জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বছরে গড়ে ২০০ দিন বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রা বিরাজ করছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট সেন্ট্রাল। বুধবার (২৪ জুন) প্রকাশিত সংস্থাটির এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সময় ঝুঁকিপূর্ণ তাপ ও আর্দ্রতার মধ্যে বসবাসকারী দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ১৯৭০-এর দশকের পর থেকে বিশ্বজুড়ে বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ১৯৭০-এর দশকে বছরে গড়ে ১০ দিন এমন পরিস্থিতি দেখা গেলেও ২০১৬ থেকে ২০২৫ সময়ে তা বেড়ে ২৩ দিনে পৌঁছেছে। ১৯৭০ সালের পর বিশ্বব্যাপী রেকর্ড হওয়া বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রার প্রায় ৬৪ শতাংশ ঘটনার পেছনে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে প্রতিবেদনে আরো উদ্বেগজনক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সময়ে দেশে বছরে গড়ে ২০০ দিন বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। ১৯৭০-এর দশকে এ সংখ্যা ছিল ১৭৫ দিন। অর্থাৎ বর্তমানে বছরের অর্ধেকেরও বেশি সময় দেশের মানুষ স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ তাপ ও আর্দ্রতার মধ্যে বসবাস করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে অতিরিক্ত ৩০ দিন বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রা যুক্ত হচ্ছে। ১৯৭০-এর দশকে এই সংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচ দিন। একই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রার অংশ ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
দেশের প্রধান শহরগুলোতেও এ প্রভাব স্পষ্ট। রাজধানী ঢাকায় বছরে গড়ে ২১০ দিন বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রা অনুভূত হয়। এর মধ্যে ২৫ দিন সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যুক্ত হয়েছে। চট্টগ্রামে বছরে গড়ে ২১১ দিন এমন পরিস্থিতি দেখা যায় এবং এর মধ্যে ৩৬ দিন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যুক্ত হয়েছে। খুলনায় এ সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, বছরে গড়ে ২২৪ দিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উচ্চ তাপমাত্রা নয়, বাতাসের অতিরিক্ত আর্দ্রতাও মানবদেহের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। আর্দ্রতা বেড়ে গেলে ঘামের মাধ্যমে শরীরের স্বাভাবিক শীতল হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এতে পানিশূন্যতা, তাপজনিত অবসাদ, তাপঘাত, হৃদরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, বাইরে কর্মরত শ্রমিক এবং আগে থেকেই অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী গরমের সময়ে মানুষ বেশি পানি পান করতে গিয়ে অনেক সময় অনিরাপদ পানির উৎসের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। ফলে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে বিশ্বে চরম তাপমাত্রাজনিত কারণে আড়াই লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মতে, বাড়তে থাকা আর্দ্রতা তাপপ্রবাহকে আরো বিপজ্জনক করে তুলছে এবং অনেক অঞ্চলে পরিস্থিতিকে মানবদেহের সহনক্ষমতার সীমার কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে এ ঝুঁকি মোকাবিলায় তাপস্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা জোরদার করা, শ্রমিক সুরক্ষা বাড়ানো, নগর এলাকায় শীতলীকরণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু সহনশীল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।