শুল্ক বেশি হলে ফাঁকির প্রবণতাও তৈরি হয়

বাংলাদেশে বাণিজ্য, শুল্ক ও করনীতি নিয়ে গত তিন দশকের আলোচনায় অন্যতম নাম ড. জাইদি সাত্তার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে পড়ানোর মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবনের শুরু। পরে তিনি সিভিল সার্ভিস, বিশ্বব্যাংক, পরিকল্পনা কমিশন এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গেও দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। শুল্ক সংস্কার, বাণিজ্য উদারীকরণ, কর ব্যবস্থা ও রফতানি প্রতিযোগিতা নিয়ে তার গবেষণা ও নীতিপরামর্শ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলছে। বণিক বার্তার অন্তর্দৃষ্টিতে তিনি কথা বলেছেন বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি ও বিদেশী বিনিয়োগ না আসার কারণ, অর্থনীতির ওপর উচ্চ শুল্ক ও জটিল ট্রেড রেজিমের প্রভাব এবং সামনের দিনের অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে।

৯০-এর দশকের পর বাংলাদেশ বাণিজ্য ও রফতানিতে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন দেখেছে। তবে বর্তমানে দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা শ্লথ হয়ে গেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রায় একই সময়ে যাত্রা করা ভিয়েতনাম তাদের রফতানি কয়েকশ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে। তাদের এক্সপোর্ট সাইজ এখন ৩০০-৪০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। থাইল্যান্ডও একইভাবে এগিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া তো আরো অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশ কেন রফতানি বাজারে পিছিয়ে পড়ছে?

দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ ধরলে দেখা যায়, দেশটি মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে একটি নিম্ন আয়ের অর্থনীতি থেকে উন্নত ও উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। আর এ রূপান্তর হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ৯০-এর দশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। ১৯৯১ সালে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার আগে ১৯৯০ সালে দেশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সহায়তা নিতে হয়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অর্থনীতির গতিপথ পরিবর্তনের লক্ষ্যে একাধিক মৌলিক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

এর আগে দেশের উন্নয়ন কৌশল ছিল আমদানি-প্রতিস্থাপনভিত্তিক, অভ্যন্তরীণ বাজারকেন্দ্রিক ও অন্তর্মুখী। ৯০-এর দশকে সংস্কারের মাধ্যমে সেটিকে রফতানিমুখী, বাজারভিত্তিক, আন্তর্জাতিক বাজারনির্ভর এবং বহির্মুখী অর্থনৈতিক কাঠামোতে রূপান্তর করা হয়। পাশাপাশি চলতি হিসাবের রূপান্তরযোগ্যতা, বিনিময় হার ব্যবস্থার নমনীয়তা, বিনিয়োগ উদারীকরণ এবং বিভিন্ন (ডিরেগুলেশন) নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার উদ্যোগ নেয়া হয়।

একই সময়ে গভীর কর সংস্কারও করা হয়। দেশীয় কর ব্যবস্থায় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) চালু হয়, যা সে সময় ব্যাপক রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখেও বাস্তবায়িত হয়। পাশাপাশি বাণিজ্য কর বা ট্রেড ট্যাক্স যৌক্তিকীকরণ ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা হয়।

তখন দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ ট্যারিফ লাইনে শুল্কহার ১০০ শতাংশের বেশি ছিল। ১৯৯১ সালে গড় শুল্কহার ছিল ৭৩ শতাংশ। পরবর্তী পাঁচ বছরে তা অর্ধেকেরও বেশি কমিয়ে ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে প্রায় ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। বাণিজ্য উদারীকরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এ বাণিজ্য উদারীকরণ প্রক্রিয়ায় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা অনেকেই উল্লেখ করেন। আপনি বলছিলেন, রফতানির ক্ষেত্রে যখন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা, নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা এবং বাজারমুখী অর্থনীতির দিকে যাওয়ার উদ্যোগ নেন, পরে সাইফুর রহমান এসে সেই প্রক্রিয়াকে আরো সম্প্রসারিত করেন, ভ্যাট চালু করেন। সে সময়ের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে যদি বলেন।

আমি তখন একজন তরুণ সরকারি কর্মকর্তা ছিলাম। জিয়াউর রহমান প্রথমে বাজারমুখী অর্থনীতি, বেসরকারীকরণ এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার চিন্তা করেছিলেন। তবে তিনি এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাননি।

