আমরা পাহাড় কেটে বসতবাড়ি বানাই, গাছ কেটে বানাই কাগজ। আর ভাবি, প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাতে চলে এসেছে। আসলেই কি তাই? ২৬ আগস্ট তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালের রাসুয়া জেলায় হঠাৎ নেমে আসে ভয়াবহ ঢল। আজ সকাল পর্যন্ত নেপাল ও তিব্বতে অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, নিখোঁজ শত শত মানুষ। বাংলাদেশেও কি হতে পারে এমন ফ্ল্যাশ ফ্লাড?
ঘটনাটিকে প্রথমে ভূমিকম্প বলে মনে করা হয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) তাদের মূল্যায়ন সংশোধন করে জানায়, ভূকম্পন-সংকেতের উৎস ভূমিকম্প নয়, বরং একটি হিমবাহধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ। এ কারণেই নেপালের ঘটনাটিকে সরলভাবে প্রচলিত হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা বা জিএলওএফ বলা ঠিক হবে না।
হিমালয়— রক্ষক নাকি ভক্ষক
হিমালয় ইতিমধ্যে গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি)-এর তথ্যানুযায়ী, ২০১১-২০ সময়কালে হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত হারে বরফ হারিয়েছে। হিন্দুকুশ-হিমালয় দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে; হিমবাহ পিছু হটছে, হ্রদ বড় হচ্ছে, আর উচ্চভূমির ভূদৃশ্য ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। হিমবাহ পিছু হটলে নতুন ও বড় হিমবাহ-হ্রদ তৈরি হতে পারে। বরফ সরে গেলে জমাট উপাদানে স্থিতিশীল থাকা ঢালগুলো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। অতিবৃষ্টিতে অস্থিতিশীল মাটি জলসিক্ত হতে পারে। উচ্চ পর্বতগাত্র থেকে পাথর ও বরফ বিচ্ছিন্ন হতে পারে। কোনো তুষারধস নদী বা হ্রদে পড়ে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত পাহাড়ি ব্যবস্থাকে মুহূর্তে পরিণত করতে পারে বিধ্বংসী নিম্নমুখী স্রোতে। যার উদাহররণ আমাদের চোখের সামনে। এই কারণেই নেপালের বিপর্যয়কে বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় হিন্দুকুশ-হিমালয়জুড়ে হিমবাহ পিছু হটা, হিমবাহ-হ্রদের বিস্তার, অস্থিতিশীল ঢাল, অতিবৃষ্টি এবং অন্যান্য ক্রায়োস্ফিয়ার-সম্পর্কিত বিপদের সম্মিলিত ঝুঁকি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ভারত ঝুঁকিতে আছে?
ভারতীয় হিমালয়ে রয়েছে বহু ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ-হ্রদ, অস্থিতিশীল পাহাড়ি ঢাল, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক, সেতু, জনবসতি ও তীর্থপথ। ফলে হিমবাহ-সম্পর্কিত বিপর্যয় শুধু বন্যা না; তা পরিণত হতে পারে অবকাঠামোগত বিপর্যয়ের ধারাবাহিকতায়। তুষারধস নদীকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, বন্যা বাঁধ বা সেতু ভেঙে দিতে পারে, ধ্বংসাবশেষ নদীপথ আটকে দিতে পারে, সাময়িক হ্রদ তৈরি হতে পারে, পরে সেই হ্রদ ভেঙে আরেক দফা স্রোত নেমে আসতে পারে। ২০২৩ সালের সিকিমের ঘটনা দেখিয়েছে, এমন আন্তঃসংযুক্ত বিপর্যয় কতটা বিধ্বংসী হতে পারে।
বাংলাদেশকে গ্রাস করতে পারবে হিমালয়?
