গতকাল মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের এ উড়োজাহাজগুলো কিনতে চুক্তি সই করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদ এবং বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট পল রিঘি নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিপত্রে সই করেন। রাজধানীর একটি হোটেলে এ চুক্তি সই হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আফরোজা খানম। বিশেষ সম্মানিত অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। বিমানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য চুক্তিমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বা ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা (১ ডলারে ১২২ টাকা ৭৩ পয়সা হিসাবে)।
নতুন উড়োজাহাজগুলো কবে নাগাদ বিমানের বহরে যুক্ত হতে শুরু করবে এ বিষয়ে গতকালের অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট করে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। অবশ্য এর আগে বিমানের কর্মকর্তারা বণিক বার্তাকে জানিয়েছিলেন, বোয়িংয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী ২০৩১ সালের নভেম্বরে উড়োজাহাজগুলোর প্রথম চালান বাংলাদেশে পৌঁছবে এবং ২০৩৫ সালের অক্টোবরে সর্বশেষ উড়োজাহাজটি বিমানকে বুঝিয়ে দেয়া হবে।
বিমানের জন্য উড়োজাহাজ কেনা নিয়ে গত তিন বছর বোয়িং ও ইউরোপভিত্তিক উড়োজাহাজ নির্মাতা সংস্থা এয়ারবাসের মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা হয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কেনার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ দিকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) চুক্তির ফলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। শুল্ক চুক্তিতে বিমানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত উড়োজাহাজ, এর যন্ত্রাংশ ও সেবা ক্রয় বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ ছিল। এর অংশ হিসেবে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করল বিমান।
ক্রয় চুক্তি সম্পন্ন হওয়া ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজের মধ্যে আটটি ৭৮৭-১০ ও দুটি ৭৮৭-৯ মডেলের। গতকালের চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট পল রিঘি বলেন, ‘এ চুক্তির মাধ্যমে বিমান বাংলাদেশ বিশ্বের অল্প কয়েকটি উড়োজাহাজ সংস্থার একটি হতে যাচ্ছে যারা ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের পুরো ফ্যামিলি (৭৮৭-৮, ৭৮৭-৯ ও ৭৮৭-১০) পরিচালনা করবে।’ অন্যদিকে চুক্তির বোয়িং ম্যাক্স উড়োজাহাজগুলো ৭৩৭-৮ মডেলের।
বিমানের ১৪ উড়োজাহাজ কেনায় যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অর্থায়ন করছে বলে গতকাল অনুষ্ঠানে জানান বাংলাদেশে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন। তিনি বলেন, এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অর্থায়নের শর্তগুলো এমনভাবে সাজিয়েছে, যাতে বিমানের ওপর একবারে বড় কোনো আর্থিক চাপ না পড়ে এবং উড়োজাহাজ হাতে পাওয়ার সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে টাকা পরিশোধ করা যায়।
অনুষ্ঠানের দেয়া বক্তব্যে ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার শুল্ক চুক্তির প্রসঙ্গেরও অবতারণা করেন। তিনি বলেন, এ চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড বা এআরটির (পারস্পরিক শুল্ক চুক্তি) সুফল বা ‘উইন উইন’ প্রকৃতিরও প্রতিফলন ঘটায়। এই এআরটি আমাদের একটি আধুনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সুযোগ দেয়, যার অনেকগুলো ধারা দুই দেশের জন্যই সুবিধাজনক।’
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এর আগে ড্রিমলাইনার ও ম্যাক্স উড়োজাহাজগুলোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট পল রিঘি। তিনি বলেন, ‘৭৮৭-১০ মডেলটি মধ্যপ্রাচ্যসহ উচ্চ চাহিদার রুটগুলোতে অতুলনীয় দক্ষতা এবং বর্ধিত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে সক্ষম। আর ৭৮৭-৯ মডেলটি ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার দূরপাল্লার রুটগুলোতে সেবা দিতে সক্ষম। এ অর্ডারটি আমাদের সর্বাধুনিক প্রজন্মের ৭৩৭ ফ্যামিলিতে বিমান বাংলাদেশের প্রথম পদক্ষেপ। চারটি ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ বিমানের বহরকে আধুনিকীকরণ করার পাশাপাশি দক্ষভাবে বাংলাদেশকে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারতের গন্তব্যগুলোর সঙ্গে যুক্ত করতেও সক্ষম হবে।’
বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, ‘৭৮৭ ও ৭৩৭ ফ্যামিলির উড়োজাহাজ আগের উড়োজাহাজগুলোর তুলনায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি সাশ্রয়ী। এগুলো উন্নত কেবিন ফিচার, অধিক আরামদায়ক এবং সামগ্রিকভাবে মসৃণ ভ্রমণের মাধ্যমে যাত্রীদের অভিজ্ঞতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।’
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বোয়িং ৭৮৭-১০ মডেলের মতো বোয়িং ৭৮৭-৯ ও বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স সিরিজের উড়োজাহাজগুলো যাত্রীদের জন্য আরামদায়ক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করবে। এ মডেলগুলোয় বৃহদাকারের জানালা থাকায় বাইরের দৃশ্য হবে আরো উপভোগ্য, কেবিনের ভেতরের বাতাস থাকবে কম শুষ্ক। এছাড়া এর উন্নত প্রযুক্তি টার্বুলেন্স শনাক্ত করে ঝাঁকুনি কমাতে সাহায্য করবে। ফলে আকাশে যাত্রা হবে আরো স্বাচ্ছন্দ্যময়।
অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ‘বাংলাদেশ ধাপে ধাপে একটি আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন উড়োজাহাজগুলো যাত্রীদের অভিজ্ঞতাকে উন্নত করবে এবং আমাদের বর্তমান ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। এ অগ্রগতির ফলে আমরা জাপান, ইতালি, সিডনি, নিউইয়র্কসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে নতুন রুট চালু এবং যোগাযোগ সম্প্রসারণ করতে সক্ষম হব।’
নতুন উড়োজাহাজগুলো ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যুক্ত করা হচ্ছে জানিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বিমানের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুমি এ হোসেন বলেন, ‘আমরা ১৪টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছি এবং যাত্রী চাহিদা মেটাতে ২০৩৪-৩৫ সালের মধ্যে আমাদের বহর ৪৭টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ সম্প্রসারণের লক্ষ্য হলো সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন এবং পরিচালনার মাধ্যমে মুনাফা বাড়ানো। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস নতুন রুট চালু, পুরনো লাভজনক রুটগুলো পুনরুজ্জীবিত করা, পুরনো উড়োজাহাজ প্রতিস্থাপন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে। নতুন এ সংযোজনগুলোর ফলে বিমান আরো লাভজনক, যাত্রীবান্ধব এবং অধিক কার্গো বহনে সক্ষম হবে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদ বলেন, ‘জ্বালানি সাশ্রয়ী ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এ উড়োজাহাজগুলো বিমানের বহরকে আধুনিক করবে, কার্যক্ষমতা বাড়াবে এবং আন্তর্জাতিক রুটের পরিধি বিস্তৃত করবে, যা বিশ্ব এভিয়েশন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করবে।’
বর্তমানে বিমানের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯, চারটি বোয়িং ৭৮৭-৮, চারটি ৭৭৭-৩০০ ইআর, চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ও পাঁচটি ড্যাশ-৪০০ উড়োজাহাজ। অন্যদিকে ১৯টির মধ্যে বর্তমানে সক্ষম অবস্থায় থাকা উড়োজাহাজের সংখ্যা ১৪টি বলে জানিয়েছেন বিমানের কর্মকর্তারা। অভ্যন্তরীণ রুটের পাশাপাশি বর্তমানে ২২টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান। মালদ্বীপের মালে, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা, শ্রীলংকার কলম্বো ও অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে নতুন রুট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বিমানের।
সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন এবং দেশের বিমানবন্দরগুলোয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিষেবা দিয়ে ৯৩৭ কোটি টাকা মুনাফা (অনিরীক্ষিত) করে বিমান। ওই অর্থবছর ৩৪ লাখ যাত্রী ও ৪৩ হাজার ৯১৮ টন কার্গো পরিবহন করে সংস্থাটি। গত অর্থবছর মুনাফা দেখালেও বিপুল পরিমাণ দায় ও দেনা রয়েছে বিমানের। সংস্থাটির নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দায় ও দেনার পরিমাণ ১৪ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা, যার বেশির ভাগই বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের কাছে।