১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পূর্ণ আস্থা ছিল অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের ওপর। অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনি হস্তক্ষেপ করতেন না। সাইফুর রহমান যে সিদ্ধান্ত নিতেন, তার সঙ্গে আলোচনা করে প্রধানমন্ত্রী তা সমর্থন করতেন। এ সমন্বয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একটি গণতান্ত্রিক সরকার যে সাহসী সংস্কার ও নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে পুরো অর্থনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে, তার একটি উদাহরণ তখন দেখা গেছে।

তখন কর ব্যবস্থা, বাণিজ্যনীতি ও বাজারমুখী অর্থনীতির ক্ষেত্রে যেসব গভীর সংস্কার করা হয়েছিল, সেগুলোর সুফল বাংলাদেশ ২০-২৫ বছর ধরে পেয়েছে। সেই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ছিল বিনিময় হারকে আরো নমনীয় করা। আমরা তো প্রায় ২০ বছর ধরে স্থির বিনিময় হারে আবদ্ধ ছিলাম। অনেকেই বিনিময় হারকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করেন না, কিন্তু স্থির বিনিময় হার থেকে নমনীয় বিনিময় হারে যাওয়ার ফলে রফতানি কার্যক্রমে বড় প্রভাব পড়েছিল।

একইভাবে আমদানি উদারীকরণও রফতানি বৃদ্ধিতে সহায়ক ছিল। ১৯৯১-২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে দুই অংকের রফতানি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। সে সময় বাংলাদেশকে উচ্চ কর্মক্ষমতাসম্পন্ন রফতানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

২০১০ সালে যখন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি বিশ্বে চতুর্থ স্থানে উঠে আসে, তখন ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বাংলাদেশকে ‘‌বাস্কেট কেস নো মোর’ বলে আখ্যায়িত করেছিল।

পরবর্তী সময়ে জেপি মরগানের মতো বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় ফ্রন্টিয়ার মার্কেট হিসেবে উল্লেখ করে, যেখানে বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে। তবে ২০১৬ সালের পর থেকে বাংলাদেশের রফতানি কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা দেখা যায়। ২০১৬-২০২৫ সালের মধ্যে রফতানি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে শ্লথ হয়ে যায়। একই সঙ্গে আমদানির প্রবৃদ্ধিও কমে আসে।

আমরা অনেক সময় শুধু রফতানি বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিই। কিন্তু বিষয়টি সেভাবে কাজ করে না। বাণিজ্যের সামগ্রিক তীব্রতা বা ‘ট্রেড ইনটেনসিটি’ বাড়াতে হয়। অর্থাৎ রফতানি ও আমদানি—দুটোকেই ভারসাম্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি করতে হয়। কারণ আমদানিকে যদি অতিরিক্ত সীমাবদ্ধ করা হয়, তাহলে রফতানিও কাঙ্ক্ষিতভাবে বাড়ানো সম্ভব হয় না।

আপনি খেয়াল করে দেখবেন, পূর্ব এশিয়ার যেসব দেশ উচ্চ কর্মক্ষমতাসম্পন্ন অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে, তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল উন্মুক্ত বাণিজ্য। শুধু রফতানি বৃদ্ধি নয়, তারা ব্যাপক বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে এবং সেই বিনিয়োগের ভিত্তিতে রফতানি সম্প্রসারণ করেছে।

ভিয়েতনামে প্রতি বছর প্রায় ১৮-২০ বিলিয়ন ডলার বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আসে, থাইল্যান্ডে ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অথচ বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে এটি ২ থেকে আড়াই বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে তা ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। যেখানে এফডিআই খুব সীমিত আকারে আসে, এ অবস্থায় আমরা কীভাবে একটি ট্রানজিট বা রফতানিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলব?

এনার্জি সেক্টরের পাওয়ার প্লান্টে বিদেশী বিনিয়োগ আসে বা আসছে। কারণ সেখানে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে বিডিংয়ের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। তবে শিল্প খাতে বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে যে এফডিআই আসে, তাদের প্রধান উদ্দেশ্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি করা নয়; বরং রফতানি করা। বাংলাদেশের শ্রম ব্যয়ের তুলনামূলক সুবিধাই তাদের মূল আকর্ষণ।

এ কারণেই দেখা যায়, রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) তুলনামূলকভাবে বেশি বিদেশী বিনিয়োগ আসে এবং এখনো অনেক বিনিয়োগকারী সেখানে আগ্রহী। কারণ সেখানে তারা একটি তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত বাণিজ্য পরিবেশ বা ফ্রি ট্রেড চ্যানেল পায়।

