নম্বর নিচ্ছে, তাদের কাছে গিয়ে তারা বিকাশ নম্বর নিচ্ছে।’

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) সংগঠিত বিভিন্ন দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ বা তথ্যভিত্তিক জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলীম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লক্ষ্মীপুরে যে জাল সিল উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে, সেটিকে আপাতত ব্যক্তিগত উদ্যোগের বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই মনে হচ্ছে। এ মুহূর্তে এটিকে সংগঠিত কোনো বড় চক্রের কাজ বলে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে হবে—এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা। সার্বিকভাবে আসন্ন নির্বাচনে জাল ভোট বা এ ধরনের কারচুপির আশঙ্কা আছে বলে আমার মনে হয় না। কারণ নির্বাচনে অংশ নেয়া রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যেকেরই নিজ নিজ পোলিং এজেন্ট থাকবে, যারা কেন্দ্রে ও ভোটকক্ষে নজরদারি করবে। সবাই সতর্ক থাকলে এ ধরনের অনিয়ম করার সুযোগ খুবই সীমিত।’

এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার মাইজভান্ডার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র (কেন্দ্র নং ১০৫) থেকে নিরাপত্তা সরঞ্জাম চুরি হয়েছে। কয়েকদিন আগে বিদ্যালয়ের একাধিক কক্ষের তালা ভেঙে নেটওয়ার্ক ভিডিও রেকর্ডার (এনভিআর), রাউটার, মনিটরসহ আইপিএস, ব্যাটারি ও অন্যান্য মালামাল চুরি হয়। এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে প্রশাসন।

প্রায় ১৫ বছর মাঠ প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করেছেন সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে সরাসরি কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিল তৈরি করার বিষয়টি কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো দল করে এমনটা তার মনে হয় না। সাধারণত এসব স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীদের উদ্যোগেই হয়ে থাকে।’

তবে এভাবে সিল বানানোর ঘটনা তিনি আগে কখনো শোনেননি। আবদুল আউয়াল মজুমদার জানান, আগে ভোট কেন্দ্রে মূলত দুই ধরনের জালিয়াতি দেখা যেত। এক. একজন ভোটারের ভোট আরেকজন দিয়ে দেয়া। দুই. জোর করে কেন্দ্রে ঢুকে ব্যালটে সিল মেরে দেয়া। কিন্তু এবারের মতো ঘটনার কথা তিনি অতীতে কখনো শোনেননি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সামাজিক বাস্তবতা হলো, সুযোগ পেলে অনেকে অন্যায় করতে চায়। আর যখন বোঝে ধরা পড়ার ঝুঁকি আছে, তখন সরে যায়। তাই নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে, তা নির্ভর করছে সরকার, মাঠ প্রশাসন, সেনাবাহিনীসহ নির্বাচনসংশ্লিষ্টদের দৃঢ়তা ও সক্রিয়তার ওপর।’

আরও