পদ্মা সেতু চালুর পর রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে যাত্রী পরিবহনও। সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ব্যবহার করে গড়ে প্রতিদিন দুই হাজারের বেশি দূরপাল্লার বাস দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলাচল করে। সব মিলিয়ে গড়ে প্রতিদিন পাঁচ হাজার বাস চলাচল করে এ টার্মিনাল ঘিরে। যাত্রীর সংখ্যা লক্ষাধিক। যদিও মূল টার্মিনালের চেয়ে সংলগ্ন সড়কগুলোতেই যত ব্যস্ততা। ভেতরে সুনসান নীরবতা। কারণ বেশির ভাগ কোম্পানির বাস সড়কেই যাত্রী ওঠানামা করায়। টিকিট কাউন্টারও ভেতরের চেয়ে বাইরে বেশি। এতে টার্মিনালের সামনে ও আশপাশের সড়কগুলোয় সবসময় লেগে থাকে তীব্র যানজট।
সরেজমিন পরিদর্শন ও বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের ধারণক্ষমতা ৮০০-এর মতো। তবে এর কয়েক গুণ বেশি বাস এ টার্মিনালকে কেন্দ্র করে চলাচল করে। টার্মিনালে জায়গা না পেয়ে আশপাশের সড়কে পার্কিং করে যাত্রী ওঠানামা করায় অনেক কোম্পানির বাস। কিছু কোম্পানির বাস টার্মিনালে পার্কিং করে রাখা হয়। ফলে টার্মিনালটি এখন কেবল বাস পার্কিংয়ের স্থানে পরিণত হয়েছে। ভেতরে থেকে খুবই কমসংখ্যক যাত্রী বাসে ওঠানামা করে। সড়কে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা ছাড়াও গাড়ি ঘোরানো, একই সড়ক দিয়ে অনিয়ন্ত্রিত রিকশা-সিএনজির মতো ছোট যানবাহন চলাচলের ফলে সায়েদাবাদ এলাকায় দিন-রাত যানজট লেগেই থাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়িতে অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের। ফলে ভোগান্তি বাড়ছে সবার।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তথ্যমতে, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের ভেতরে ১১৫টি কাউন্টার রয়েছে। আর টার্মিনালের বাইরে সড়কের পাশে রয়েছে কমপক্ষে ১৭০টি বাস কাউন্টার। বড় কোম্পানিগুলোর একাধিক কাউন্টার রয়েছে টার্মিনালের বাইরে। এছাড়া স্বল্প দূরত্বের রুটগুলোয় চলাচল করা অনেক বাসের স্থায়ী কাউন্টার নেই। সড়কের পাশে চেয়ার-টেবিল নিয়ে সেসব বাসের টিকিট বিক্রি করা হয়।
যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টার্মিনাল যাদের পরিচালনা করার কথা, তারা নিজেদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছেন না। এ সুযোগে পরিবহন মালিকরা খেয়াল-খুশিমতো টার্মিনালের বাইরে কাউন্টার স্থাপন করছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সায়েদাবাদ টার্মিনালটি যাদের পরিচালনা করার কথা তারা ঠিকমতো তা করেন না। সেজন্য পরিবহন মালিকরা খেয়াল-খুশিমতো টার্মিনালের বাইরে কাউন্টার স্থাপন করেছে। আর টার্মিনালটিকে গ্যারেজের মতো করে ব্যবহার করছে। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলরা কাজ করলে টার্মিনাল হতো যাত্রীবান্ধব। এটি তো যাত্রীবান্ধব নেই। সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই, দেখারও যেন কেউ নেই। পৃথিবীর কোনো দেশে টার্মিনালের চেয়ে টার্মিনালের বাইরে বেশি টিকিট কাউন্টার পাওয়া যাবে না। সড়কে এভাবে যাত্রী ওঠানামা করার দৃশ্যও নেই।’
রোববার সরজমিনে দেখা যায়, টিটিপাড়া থেকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালসংলগ্ন মেয়র হানিফ ফাইওভারের নিচ পর্যন্ত সড়কে অসংখ্য গাড়ি দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে। পাশের টিকিট কাউন্টারগুলোয় যাত্রীদের বেশ ভিড় ছিল। এছাড়া কাউন্টারের বাইরেও বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীরা অপেক্ষা করছিল। পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে মৌখিকভাবে ভাড়া মিটিয়ে তারা বাসে উঠছে। অন্যদিকে জনপথ মোড়ের কাছে সড়কের পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা বাসগুলোয় স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের ডেকে বাসে তুলছিলেন পরিবহন শ্রমিকরা। যাত্রী দেখলেই নিজ বাসে তোলার প্রতিযোগিতা লেগে যায় পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে।
এর উল্টো দৃশ্য চোখে পড়েছে মূল টার্মিনালে। টার্মিনাল ভবনের নিচতলায় যাত্রীদের জন্য বানানো বিশ্রামের স্থানে একজন যাত্রীও পাওয়া যায়নি। সেখানে রাখা বেঞ্চগুলোয় টার্মিনালসংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োজিত চার-পাঁচজন বসে গল্প করছিলেন। তারা জানান, সেখানে এখন আর যাত্রীরা যায় না। বসেও না। সবসময় এমনই ফাঁকা থাকে। কিছু কিছু কাউন্টার বন্ধ হয়ে পড়ে আছে।