বর্তমানে বাংলাদেশের এফডিআই জিডিপির ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অনেকে এর পেছনে বিনিয়োগ পরিবেশ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ঘাটতি ইত্যাদি কারণ উল্লেখ করেন। তবে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা মূলত আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করেন—তা হলো দেশের ট্রেড রেজিম কতটা উন্মুক্ত বা কতটা সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশের ট্রেড রেজিম তুলনামূলকভাবে বেশ সীমাবদ্ধ। যেসব বিদেশী বিনিয়োগকারী রফতানিমুখী উৎপাদনের জন্য আসেন, তাদের কাঁচামালসহ বিভিন্ন উপকরণ আমদানি করতে হয়। যদি আমদানি ব্যবস্থা জটিল ও সীমাবদ্ধ হয়, তাহলে তাদের উৎপাদন কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়।

ইপিজেডের বাইরে এফডিআই না বাড়লে এর পূর্ণ সুফলও পাওয়া যায় না। কারণ এফডিআই শুধু মূলধন নয়, এটি প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগও নিয়ে আসে। অর্থাৎ এটি মূলত রফতানি সক্ষমতা বাড়ায়।

আপনি ১৯৯৭-২০০৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের কর সংস্কার নিয়ে কাজ করেছেন। তাহলে এ ব্যর্থতার জন্য আপনারও কি কিছু দায় নেই? কারণ আপনি এবং আপনার প্রতিষ্ঠান পিআরআই দীর্ঘদিন ধরে সরকারকে কর ব্যবস্থা ও বাণিজ্য নীতি সংস্কার বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে আসছেন।

আমি সবচেয়ে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলাম ১৯৯২-৯৫ সালের মধ্যে। তখন আমি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) বিশ্বব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছিলাম। সে সময় যে শুল্ক যৌক্তিকীকরণ ও শুল্ক হ্রাসের কথা বলেছিলাম, সেগুলো দ্রুত ও ব্যাপকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল। এনবিআরের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. আকবর আলি খানের সঙ্গে কাজ করে এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করেছি। তখন দেখেছি, শুল্ক কমানো সত্ত্বেও রাজস্ব আয়ে কোনো ক্ষতি হয়নি। পুরো ৯০-এর দশকে উল্লেখযোগ্য হারে শুল্ক কমানো হলেও রাজস্ব আয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ওই ১০ বছরে কাস্টমস রাজস্বের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ শতাংশ। এখন তো সব কমে গেছে।

পিআরআই ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে আমরা কর সংস্কার এবং শুল্ক সংস্কার নিয়ে ব্যাপক কাজ করেছি। নানা ধরনের পরামর্শ দিয়েছি। তবে পরামর্শ দেয়া আর সেই পরামর্শ বাস্তবায়ন হওয়া এক বিষয় নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আবুল মাল আবদুল মুহিত অর্থমন্ত্রী থাকাকালে আমাদের প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নিতেন। কিন্তু আমরা যতবারই বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরো উন্মুক্ত ও উদার করার পরামর্শ দিয়েছি, বাস্তবে সে ধরনের অগ্রগতি খুব বেশি দেখা যায়নি। এর পেছনে কী ধরনের বাধা ছিল, তা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। সেটি রাজনৈতিক ছিল কিনা, তাও জানি না।

শুল্ক কাঠামোর প্রবণতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশেষ করে ২০১০-২০২২ সালের মধ্যে ভোক্তা পণ্যের ওপর গড় শুল্কহার কার্যত কমেনি। বর্তমানে গড় নমিনাল শুল্কহার প্রায় ২৮ শতাংশ, যা ২০০৮ ও ২০০৯ সালেও একই পর্যায়ে ছিল।

বর্তমানে গড় বাণিজ্য করহার প্রায় ৫৫ শতাংশ। আমরা প্রায়ই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার কথা বলি। কিন্তু গড় বাণিজ্য করহার যদি ৫৫ শতাংশ হয়, তাহলে কার্যকরভাবে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর গড় বাণিজ্য শুল্কহার আনুমানিক শূন্য থেকে ৫ শতাংশ। ফলে যেকোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে যেতে আমাদের বর্তমান শুল্ক ও বাণিজ্য করের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে হবে।

