নরসিংদীর পাঁচটি আসনই একসময় বিএনপির দখলে ছিল। তবে ২০০৮-২০২৪ সাল পর্যন্ত চারটি নির্বাচনেই আসনগুলোতে আওয়ামী লীগ একক আধিপত্য বজায় রেখেছিল। যদিও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভোটের হিসাব-নিকাশ বদলে গেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় এবার নির্বাচনে মাঠে নেই আওয়ামী লীগ। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পুরনো দুর্গ ফিরে পেতে চাইছে বিএনপি। তবে সেক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন বিদ্রোহী প্রার্থী। কারণ দুটি আসনে দলের দুই প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। যদিও আসনগুলোতে দলটির শক্ত অবস্থান রয়েছে। অন্যদিকে ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন জামায়াত, এনসিপি, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলের প্রার্থীরা।
তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনে নরসিংদীর পাঁচটি আসনে ৪৬ প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। যাচাই-বাছাইয়ে বৈধ প্রার্থী ঘোষিত হয়েছেন ৪১ জন। বিভিন্ন কারণে পাঁচজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
অধিকাংশ তরুণ ভোটার মনে করেন, এবারের ভোট হবে তারুণ্যের শক্তির। নতুন ও তরুণ ভোটারদের ভোটের মাধ্যমেই যোগ্য ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন। পাশাপাশি যারা তাদের জন্য কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব দূরীকরণের চিন্তা করেন, তাদেরই ভোট দেবেন।
বেসরকারি চাকরিজীবী ওসমান বলেন, ‘এবারের ভোট হবে চিন্তা ও ভাবনার। যারা দেশ ও দশের কল্যাণে কাজ করবে, পাশাপাশি বৈষম্য দূর করে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর করতে পারবে, তাদেরই ভোট দেব।’
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে নরসিংদী-১ (সদর) আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পালাক্রমে জয় পেয়েছে। তবে এবার আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। আসনটিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা বিএনপি সভাপতি খায়রুল কবির খোকন ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মো. ইব্রাহিম ভূঁইয়া। খায়রুল কবির খোকন এ আসনে উপনির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ইব্রাহিম ভূঁইয়া ইসলামী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও জামায়াত নেতা। দুজনের বাড়ি একই ইউনিয়ন চিনিশপুরে হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে বেশ উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। এছাড়া জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল, গণঅধিকার পরিষদের নেত্রী অ্যাডভোকেট শিরিন আক্তার, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের হামিদুল হক পারভেজ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের সাখাওয়াত হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের আশরাফ হোসেন ভূঁইয়া, গণফোরামের শহিদুজ্জামান চৌধুরীসহ সাতজন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন ভোটের মাঠে।
নরসিংদী-২ (পলাশ) আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান দলীয় প্রতীক ধানের শীষে লড়ছেন। এছাড়া ভোটের মাঠে রয়েছেন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম সারোয়ার তুষার। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপি জোট করলেও কৌশলগত কারণে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. আমজাদ হোসাইনও প্রার্থী হয়েছেন। তবে প্রচারণা থেকে বিরত রয়েছেন তিনি। আসনটি বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হলেও বিগত চারটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ধারাবাহিকভাবে জয় পেয়েছে।
ভোটাররা বলছেন, বিএনপির সাবেক খাদ্যমন্ত্রী মরহুম আব্দুল মোমেন খানের ছেলে আবদুল মঈন খান একসময় তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। সব মিলিয়ে এখানে জামায়াতের প্রার্থী থাকলে নির্বাচনী লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হতে পারে। এছাড়া ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের আসিফ ইকবাল, খেলাফত মজলিসের ফারুক ভূঁইয়া, জাতীয় পার্টির এএনএম রফিকুল আলম সেলিম, মোহাম্মদ ইব্রাহীম ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নরসিংদী-৩ (শিবপুর) আসনে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনজুর এলাহী পেয়েছেন দলীয় মনোনয়ন। তবে বিপরীতে প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির প্রয়াত নেতা আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া পরিষদের সদস্য সচিব ও শিবপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আরিফুল ইসলাম মৃধা। এছাড়া নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর মোস্তাফিজুর রহমান, খেলাফত মজলিসের রাকিবুল ইসলাম রাকিব, জাকের পার্টির আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম আলী পাঠান, জাতীয় পার্টির রেজাউল করিম বাসেত, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের রায়হান মিয়া ও ইসলামী আন্দোলনের ওমায়েজ হোসেন ভূঁইয়াসহ নয়জন।
শেষ সময়ে ব্যস্ত প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা। উঠান বৈঠক, মতবিনিময় সভা, সৌজন্য সাক্ষাৎ ও জনসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজমুক্ত এলাকা গঠনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন সব দলের প্রার্থী।
তবে ভোটাররা বলছেন, এ আসনে বিএনপির সাবেক মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া এমপি ছিলেন, মন্ত্রীও ছিলেন। জীবদ্দশায় তিনি সংস্কারপন্থী নেতা হিসেবে দল থেকে বহিষ্কৃত হন এবং শেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। এবার আরিফুল ইসলাম মৃধা হাঁস প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। অবশ্য মনজুর এলাহীর পক্ষে বিএনপির নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ। পুটিয়া ও আইয়ুব ইউনিয়নে তার নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে, যা অন্য কোনো প্রার্থীর নেই।
মনোহরদী ও বেলাব উপজেলা নিয়ে গঠিত নরসিংদী-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভোটের মাঠে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর মো. জাহাঙ্গীর আলম। তাদের সঙ্গে ভোটের মাঠে রয়েছেন জাতীয় পার্টির কামাল উদ্দিন, ইসলামী আন্দোলনের ছাইফুল্লাহ, খেলাফত মজলিসের নাসির উদ্দিন, ইনসানিয়াত বিপ্লবের মিলন মিয়া, জনতার দলের আবু দার্দ্দা মো. মা’জ ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কাজী সাজ্জাদ জহির।
নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসন মূলত আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এ আসন থেকে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের রাজি উদ্দীন রাজু। এবার বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ভোটে রয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল। তবে তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী জামাল আহাম্মদ চৌধুরী। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সহসম্পাদক জামাল আহমেদ চৌধুরী জেলা বিএনপির সহসভাপতিও ছিলেন। যদিও দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করায় দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিএনপির কয়েকজন নেতা জানান, আশরাফ উদ্দিন বকুল তার পছন্দমতো নেতাকর্মীদের নিয়ে গণসংযোগ করছেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী জামাল আহমেদ চৌধুরী গণসংযোগ করছেন। এতে বিএনপির ভোটাররা দুই প্রার্থীকেই সমর্থন করছেন। বিএনপির ভোট বিভক্ত হওয়ার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন অন্য দলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। আওয়ামী লীগের ভোটকে পুঁজি করে কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য ব্যারিস্টার তৌফিকুর রহমানও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। যদিও তিনি এখনো মাঠে প্রচারণা চালাতে পারেননি। অন্যদিকে চরাঞ্চল থেকে মো. পনির হোসেনও ভোটের মাঠে রয়েছেন। জামায়াত ইসলামীর বহিষ্কৃত এ নেতা রায়পুরা উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়া ভোটের মাঠে রয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের বদরুজ্জামান উজ্জ্বল, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তাজুল ইসলাম, ইনসানিয়াত বিপ্লবের তাহমিনা আক্তার, জাতীয় পার্টির মেহেরুন নেছা খান হেনা, স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার তৌফিকুর রহমান ও মো. সোলায়মান খন্দকার।