রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের লাইনের ত্রুটিপূর্ণ ৭৩০ বিয়ারিং প্যাডের মধ্যে ২৭টিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ১৪৭টিকে সাধারণ ত্রুটিযুক্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। গতকাল সংসদ অধিবেশনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
মন্ত্রী বলেন, ‘মেট্রোরেলের ত্রুটিযুক্ত আরো ২৯৭ বিয়ারিং প্যাডের মূল সমস্যা স্থাপন প্রক্রিয়ার (ওয়ার্কম্যানশিপ) সঙ্গে সম্পর্কিত। স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটির প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, মেট্রোরেলের ৪৬ পিলারে বিভিন্ন মাত্রার ফাটল চিহ্নিত করা হয়েছে। অডিট কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী ৭৩০টি ত্রুটিযুক্ত বিয়ারিং প্যাডের সবই ঝুঁকিপূর্ণ নয়। জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে এবং যাত্রীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সরকার এরই মধ্যে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে।
রবিউল আলম বলেন, ‘এরই মধ্যে সরকারের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে—যেসব পিয়ারে বিয়ারিং প্যাড সরে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে, এমন ১০টি স্থানে “স্টিল ব্র্যাকেট” বসানো হয়েছে। এছাড়া বিয়ারিং প্যাডের বসে যাওয়ার মাত্রা পরিমাপের জন্য ২৭ স্থানে “সেটেলমেন্ট মার্কার” স্থাপন করা হয়েছে। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ২৭টি বিয়ারিং প্যাড প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে তা সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে ৪৬ পিয়ারে বিভিন্ন মাত্রার ফাটলের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং মেরামতের কৌশল নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) অবকাঠামো পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। মেট্রোরেলের কাঠামোর ফাটল পরিমাপ ও পর্যবেক্ষণের জন্য ১০২টি স্থানে “স্ট্রাকচারাল ক্র্যাক গেজ” বসানো হচ্ছে। আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে এ কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে।’
উল্লেখ্য, নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটির সুপারিশগুলো সময়মতো ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) গত ১৬ জুলাই ‘সেফটি অডিট রিপোর্ট রেকমেন্ডেশনস ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি’ গঠন করে। কমিটি সব বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিক বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি সুপারিশ করেছিল।
শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর ও ভৌতকাজ দ্রুত এগিয়ে নেয়ায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রকল্পের কাজ ২০২৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে শেষ করে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার আশা করা হচ্ছে। বিরোধী দলের (জামায়াতে ইসলামী) সদস্য মাহফুজা হান্নান (সংরক্ষিত নারী আসন-৪১) সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘আগের সাড়ে চার বছরে প্রকল্পটির জন্য মাত্র ১৮ শতাংশ ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছিল। গত ছয় মাসে তা বাড়িয়ে ৬৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। আগে ইউটিলিটি সেবা স্থানান্তরের কাজেও তেমন অগ্রগতি হয়নি। তবে বর্তমানে এ কাজেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। প্রকল্পের ভৌতকাজের অগ্রগতি আগে প্রায় ১৩ শতাংশ ছিল। গত ছয় মাসে তা বেড়ে ৩৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ শতভাগ সম্পন্ন হবে বলে আশা করছি। ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজও শেষ হবে।’
রবিউল আলম আশা প্রকাশ করেন, ‘প্রকল্পের ১৩টি প্যাকেজের আওতায় ভৌতকাজ চলছে।’
বিদ্যমান মহাসড়কের কয়েকটি অংশের বেহাল অবস্থা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি তিনি স্বীকার করে জানান, মহাসড়কের কয়েকটি অংশে জরুরি ভিত্তিতে মেরামত প্রয়োজন। মন্ত্রী বলেন, ‘একটি বড় মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প এরই মধ্যে চলমান থাকায় মেরামতকাজের ব্যয় নির্ধারণে কিছুটা জটিলতার মুখে পড়তে হয়েছে।’
পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানো এবং আয় বাড়াতে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে গত ছয় মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ রেলওয়ের আয় ২২৫ কোটি টাকা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। সরকারি দলের সদস্য লুৎফুর রহমানের (কক্সবাজার-৩) এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, ‘গত ছয় মাসে বাংলাদেশ রেলওয়ে গত বছরের তুলনায় ২২৫ কোটি টাকা বেশি আয় করেছে। ফলে লোকসানও ২২৫ কোটি টাকা কমেছে। চলতি বছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রেলওয়ের আর্থিক বোঝা কমাতে সরকার কাজ করছে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘রেলওয়ের অনেক রেললাইন ১৯৩০, ১৯৪০ ও ১৯৭০-এর দশকে স্থাপিত হয়েছে। পুরনো মিটার গেজ রেললাইনগুলোর কারণে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে কিছু রেলওয়ে সরঞ্জামের যন্ত্রাংশ এখন সহজে পাওয়া যায় না। আমরা এ ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছি।’
লাভজনক কক্সবাজার-ঢাকা রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘এ রুটে ট্রেন চলাচলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে বর্তমানে ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। কক্সবাজার-ঢাকা রেলসেবার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণে বর্তমানে মাত্র দুই জোড়া ট্রেন চলাচল করছে। ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহের জন্য সরকার এরই মধ্যে দুটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই এগুলো পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
কক্সবাজার রুটে বেসরকারি খাতে ট্রেন পরিচালনার জন্য সরকার বেশ কয়েকটি প্রস্তাব পেয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা ও বিবেচনা করছি। আশা করি, বেসরকারি খাতের উদ্যোগের মাধ্যমেও অল্প সময়ের মধ্যে এ লাভজনক রুটে ট্রেনসেবা নিশ্চিত করতে পারব।’