আপনি যেহেতু নীতিনির্ধারণ ও সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ভেতর থেকে যুক্ত ছিলেন তাই জানতে চাই—সংস্কারের মূল বাধা কোথায়? এটি কি রাজনৈতিক মহল থেকে আসে, নাকি ব্যুরোক্রেটিক কাঠামো থেকে? আপনি বলছিলেন, সাইফুর রহমান একজন রাজনীতিবিদ হয়েও সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন। আবুল মাল আবদুল মুহিতও সংস্কারের পক্ষে ছিলেন এবং বিষয়গুলো শুনতেন। আবার আকবর আলি খানের মতো আমলারা সংস্কারকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। বর্তমান আমলারা তো দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতা রাখেন, আধুনিক ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত। তাহলে সংস্কারের ক্ষেত্রে এত প্রতিরোধ কেন?

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমি নিজেও প্রায়ই বিষয়টি নিয়ে ভাবি এবং সমস্যার উৎস কোথায়, তা বোঝার চেষ্টা করি। আমার পর্যবেক্ষণ হলো, সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ রয়েছে। এ প্রতিরোধ বাইরের কোনো পক্ষ থেকে আসছে না। আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক আমাদের সংস্কার করতে বাধা দিচ্ছে না। প্রশ্ন হলো, এ প্রতিরোধ তাহলে কোথা থেকে আসছে?

একটি উদাহরণ দিই। বহু বছর আগে কাস্টমস অটোমেশনের জন্য ইউএন সিস্টেমের তৈরি একটি সফটওয়্যার চালু করা হয়েছিল, যার নাম অ্যাসাইকুডা বা অটোমেটেড সিস্টেম ফর কাস্টমস ডেটা। ১৯৯৪ সালে কাস্টমসকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্দেশ্যে এটি চালু করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল সব লেনদেন ডিজিটালভাবে রেকর্ড করা, যাতে ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ার প্রয়োজন না হয়। এর মাধ্যমে পোস্ট-ক্লিয়ারেন্স অডিট, প্রি-শিপমেন্ট ক্লিয়ারেন্সসহ বিভিন্ন কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনা করার সুযোগ ছিল। পরবর্তী সময়ে এর উন্নত সংস্করণ এসেছে এবং বর্তমানে এর সর্বাধুনিক সংস্করণ ব্যবহার হচ্ছে। এ সফটওয়্যারের জন্য আমরা প্রতি বছর প্রায় ১১৫ হাজার ডলার ফি প্রদান করি। পাশাপাশি প্রতি পাঁচ বছর অন্তর লাইসেন্স নবায়নের জন্যও অর্থ ব্যয় করতে হয়। কিন্তু এতকিছুর পরও কাস্টমসের পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন বাস্তবায়ন হয়নি। প্রশ্ন হলো, কেন হয়নি?

কেন এখনো কাস্টমস কর্মকর্তাদের টেবিলে ফাইলের স্তূপ জমে থাকে। আসল সমস্যা হচ্ছে পণ্যের মূল্যনির্ধারণ বা ভ্যালুয়েশন। আমার মতে, কাস্টমস ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় জটিলতা এখানেই। অনেকে এইচএস কোড শ্রেণীবিন্যাসকে প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন, কিন্তু সেই সমস্যার সঙ্গেও ভ্যালুয়েশনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

একদিকে আমাদের শুল্কহার অনেক বেশি। শুল্ক বেশি হলে ফাঁকির প্রবণতাও তৈরি হয়। উচ্চ শুল্ক নিজেই সেই প্রণোদনা সৃষ্টি করে। একইভাবে শুল্ক কাঠামোকে জটিল করে তুললেও একই ধরনের প্রণোদনা তৈরি হয়। আমার পর্যবেক্ষণ হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুল্ক কাঠামো আরো জটিল হয়েছে। প্রতি বছরই নতুন নতুন জটিলতা যুক্ত করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—কাস্টমস অটোমেশন পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন? শুল্ক কাঠামো ক্রমাগত জটিল হচ্ছে কেন? আমার মনে হয়, অটোমেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার ভেতর থেকেই এক ধরনের প্রতিরোধ কাজ করছে। সেই প্রতিরোধের ফলেই শুল্ক কাঠামোকে আরো জটিল করা হচ্ছে এবং শুল্কহারও উচ্চ পর্যায়ে রাখা হচ্ছে।

এর সুবিধাভোগী কারা? কারণ যখন বাণিজ্য সম্প্রসারণের গতি কমে গেছে, তখন দারিদ্র্য হ্রাসের গতিও কমেছে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। অর্থনীতির আকার বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। একইভাবে বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগও (এফডিআই) কমে যাচ্ছে। তাহলে কারা এ পরিস্থিতির সুবিধাভোগী? কারা বাংলাদেশকে আটকে রাখতে চায়?