রাসুয়ায় যে ধরনের পাহাড়ি হিমবাহধস ঘটেছে, বাংলাদেশ সরাসরি সেই বিপদের মুখে নেই। বাংলাদেশের ভেতরে তুলনীয় হিমবাহ নেই; নেপালের কোনো হিমবাহধস থেকে নয় মিটার উঁচু ধ্বংসাবশেষের দেয়াল অক্ষত অবস্থায় হাজার কিলোমিটার পেরিয়ে বাংলাদেশের বদ্বীপে পৌঁছাবে, এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়।
কিন্তু মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ নদী-ব্যবস্থার নিম্নপ্রবাহে অবস্থিত। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা তিব্বত ও হিমালয়ের উচ্চভূমিকে বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপের সঙ্গে যুক্ত করেছে। উজানে সৃষ্ট পানি, পলি ও বন্যার ঢেউ শেষ পর্যন্ত নিম্নপ্রবাহের জলপ্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে পাহাড়ি বন্যা শত শত কিলোমিটার পেরোতে পেরোতে তার চরিত্র বদলে যায়— স্রোত ছড়িয়ে পড়ে, শক্তি হারায়, উপনদী ও প্লাবনভূমির সঙ্গে মিশে যায় এবং বৃহত্তর নদী-ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে। তাই বাংলাদেশের প্রশ্ন আসলে এই নয়, নেপালের হিমবাহ সুনামি কি এখানে পৌঁছাবে? প্রশ্নটি হলো— হিমালয়ের কোনো চরম ঘটনা এমন এক নদী-ব্যবস্থায় প্রবেশ করলে কী ঘটে, যেখানে ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি প্রবাহিত হচ্ছে?
এই কারণেই বাংলাদেশের বিদ্যমান বন্যা পূর্বাভাসব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রয়োজন নেই হাজার হাজার মিটার উঁচু হিমালয়ে কোনো হিমবাহধস সরাসরি শনাক্ত করার। প্রয়োজন উজানে কী ঘটছে, সে সম্পর্কে সময়মতো তথ্য এবং সেই তথ্যকে নিম্নপ্রবাহের সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে রূপান্তর করতে সক্ষম উন্নত মডেল। চ্যালেঞ্জটি তাই ক্রমেই হয়ে উঠছে সীমান্তপারের জলবিদ্যাগত বুদ্ধিমত্তার।
হিমালয় বিপর্যয়ের ভূ-রাজনীতি
গলতে থাকা হিমালয়ের ভেতরে একটি বৈপরীত্য লুকিয়ে আছে। স্বল্পমেয়াদে উষ্ণায়ন হিমবাহ পিছু হটা, হিমবাহ-হ্রদ বড় হওয়া এবং পাহাড়ি ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বরফ হারাতে থাকলে কিছু হিমবাহনির্ভর নদীকে টিকিয়ে রাখার মতো সঞ্চিত বরফ কমে যাবে। ফলে হিমালয়ী জলব্যবস্থা প্রথমে বর্ধিত অস্থিরতা ও বিপদের, পরে পানি-প্রাপ্যতা ও মৌসুমি প্রবাহ নিয়ে গভীর সংকটের রূপ নিতে পারে।
তাই হিমালয়ের ভবিষ্যৎ শুধু বন্যার গল্প নয়। এটি পানির নিরাপত্তা, কৃষি, জলবিদ্যুৎ, প্রতিবেশব্যবস্থা, অভিবাসন, অবকাঠামো এবং নিম্নপ্রবাহে বসবাসকারী কোটি মানুষের টিকে থাকার গল্প। আইসিআইএমওডি সতর্ক করেছে, হিন্দুকুশ-হিমালয়জুড়ে তুষার ও বরফ দ্রুত হারিয়ে যাওয়া পাহাড়ের অনেক দূরের জনপদ ও প্রতিবেশব্যবস্থাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
আসল বিপদ তাই কোনো একক হিমবাহ নয়। দূরবর্তী কোনো হিমালয়ী উপত্যকায় পাহাড় ধসে পড়তে পারে। প্রথম শিকার হতে পারেন নেপালের নদীতীরের মানুষ। এরপর তার অভিঘাত তিব্বত ও ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে, নিম্নপ্রবাহের নদী-পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল বিশাল জলব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পারে। বদ্বীপ থেকে হিমালয় হাজার হাজার মিটার উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকলেও তাদের যুক্ত করে রেখেছে পানি। নেপালের বিপর্যয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এটাই— দক্ষিণ এশিয়া আর হিমালয়ী দুর্যোগকে কেবল পাহাড়ের দুর্যোগ হিসেবে দেখার সামর্থ্য রাখে না। এগুলো অববাহিকার দুর্যোগ। এগুলো জলবায়ুর দুর্যোগ। এগুলো অবকাঠামোর দুর্যোগ। এবং শেষ পর্যন্ত, এগুলো আঞ্চলিক দুর্যোগ। হিমালয় বদলাবে কিনা, দক্ষিণ এশিয়ার সামনে এখন আর সেই প্রশ্ন নেই। হিমালয় ইতিমধ্যেই বদলে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, পানি পৌঁছানোর আগেই সেই পরিবর্তন দেখতে সক্ষম এমন একটি ব্যবস্থা কি নিম্নপ্রবাহের দেশগুলো গড়ে তুলতে পারবে?