বাগেরহাটগামী একটি বাসের সুপারভাইজার বলেন, ‘টার্মিনাল থেকে টিকিট কেনার যাত্রী কমে গেছে। এখানে কম যাত্রী আসে। প্রায় সবাই রাস্তার কাউন্টার থেকেই টিকিট করে। বেশির ভাগ বাসও রাস্তা থেকে যাত্রী নিয়ে চলে যায়।’
সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অনুমোদন নিয়েই রাস্তায় টিকিট কাউন্টার স্থাপন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন টার্মিনালের কর্মীরা। তারা জানান, সরকারি সংস্থাগুলো অনুমোদন না দিলে কেউ টার্মিনালের বাইরে সড়কের পাশে বাস কাউন্টার চালু করত না। আর যাত্রী ওঠানোর জন্য কাউন্টারের সামনে বাস রাখতেই হবে। সিটি করপোরেশন ও পুলিশ সড়কের পাশে ‘বাস বে’ করে দিয়েছে। সেসব ‘বাস বে’তে বাস থামানো হয়।
বাস মালিক সমিতির তথ্য বলছে, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ও এর আশপাশের সড়ক থেকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার বাস চলাচল করে। যার মধ্যে অন্তত দুই হাজার দূরপাল্লার বাস রয়েছে। যেসব বাসের অধিকাংশই টার্মিনালের সামনে ও আশপাশের সড়ক থেকে চলাচল করে। আর সব মিলিয়ে সায়েদাবাদ টার্মিনাল এলাকায় বাসে প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষ আসা-যাওয়া করে।
যদিও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ও সায়েদাবাদ টার্মিনালের তত্ত্বাবধায়ক গোলাম ছরোয়ার দাবি করেছেন, পাঁচ হাজার নয়, গড়ে তিন হাজারের বেশি বাস সায়েদাবাদ টার্মিনাল ও সিটি বাস কাউন্টার থেকে চলাচল করে। আর তার হিসেবে গড়ে প্রতিদিন ৬০ হাজারের বেশি যাত্রী হয়।
টার্মিনালের বাইরে এত কাউন্টারের বিষয়ে সায়েদাবাদ টার্মিনালের তত্ত্বাবধায়ক গোলাম ছরোয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টার্মিনালে গাড়ি রাখার পর্যাপ্ত জায়গা আছে। আমাদের যে জায়গা আছে সেখানে দুই হাজার গাড়ি রাখা যাবে। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি গাড়ি চলাচল করায় সড়কে কিছুটা চাপ বেড়েছে, এটা সত্যি। তবে বড় যানজট যাতে না তৈরি হয় সেজন্য আমরা নজর রাখি। আন্তঃজেলা বাসগুলোর যাত্রী ওঠানামা করানোর জন্য সড়কে বাস বে তৈরি করে দেয়া হয়েছে। বাসগুলো সেই বাস বেতেই যাত্রী ওঠানামা করায়। সেখানে তারা আঘা ঘণ্টার বেশি বাস রাখতে পারেন না।’
যানজট নিরসনের লক্ষ্যে সায়েদাবাদ আন্তঃনগর বাস টার্মিনালটিকে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে সেখানে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। তবে নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের দায়িত্বশীল দপ্তরগুলো ঠিকমতো কাজ না করায় সায়েদাবাদ টার্মিনালের এমন নাজুক অবস্থা হয়েছে। পাশাপাশি কাঁচপুরে টার্মিনাল স্থাপন করলে ভোগান্তি আরো বাড়বে।
এ প্রসঙ্গে ড. সামছুল হক বলেন, ‘টার্মিনাল স্থানান্তরের চিন্তাটি অপরিপক্ব। যারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাদের গণপরিবহন সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। টার্মিনাল বড় করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? টার্মিনাল হলো একটি রোলিং বিষয়। মানে, বাস আসবে যাত্রী নামাবে, কয়েক মিনিটের মধ্যে যাত্রী উঠিয়ে আবার চলে যাবে। আমাদের দেশে টার্মিনালে বাস পার্কিং করে রাখা হয়। কিন্তু বাস তো ডিপোতে পার্কিং করে রাখার কথা। আমি বার্মিংহামে একটি টার্মিনাল দেখেছি যেখানে মাত্র পাঁচটি বাস থামতে পারে। সেখানে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। তাহলে আমাদের এত বড় টার্মিনালেও হচ্ছে না? অদক্ষ ও অপেশাদারদের সরিয়ে গণপরিবহন বোঝে এমন মানুষদের দিয়ে কাজ করাতে হবে।’
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সায়েদাবাদে পরিবহন মালিক সমিতির নেতৃত্বেও এসেছে পরিবর্তন। বর্তমানে তিশা পরিবহনের স্বত্বাধিকারী তাবারক হোসেন ভুঁইয়ার নেতৃত্বে কয়েকজন সমিতি পরিচালনা করছেন। টার্মিনালের এ দুরবস্থার জন্য আওয়ামী মনস্ক পরিবহন মালিকদের দায়ী করে তিনি বলেন, ‘তারা ব্যক্তি স্বার্থে কাজ করেছেন। সেজন্য টার্মিনালটি এত অবহেলিত হয়ে পড়েছে। নানা অব্যবস্থাপনার কারণে বাস কাউন্টারগুলো টার্মিনালের বাইরে চলে গেছে। আবার যত জায়গার দরকার তত জায়গা টার্মিনালে নেই। সেজন্য বাধ্য হয়েই অসংখ্য বাস টার্মিনালের বাইরে রাখতে হয়।’