বাণিজ্য উদারীকরণের পর বাংলাদেশে রফতানি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। বাণিজ্য সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং দারিদ্র্য কমেছে। এ তিনটি বিষয়—জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য হ্রাস—পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আর এর অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, যার সূচনা হয়েছিল ১৯৯০-এর দশকে। তাহলে প্রশ্ন হলো, সমস্যাটা কোথায়?

আপনি যে প্রতিরোধের কথা বলছেন, সেটি আসলে কোথা থেকে আসে? কেন বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি সীমিত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে? কেন ধীরে ধীরে আরো জটিলতা তৈরি হচ্ছে এবং ব্যবসার পরিবেশ কঠিনতর হয়ে উঠছে?

আপনি যে ‘‌বেনিফিশিয়ারি’ প্রসঙ্গ তুলছেন, সেটি বোঝার জন্য একটি বাস্তব চিত্র দেখা জরুরি। ১৯৯০-এর দিকে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ। ২০১৮ সালের দিকে এটি নেমে আসে প্রায় ১৮ শতাংশে। এ অগ্রগতির পেছনে একটি বড় ভূমিকা ছিল বাণিজ্য উন্মুক্তকরণ এবং বাজারমুখী অর্থনীতির। তাহলে প্রশ্ন আসে, গত ১০ বছরে আমদানি-রফতানি প্রবৃদ্ধি কেন ধীর হয়ে গেল? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ পরিবর্তনের সঙ্গে নীতি, কাঠামো এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তর জড়িত এবং সেখান থেকেই বোঝার বিষয়টি শুরু হয়।

অনেকেই যুক্তি দেন যে ট্রেড রেজিম লিবারেল হলে শিল্পায়ন হবে না। এ সময়ে তো দেশে প্রচুর শিল্পায়নও হয়েছে। আমাদের সিমেন্ট, স্টিল, সিরামিক এফএমসিজি খাতসহ অনেক বড় উদ্যোক্তারা পুরনো বহুজাতিক অনেক সংস্থাকে বাংলাদেশের বাজার থেকেই তাড়িয়ে দিয়েছে। সুতরাং কেন এ পারসেপশন? বাংলাদেশে কেন এখনো এ ধারণা রয়েছে যে বাণিজ্য ব্যবস্থাকে জটিল ও সুরক্ষিত রাখলে শিল্পায়ন টিকে থাকবে, কিন্তু এটি উন্মুক্ত করে দিলে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে?

এ ধারণাটি নতুন নয়; এটি অনেক পুরনো এবং এখনো বিভিন্ন পর্যায়ে বিদ্যমান। স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক দশকে আমরা মনে করতাম, আমদানি-প্রতিস্থাপনভিত্তিক শিল্পায়ন দেশকে শিল্পোন্নয়ন এবং উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এখনো ব্যবসায়ী মহলের একটি বড় অংশ, এমনকি কিছু পেশাজীবী গোষ্ঠীও বিশ্বাস করেন যে দেশকে একটি উচ্চমাত্রায় সুরক্ষিত অর্থনীতি হিসেবে পরিচালনা করতে হবে, যেখানে মূলত অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভর করে শিল্পায়ন হবে।

কিন্তু বিশ্বের এমন একটি দেশও দেখানো কঠিন, যে দেশ ন্যূনতম ১০ বছর বা তারও দীর্ঘ সময় ধরে ৭-৮ শতাংশ বা তার বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, অথচ বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে নিজেকে একীভূত করেনি।

চীন, পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এবং ভিয়েতনামের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। চীন টানা কয়েক দশক ধরে দুই অংকের উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যার ভিত্তি ছিল বিশ্ববাজারের সঙ্গে গভীর সংযুক্তি।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের অভিজ্ঞতাও একই। এ খাত শুরু থেকেই তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত বাণিজ্য সুবিধা পেয়েছিল। এর ফল হিসেবে রফতানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মতো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। তৈরি পোশাক খাত এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যেখানে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্তি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বাংলাদেশের এখনো অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট নেই কেন? আর যখন কোনো ট্রেড এগ্রিমেন্টের কথা আসে, দেশের ভেতরে তখন অনেক সময় ‘‌সার্বভৌমত্ব হারানোর’ বা ‘‌সারেন্ডার’ করার আশঙ্কা তৈরি হয়—এ পারসেপশন কেন দেখা যায়?

ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট বলতে সাধারণত শূন্য থেকে প্রায় ৫ শতাংশ শুল্কের মধ্যে একটি বড় পরিসরের পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো বা তুলে দেয়া বোঝায়, যেখানে হাজার হাজার পণ্য অন্তর্ভুক্ত থাকে। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই যুক্তি দেন—যখন এরই মধ্যে বিভিন্ন বাজারে শূন্য বা কম শুল্কে কিছু সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, তখন পূর্ণাঙ্গ ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের প্রয়োজন কতটা? আরেকটি বাস্তবতা হলো, যেসব খাত তুলনামূলকভাবে সুরক্ষা চায়, তারা সাধারণত ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের বিরোধিতা করে। যারা এর বিরোধিতা করে তারা তো রফতানি করে না।

কেউ কেউ যুক্তি দেন যে উন্নত দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, এখন আবার মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার পথ থেকে সরে এসে ট্যারিফ আরোপ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া এমওইউ ধরনের বাণিজ্য আলোচনায়ও দেখা গেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত হিসেবে পারস্পরিক ট্যারিফ হ্রাসের বিষয় এসেছে। তাহলে এ বাস্তবতায় মুক্ত বাণিজ্যের পক্ষের যুক্তিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? আমরা আসলে কীভাবে ট্রেড বাড়াব, কার সঙ্গে ট্রেড বাড়াব? ইউএসএ, চায়না নাকি ভারতের সঙ্গে? এ আলোচনাগুলো বাংলাদেশে কীভাবে হ্যান্ডেল করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

এ পরিস্থিতির এক ধরনের সরল ব্যাখ্যা আছে, আবার কিছুটা জটিল বাস্তবতাও আছে। যুক্তরাষ্ট্রই ছিল বিশ্ব অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করার নেতৃত্বে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, মন্দার সময়ে তারাই এক ধরনের উচ্চ ট্যারিফভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। এরপর ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংকুচিত হয়ে যায় এবং বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রই সেই অবস্থার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে এবং বিশ্ব বাণিজ্যকে একটি নিয়মভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে, যার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। এ ব্যবস্থার মূল নীতি ছিল ট্যারিফ ও বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতাগুলো ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা।

১৯৪৫ সালের পর থেকে প্রায় ৭৫ বছর ধরে এ কাঠামোর মধ্যেই বিশ্ববাণিজ্য পরিচালিত হয়েছে। ধীরে ধীরে বৈশ্বিক শুল্কহার কমেছে এবং বাণিজ্য অনেক বেশি উন্মুক্ত হয়েছে। বর্তমানে বৈশ্বিক গড় শুল্কহার প্রায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে।

বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ নিচ্ছে বা দিচ্ছে সেটা বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতি বা লক্ষ্য হওয়া উচিত না। বাংলাদেশের ট্রেড পলিসি ওরিয়েন্টেশন হচ্ছে আমাদের এক্সপোর্ট মার্কেটের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক প্রোগ্রেস আনতে হবে। কারণ আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি খুব বড় না, বিশ্ববাজারের সঙ্গে এলাইন করতে হবে—যেখানে পোশাক শিল্পের মার্কেট ৫০০-৬০০ বিলিয়ন ডলার, ফুটওয়ার মার্কেট ২৫০ বিলিয়ন ডলার এছাড়া অন্যান্য কৃষিভিত্তিক মার্কেট যেগুলোর বাজার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেও চীন, জাপান, আসিয়ানভুক্ত দেশের বাজারে বাণিজ্য খুব বেশি বাড়াতে পারেনি। আমাদের রফতানি বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউভিত্তিক। এখন যদি ইইউ বলে আমাদেরও কনসেশন দিতে হবে, এটাকে কীভাবে বাংলাদেশ নেভিগেট করবে? নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি বাণিজ্যিক চুক্তি হয়েছে, যা নিয়ে অনেকের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে এতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা ‘সারেন্ডার’ করা হয়েছে। একজন ট্রেড ইকোনমিস্ট হিসেবে আপনি বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

আমি বিষয়টি মূলত ট্রেড ইকোনমিস্ট হিসেবে দেখব। তবে এখানে কিছু ভূরাজনৈতিক (জিওপলিটিক্যাল) দিকও রয়েছে, যেগুলো জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। সেই অংশটি আলাদাভাবে বিবেচনার বিষয়।

