চিড়িয়াখানার দুর্দশা

রাজশাহীতে খাঁচা আছে, প্রাণী নেই

বড় বড় খাঁচা, দর্শনার্থীদের হাঁটার পথ, সবুজে ঘেরা পরিবেশ, পুকুর ও বসার জায়গা—সঙ্গে শিশুদের বিনোদনের নানা আয়োজন।

অবকাঠামো ও সৌন্দর্যবর্ধনে আধুনিক বিনোদন কেন্দ্রের আবহ তৈরি হলেও রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় নেই সেই প্রাণী, যাদের দেখতে দর্শনার্থীদের আগমন। দীর্ঘদিন ধরে বাঘ, সিংহ, হাতির মতো বড় প্রাণী না থাকায় ফাঁকা পড়ে আছে অনেক খাঁচা। এভাবে এ চিড়িয়াখানার বেশির ভাগ খাঁচাই খালি। দর্শনীয় পশুপাখি এখানে নেই বললেই চলে। ফলে রাজশাহী কেন্দ্রীয় চিড়িয়াখানায় ঘুরতে এসে পশুপাখি দেখার প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না দর্শনার্থীদের।

একসময় রাজশাহীর মানুষের বিনোদনের অন্যতম প্রধান স্থান ছিল এ চিড়িয়াখানা। শিশুদের কাছে বাঘ, সিংহ, হাতি, হরিণসহ নানা প্রাণী দেখার আকর্ষণ ছিল আলাদা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে চিড়িয়াখানাটিতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হলেও কমেছে প্রাণীর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য। বিশেষ করে বড় প্রাণী না থাকায় অনেক খাঁচাই এখন ফাঁকা পড়ে আছে। এতে চিড়িয়াখানাটির মূল আকর্ষণই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে।

জানা গেছে, ১৯৭২ সালে চালু হওয়া রাজশাহী চিড়িয়াখানাটি প্রায় ৩৩ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। ১৯৯৬ সাল থেকে এটি পরিচালনা করছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন। চিড়িয়াখানাটিকে আধুনিকায়নের উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২১ সাল থেকে প্রায় দুই বছর এটি বন্ধ রাখা হয়। এ সময় অবকাঠামো উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের বিভিন্ন কাজ করা হয়। তবে এ সময়ের মধ্যে ভেতরের কয়েকশ পুরনো গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। কয়েকটি পশুপাখির খাঁচা ভেঙে বিশাল জায়গাজুড়ে প্রবেশ পথের বাঁ পাশে করা হয়েছে নভোথিয়েটার ও গেস্ট হাউজ। এ নিয়ে সচেতন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলেছেন।

চিড়িয়াখানায় আসা শিশুদের কাছে প্রাণী দেখার আনন্দই সবচেয়ে বেশি। তাদের কল্পনায় চিড়িয়াখানা মানেই বাঘের গর্জন, সিংহের বিচরণ, হাতির বিশাল শরীর কিংবা হরিণের ছুটে চলা। কিন্তু রাজশাহী চিড়িয়াখানায় এসে সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় অনেক শিশুই হতাশ হচ্ছে।

চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসা শিশু হাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে জানায়, বাঘ ও সিংহ দেখার আগ্রহ নিয়েই সে পরিবারের সঙ্গে এখানে এসেছে। কিন্তু চিড়িয়াখানায় এসে বাঘ-সিংহ না পেয়ে তার মন খারাপ হয়েছে। সে বলে, ‘টেলিভিশন ও বইয়ে বাঘ-সিংহ দেখেছি, কিন্তু সামনে থেকে দেখার ইচ্ছা ছিল। এখানে এসে দেখি বাঘ-সিংহই নেই। হরিণ, বানরসহ কয়েকটি প্রাণী দেখেছি, কিন্তু বড় প্রাণীগুলো থাকলে চিড়িয়াখানায় ঘোরাটা আমাদের জন্য আরো বেশি আনন্দের হতো।’

আরেক শিশু আবিদা খাতুন প্রতিবেদককে বলে, ‘আসার আগে ভেবেছিলাম অনেক ধরনের পশু থাকবে। বড় বড় খাঁচা দেখে প্রথমে মনে হয়েছিল ভেতরে নিশ্চয়ই অনেক প্রাণী আছে। কিন্তু অনেক খাঁচাই খালি। তখন মনে হয়েছে, চিড়িয়াখানায় যদি প্রাণীই না থাকে, তাহলে এখানে আসার মজাটা কোথায়?’

