খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

অগ্নিকাণ্ডের এক মাস পরও চালু হয়নি ওটি ইউনিট

অগ্নিকাণ্ডের এক মাসের বেশি সময় পার হলেও এখনো চালু করা যায়নি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি অপারেশন থিয়েটার (ওটি) ইউনিট।

অন্য ইউনিটে সীমিত পরিসরে জরুরি অস্ত্রোপচার চললেও নিয়মিত অস্ত্রোপচার পিছিয়ে যাচ্ছে। এতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের দুর্ভোগ বাড়ছে।

হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুটি ইউনিটে প্রতি মাসে গড়ে ৫০০-৬০০টি অস্ত্রোপচার হয়। অগ্নিকাণ্ডের পর বর্তমানে প্রতিদিন সাত-আটটির বেশি অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না। জরুরি রোগীদের অগ্রাধিকার দেয়া হলেও নির্ধারিত অস্ত্রোপচারের অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

সরজমিনে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও ওয়ার্ড সবখানেই উপচে পড়া ভিড়। ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা রোগীদের অভিযোগ, শয্যা সংকটে বিভিন্ন ওয়ার্ডে গাদাগাদি করে রাখা হচ্ছে রোগীদের। ওয়ার্ডে শয্যা না পেয়ে অনেকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ বারান্দায় অবস্থান করছে। তাদের ভাষ্য, কবে অস্ত্রোপচারের সুযোগ মিলবে, সেই শঙ্কায় হাসপাতাল ছাড়তে পারছে না। আবার কেউ কেউ অনিশ্চয়তায় বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।

গত ২০ মে ভোরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চারতলা ভবনের তৃতীয় তলায় পুরনো আইসিইউ ইউনিট-সংলগ্ন একটি স্টোররুমে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট প্রায় ১ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। অগ্নিকাণ্ডে স্টোররুমের বিভিন্ন সরঞ্জাম, কিছু সিলিন্ডার ও ভবনের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ওই অংশেই ছিল তিনটি অপারেশন থিয়েটার ও পোস্ট-অপারেটিভ ইউনিট। ফলে হাসপাতালের নিয়মিত অস্ত্রোপচার কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

হাসপাতালের গাইনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক জয়ন্ত কুমার দাস বলেন, ‘আমাদের বিভাগে জরুরি সিজারিয়ানসহ প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার হচ্ছে। কিন্তু নিয়মিত ওটি অনেক কমে গেছে। বিভাগটিতে আগে দুটি ইউনিটে সপ্তাহে ২০-২২টি অস্ত্রোপচার হতো। এখন তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে রোগীদের দুর্ভোগ বাড়ছে।’

অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও আইসিইউ ইউনিটের ইনচার্জ সহযোগী অধ্যাপক দিলীপ কুমার কুণ্ডু বলেন, ‘পোস্ট-অপারেটিভ ইউনিট পুরোপুরি চালু না থাকায় আইসিইউর কয়েকটি শয্যা পোস্ট-অপারেটিভ রোগীদের জন্য ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে আইসিইউ সেবাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। ১০ শয্যার আইসিইউতে আগে থেকেই ১৫টি শয্যা ব্যবহার করে সেবা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। সেখান থেকে চারটি শয্যা নিয়ে এবং অতিরিক্ত দুটি শয্যা যোগ করে একটি অংশ পোস্ট-অপারেটিভ ইউনিট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে জরুরি অস্ত্রোপচার চালু রাখা গেলেও নির্ধারিত অস্ত্রোপচার সীমিত রাখতে হচ্ছে।’

সরজমিনে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত অংশে থাকা তিনটি ওটি কক্ষে রঙ করা হয়েছে। ফ্যান ও লোহার গেট বসানো হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ ও গ্যাস পাইপলাইনের কাজ করা হচ্ছে। অন্য অংশেও সংস্কার চলছে। তবে পুড়ে যাওয়া স্টোররুমে এখনো মালপত্র পড়ে আছে।

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ ও দরপত্র আহ্বানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছুটা সময় লেগেছে দাবি করে হাসপাতালের পরিচালক কাজী আইনুল ইসলাম বলেন, ‘গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে সংস্কারকাজ চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্টোররুমের মালপত্র অন্য কক্ষে সরিয়ে নেয়ার পর কক্ষ, দরজা, দেয়াল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসলাইনের সংস্কার শেষ করা হবে। সব মিলিয়ে কমপক্ষে আরো ১৫ দিন সময় লাগবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এমনিতেই ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় তিন-চার গুণ রোগী থাকায় জনবল সংকট নিয়েই চিকিৎসাসেবা দিতে হয়। সেই ৫০০ শয্যার জনবল দিয়েই কার্যক্রম চলছে। এরই মধ্যে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সীমিত পরিসরে জরুরি অস্ত্রোপচার করতে হচ্ছে। এতে রোগীদের দুর্ভোগ বেড়েছে, সেটি আমরা উপলব্ধি করছি। জরুরি রোগীদের অগ্রাধিকার দিয়ে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।’

এদিকে হাসপাতালে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, সীমিত অস্ত্রোপচার ও রোগীর উপচে পড়া ভিড়কে কাজে লাগিয়ে হাসপাতালের একশ্রেণীর চিকিৎসক চিকিৎসাসেবার আড়ালে রোগীদের টোকেন দিয়ে নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে কমিশন বাণিজ্যে মেতেছেন। হাসপাতালজুড়ে সক্রিয় রয়েছে ওইসব প্রতিষ্ঠানের দালাল চক্র।

এক্ষেত্রে রোগী ও তাদের স্বজনদের বলা হচ্ছে, সরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার ও পরীক্ষা করাতে সময় বেশি লাগবে, বাইরে করালে রিপোর্ট দ্রুত পাওয়া যাবে, অস্ত্রোপচারও ভালো হবে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালের পরীক্ষার চেয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অস্ত্রোপচার ও রিপোর্টকে বেশি নির্ভরযোগ্য বলে বোঝানো হচ্ছে। আবার একটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করানোর পর অন্য চিকিৎসক সেই রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করাতে পাঠাচ্ছেন। ফলে একজন রোগী একাধিকবার পরীক্ষা করাতে বাধ্য হতে হচ্ছেন। এতে সময় বেশি লাগার পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে।

খুলনা নাগরিক সমাজের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘চিকিৎসাসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। আর সরকারি সেই সেবা কেন্দ্রেই যদি কমিশনভিত্তিক রোগী পাঠানোর সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

তিনি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক কাজী আইনুল ইসলাম বলেন, ‘চিকিৎসকদের কক্ষ থেকে রোগীদের টোকেন দেয়ার বিষয়ে জানা নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে হাসপাতাল প্রশাসন দালাল নির্মূলে কাজ করছে।’

দক্ষিণাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় সরকারি প্রতিষ্ঠান খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এ অঞ্চলের মানুষের উন্নত চিকিৎসার লক্ষ্যে ১৯৮৯ সালের ১৭ জানুয়ারি নগরের বয়রা এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট খুলনা হাসপাতাল। ১৯৯২ সালে এটি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রূপান্তরিত হয়। অধিক রোগীর চাপে ২০০৮ সালে হাসপাতালটিকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ১৬টি বিভাগের আওতায় ৩১টি ওয়ার্ডে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেয়া হয় এখানে।

আরও