ট্রেড অংশের দিকে তাকালে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানটি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। তারা বলছে, দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চলছে, যেখানে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে ট্রেড সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত ভোগ করছে।

তাদের যুক্তি হলো, এ বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান এবং এর একটি কারণ হলো উচ্চ শুল্ক কাঠামো। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, বাংলাদেশে প্রবেশ করতে তাদের পণ্যের ওপর গড়ে প্রায় ৫৫ শতাংশের মতো শুল্ক ও করের চাপ রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শুল্ক অনেক কম—প্রায় আড়াই শতাংশের কাছাকাছি। এ পার্থক্যের ভিত্তিতেই তারা পারস্পরিক সমতার যুক্তি সামনে এনেছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বলা হচ্ছে, এটি কার্যকর হলে প্রায় ৫,০০০ ট্যারিফ লাইনে ধাপে ধাপে শূন্য শুল্ক প্রযোজ্য হবে। পরবর্তী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আরও প্রায় আড়াই হাজার পণ্যের ওপর শুল্কও শূন্যের দিকে নামিয়ে আনার কথা রয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, আগামী এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানি পণ্যের শুল্ক অনেকাংশে শূন্যের কাছাকাছি চলে যাবে।

আমেরিকার সঙ্গে এ মুহূর্তে কিছু নেগোসিয়েশন চলছে। যদি বাংলাদেশ সেটা গ্রহণ করে ফেলে তাহলে ইইউ বলতে পারে, আমরা তো অনেক বছর ধরে জিরো ট্যারিফ, কোটা ফ্রি সুবিধা দিচ্ছি। আমেরিকাকে দিলে আমাদেরও দিতে হবে। যদিও তারা চাপ দিচ্ছে না। আমাদেরও ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট চাওয়া উচিত ইইউর সঙ্গে। ভারত, ভিয়েতনাম এরই মধ্যে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট চুক্তি করেছে। আমরা যদি এখনই ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট না করি, সামনে আমাদের এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়, আমাদের অবস্থা আরো খারাপ হবে।

আমরা দেখছি, বাংলাদেশে উচ্চ শুল্ক ও উচ্চ করহার থাকা সত্ত্বেও রাজস্ব আদায় বাড়ছে না। উদাহরণ হিসেবে আপেলের মতো পণ্যে প্রায় ১০০ শতাংশের বেশি শুল্ক বা গাড়ির ক্ষেত্রে অত্যন্ত উচ্চ করহার রয়েছে। অথচ করের ভিত্তি সম্প্রসারণ হচ্ছে না। এমনকি করপোরেট ট্যাক্সও তুলনামূলকভাবে উচ্চ। আপনি কি মনে করেন, এটি একটি অদক্ষ কর ব্যবস্থা?

এ অবস্থা প্রমাণ করে যে আমাদের ব্যবস্থায় কার্যকরী দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। উচ্চ শুল্কের একটি বড় সমস্যা হলো এটি কর ফাঁকির প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে রাজস্ব লিকেজও বেড়ে যায়। করহার বা ট্যারিফের একটি ‘অপটিমাল লেভেল’ থাকে। তার বাইরে গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। বর্তমানে যে গড় শুল্কহার প্রায় ৫৫ শতাংশ, সেটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অনেক বেশি। এটি শুধু তাত্ত্বিক বিষয় নয়, বাস্তব অর্থনীতিতেও এর প্রভাব স্পষ্ট। ইতিহাসে দেখা যায়, মুসলিম দার্শনিক ইবনে সিনা বহু শতাব্দী আগেই বলেছিলেন—সরকার যদি অতিরিক্ত উচ্চ কর আরোপ করে, তাহলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম কমে যায়। অর্থনৈতিক কার্যক্রম কমে গেলে শেষ পর্যন্ত রাজস্বও কমে যায়। আমাদের এখানে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই পর্যবেক্ষণের মিল দেখা যায়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত অর্থনীতিতেও এখন এ বিতর্ক রয়েছে যে অতিরিক্ত উচ্চ করহার কার্যকর নয়।

আমরা এখন বর্তমান সরকার প্রসঙ্গে আসি। আপনি বলছিলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার ও প্রাইভেট সেক্টরকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে বিএনপি অতীতে তুলনামূলকভাবে প্রো-প্রাইভেট সেক্টর অবস্থান নিয়েছিল। তারা কি এবারো সেই ভূমিকা রাখতে পারবে? তাদের প্রথম বাজেটে কী ধরনের দিকনির্দেশনা দেখা যেতে পারে? অথবা একজন ট্রেড ইকোনমিস্ট হিসেবে আপনার পরামর্শ কী?