শিশুদের সঙ্গে আসা অভিভাবক রফিকুজ্জামান বলেন, ‘জায়গাটি সুন্দর, বসার ব্যবস্থা আছে, শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু এগুলো তো চিড়িয়াখানার মূল বিষয় নয়। বাচ্চারা মূলত প্রাণী দেখতেই এখানে আসে। তাই প্রাণীর সংখ্যা বাড়ানো জরুরি।’

শুধু শিশুরাই নয়, বড়দের মধ্যেও চিড়িয়াখানার প্রাণী স্বল্পতা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। অনেক দর্শনার্থীর মতে, বর্তমানে জায়গাটি দেখতে সুন্দর হলেও চিড়িয়াখানা হিসেবে এর আকর্ষণ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এক দর্শনার্থী নাহিদ হোসেন বলেন, ‘আগে রাজশাহী চিড়িয়াখানায় এলে পশুপাখি দেখার জন্য এক খাঁচা থেকে আরেক খাঁচায় ঘুরতাম। তখন বাচ্চাদেরও অনেক আগ্রহ ছিল। এখন এসে দেখি কিছু প্রাণী আছে, কিন্তু বড় প্রাণী নেই বললেই চলে। ফলে বেশির ভাগ সময় আমরা হাঁটাহাঁটি করি, বসে থাকি, পরিবেশ দেখি। চিড়িয়াখানার বদলে জায়গাটিকে অনেকটা পার্কের মতো মনে হয়। অথচ পর্যাপ্ত পশুপাখি থাকলে এ জায়গাটি রাজশাহীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিনোদন কেন্দ্র হতে পারত।’

রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী ফাতিমা খাতুন বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে এসে জায়গাটা ভালোই লেগেছে। পরিবেশ সুন্দর, বসার জায়গা আছে, ঘোরার জন্যও জায়গা রয়েছে। কিন্তু চিড়িয়াখানা হিসেবে প্রাণীর সংখ্যা খুবই কম মনে হয়েছে। বিশেষ করে বড় কোনো প্রাণী না থাকায় পুরো জায়গাটির প্রতি আলাদা আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে না।’

চাকরিজীবী দর্শনার্থী আসলাম আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজশাহীতে পরিবার নিয়ে ঘোরার জায়গা খুব বেশি নেই। এ চিড়িয়াখানাটি সেই অভাব পূরণ করতে পারে। কিন্তু প্রাণী কমতে থাকলে মানুষ একবার-দুবার এসে আর আগ্রহ পাবে না।’

স্থানীয় বাসিন্দা আফজাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই এ চিড়িয়াখানাকে দেখে আসছি। আগে এখানে পশুপাখি দেখার জন্য মানুষ পরিবার নিয়ে আসত। বাচ্চাদের কাছে এটি ছিল খুব আকর্ষণীয় একটি জায়গা। এখন জায়গাটির অবকাঠামো কিছুটা উন্নত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রাণী কমে যাওয়ায় সেই পুরনো চিত্র আর নেই। মানুষ এখন অনেকটা পার্ক হিসেবে ঘুরতে আসে। উন্নয়ন অবশ্যই দরকার, কিন্তু চিড়িয়াখানার মূল আকর্ষণ যদি হারিয়ে যায়, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।’

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চিড়িয়াখানার জায়গা সীমিত। এটিকে সাফারি পার্কের মতো করে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই এখানে কী ধরনের প্রাণী রাখা সম্ভব, কত সংখ্যায় রাখা সম্ভব এবং প্রাণীগুলোর জন্য কী ধরনের পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে—এসব বিষয় বিবেচনা করেই পরিকল্পনা করতে হবে। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। কিছুসংখ্যক প্রাণী আনা যায় কিনা সে বিষয়ে পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রাণী এনে শুধু খাঁচায় রাখলেই হবে না; তাদের খাবার, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও পরিচর্যার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. এএম সালেহ রেজা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আধুনিক চিড়িয়াখানা পরিচালনা করতে হলে প্রথমেই দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান থাকতে হবে। কোন প্রজাতির প্রাণী রাখা হবে, তাদের জন্য কতটুকু জায়গা প্রয়োজন, কী ধরনের আবাসস্থল তৈরি করতে হবে, কী খাবার দিতে হবে এবং অসুস্থ হলে কীভাবে চিকিৎসা করা হবে—সবকিছু পরিকল্পনায় থাকতে হবে। শুধু বাঘ, সিংহ বা অন্য কোনো প্রাণী এনে খাঁচায় রেখে দিলেই চিড়িয়াখানা সমৃদ্ধ হবে না।’

তিনি বলেন, ‘প্রাণীর কল্যাণের বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ ও চলাফেরার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। নিয়মিত পরিচর্যা, পর্যাপ্ত খাবার, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রশিক্ষিত জনবলও দরকার।’

আরও