মূল বিষয়টি খুব পরিষ্কার—ট্যাক্স বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব নয়। যেকোনো ধরনের কর—প্রত্যক্ষ কর, পরোক্ষ কর বা অন্য যেকোনো করের ক্ষেত্রে ট্যাক্স রেট বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত, বরং রাজস্ব বাড়াতে হলে করহার নয়—করের ভিত্তি সম্প্রসারণ করতে হবে। বিশেষ করে বাণিজ্য করের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো স্পষ্ট। আমাদের প্রস্তাব ছিল, ব্যক্তিগত আয়করের সর্বোচ্চ প্রান্তিক হার ২৫ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। বর্তমানে এটি প্রায় ৩০ শতাংশ, এবং এর ওপর আবার সারচার্জ যুক্ত আছে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে করহার বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির কোনো কার্যকর সম্ভাবনা নেই। রাজস্ব বাড়ানোর মূল পথ হলো করের আওতা বৃদ্ধি করা। বর্তমানে ব্যক্তিগত আয়করের বাইরে এখনো দেশের মধ্যে লাখ লাখ মানুষ রয়েছেন, যাদের করজালের মধ্যে আনা সম্ভব হয়নি। সেটিই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। নীতিগতভাবে সরকারের উচিত নতুন কর আরোপ বা করহার বৃদ্ধি না করে বিদ্যমান ব্যবস্থার সংস্কার করা। বিশেষ করে বাণিজ্য কর, ব্যক্তিগত আয়কর এবং করপোরেট কর—এ তিন ক্ষেত্রেই পুনর্বিবেচনা ও সংস্কারের যথেষ্ট সুযোগ আছে।

শেষ প্রশ্ন হিসেবে বর্তমান অর্থমন্ত্রী সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই। আপনি প্রায় ১০০ দিন ধরে তাকে পর্যবেক্ষণ করছেন। আপনার দৃষ্টিতে তিনি কতটা সম্ভাবনাময় বা ‘‌প্রমিজিং’? নাকি তিনি আবারো ব্যুরোক্রেটিক জটিলতায় আটকে পড়তে পারেন?

নতুন অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের বেশকিছু আলোচনা হয়েছে। তিনি যথেষ্ট সময় দিয়েছেন। আমি আগে থেকেই তাকে চিনি। তার চিন্তাভাবনা স্পষ্ট। তিনি কিছুটা হলেও বাস্তব প্রভাব তৈরি করতে চান।

দ্বিতীয়ত, তিনি প্রো-বিজনেস মনোভাবের। ব্যক্তি খাতের সমস্যা কোথায়, ব্যবসায়িক পরিবেশের সীমাবদ্ধতা কোথায় এগুলো তিনি বোঝেন। কর ব্যবস্থার সমস্যাগুলো নিয়েও তার কিছু পরিবর্তন আনার ইচ্ছা আছে বলে আমার মনে হয়েছে। আমি তুলনা করি ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের সঙ্গে। তখন একটি রাজনৈতিক সরকার কঠিন রাজনৈতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও ভ্যাট প্রবর্তনের মতো মৌলিক সংস্কার করেছিল। আমি আশা করি, বর্তমান সরকার এবং অর্থমন্ত্রীও কর ব্যবস্থাপনা ও কর কাঠামোতে কিছু মৌলিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেবেন। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অর্থমন্ত্রীর প্রয়োজনীয় ব্যুরোক্রেটিক সাপোর্ট সিস্টেম গড়ে তোলা। এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, গত দুই-তিন মাসে কর সংস্কারের জন্য পূর্ণাঙ্গ একটি টিম পুরোপুরি গঠন করা যায়নি। তবে অর্থমন্ত্রীর মধ্যে এ উপলব্ধি আছে যে একটি সংস্কারমুখী কর টিম গঠন করা দরকার, যারা একদিকে রাজস্ব বাড়াবে এবং অন্যদিকে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করবে। এ চ্যালেঞ্জটিই এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় বিষয়। কারণ দেশে বিদ্যমান ট্রেড রেজিমের কারণে অর্থনৈতিক অবস্থা স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে।

আরও