সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন

নীতিমালা ও সমীক্ষা ছাড়াই রাজধানীর জনাকীর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছে সুরম্য অট্টালিকা

একসময় দেশের সবচেয়ে আদর্শ আবাসনের উদাহরণ ছিল আজিমপুর কলোনি। ছিল প্রশস্ত জায়গা, খেলার মাঠ, পুকুর, গাছগাছালি আর মধ্যম উচ্চতার ভবন।

একসময় দেশের সবচেয়ে আদর্শ আবাসনের উদাহরণ ছিল আজিমপুর কলোনি। ছিল প্রশস্ত জায়গা, খেলার মাঠ, পুকুর, গাছগাছালি আর মধ্যম উচ্চতার ভবন। স্থপতি মাজহারুল ইসলামের নকশায় গড়ে ওঠা এ কলোনি দেশের আবাসন পরিকল্পনায় একসময় ছিল অনুসরণীয় মডেল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে চিত্র বদলে গেছে। নীতিমালা ছাড়াই জনবহুল এ এলাকায় একের পর এক গড়ে উঠেছে সুউচ্চ টাওয়ার, যেখানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের নামে তৈরি হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণের ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। আজিমপুরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য ১৭টি ২০ তলা ভবন নির্মাণ করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর (পিডব্লিউডি)। পাশেই বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য ২০ তলা আরো পাঁচটি ভবন নির্মাণ করা হয়। ২০২৩ সালে ভবনগুলো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হলেও বসবাস শুরু হয় আরো আগেই। ইডেন কলেজের ঠিক বিপরীত পাশে একই উচ্চতার আরো ছয়টি টাওয়ার ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে সম্প্রতি। কয়েক মাসের মধ্যে এখানেও বসবাস শুরু হবে। শুধু আজিমপুর নয়, মিরপুর, মতিঝিল, আগারগাঁওয়েও একই চিত্র। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, জনঘনত্ব, ট্রাফিক ব্যবস্থা ও নাগরিক সেবার চাহিদা নিয়ে কোনো সমীক্ষা ছাড়াই গড়ে উঠেছে এসব সুউচ্চ ভবন, যা নগর ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক চাপ তৈরি করেছে।

পিডব্লিউডি সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন নির্মাণের ক্ষেত্রে জমির সুষ্ঠু ব্যবহারকে গুরুত্ব দেয়া হয়। এজন্য সুউচ্চ ভবন নির্মাণকেই সমাধান বেছে নেয় সরকার। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় যেখানে যেভাবে খুশি টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু অল্প জায়গায় অনেক মানুষ বসবাসের ফলে ওই এলাকার নাগরিক সেবা, ট্রাফিক ব্যবস্থা, গণপরিসরে কী প্রভাব পড়বে সে ধরনের কোনো সমীক্ষার প্রয়োজন মনে করা হয়নি।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, পাঁচ একরের বেশি কোথাও আবাসন নির্মাণ করতে চাইলে বেসরকারি ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা ২০০৪-এর নীতিমালা অনুসরণ করা প্রয়োজন হতো। এছাড়া রাজধানীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ ২০১০) বর্ণিত নাগরিক সুবিধাদির জন্য প্রণীত পরিকল্পনার মানদণ্ড মেনে চলা জরুরি ছিল। কিন্তু পাঁচ একরের নিচে ভূমি উন্নয়নের ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালায় সুস্পষ্ট করে কিছু বলা ছিল না। তাছাড়া পিডব্লিউডি কোনো ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউক থেকে অনুমোদনও নিত না। সে সুযোগেই রাজধানীর জনাকীর্ণ এলাকাগুলোতেও ধারণক্ষমতার বাইরে বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণ করেছে সংস্থাটি।

ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক ও রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জমির সুষ্ঠু ব্যবহারের লক্ষ্যে এবারের ড্যাপে ব্লক-ভিত্তিক আবাসন নির্মাণের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে এক বিঘার বেশি পরিমাণ জমিতে সুউচ্চ ভবনের অনুমিত দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ জায়গা পাবলিক স্পেসের জন্য ছেড়ে দেয়ার শর্ত রাখা হয়েছে। যেহেতু আগে এভাবে স্পষ্ট বলা ছিল না, তাই অল্প জায়গায় সরকারি উদ্যোগেই সুউচ্চ অট্টালিকা তৈরি হয়ে গেছে। আগে বানানো ভবনগুলোর ক্ষেত্রে এ নিয়ে হয়তো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তবে এ প্রশ্ন অবশ্যই তোলা যায়, একটা এলাকায় যদি প্রায় ৩০টি ২০ তলা ভবন নির্মাণ হয়, সেখানে যে পরিমাণ মানুষ বসবাস করবে তাদের নাগরিক সেবার যে চাহিদা তৈরি হবে সেটা নিয়ে কোনো সমীক্ষা হয়েছে কিনা? যদি না হয়ে থাকে কেন হলো না? এসব কারণে ভবিষ্যতে ঢাকার নগরজীবন আরো জটিল হয়ে উঠবে। তার দায় কে নেবে?’

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের একজন কর্মচারী বসবাস করেন আজিমপুরের একটি টাওয়ার বিল্ডিংয়ে। বসবাসের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে কর্মচারীদের জন্য ১৭টি ভবন রয়েছে। প্রতিটি ২০ তলা করে। আর কর্মকর্তাদের জন্য রয়েছে পাঁচটি ২০ তলার ভবন। আমাদের জন্য নির্মিত বিল্ডিংয়ে ৭৬টি করে ইউনিট রয়েছে। কর্মকর্তাদের বিল্ডিংয়ে আরো কম। আমাদের ১৭টা বিল্ডিংয়ে মোট ১ হাজার ২৯২টি পরিবার থাকে। একটি পরিবারে কমপক্ষে চারজন মানুষ হলে ৫ হাজার ১৬৮ মানুষ এ কলোনির একাংশে থাকে। পাশে কর্মকর্তাদের জন্য পাঁচটি এবং ইডেনের উল্টোদিকে আরো ছয়টি টাওয়ার রয়েছে। সব মিলিয়ে আজিমপুর কলোনিতে সাত-আট হাজার মানুষ বসবাস করে।’

ওই কর্মচারী বলেন, ‘এখনই বিকালে হাঁটতে বেরোলে পা ফেলা যায় না, গায়ে ধাক্কা লাগে—এমন অবস্থা। ভবিষ্যতে অবস্থার আরো অবনতি হবে। সত্যি বলতে আমরা এখানে শুধু বদ্ধ ঘরে ঘুমাচ্ছি। মানুষ তো জেলখানায়ও ঘুমায়। সরকার আমাদের জন্য কি তাহলে আবাসনের নামে আধুনিক জেলখানা বানিয়েছে? এখানে হাঁটা যায় না, খেলা যায় না, পর্যাপ্ত স্কুল নেই, বাজার নেই, গণপরিবহনও নেই।’

মনোরম আজিমপুর কলোনি ভেঙে পিডব্লিউডি আবাসনের নামে খারাপ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থপতি ইকবাল হাবিব। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘হাউজিং আর বিল্ডিংস দুটো পুরোপুরি আলাদা বিষয়। হাউজিং মানে আবাসন। সেখানে মানুষ মানবিকতায় আর প্রকৃতিনির্ভরতায় বসবাস করবে। তার মনোদৈহিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশেও তো সুউচ্চ ভবনে মানুষ বসবাস করে। সেখানে পর্যাপ্ত মাঠ, জলাশয়, স্কুল, বাজার, ট্রাফিক সব সুবিধা নিশ্চত করা হয়। এমনকি মানুষ কোথায় কাপড় শুকাতে দেবে সেটাও নকশায় স্পষ্ট করে উল্লেখ থাকে। আজিমপুরের মতো একটা ঐতিহ্যবাহী আদর্শ আবাসিক এলাকায় কারাগারের চেয়েও নিকৃষ্টভাবে কয়েকটা ভবন বানিয়ে রেখে দিয়েছে গণপূর্ত। এখানে তো আবাসন বানানোর জন্য বিনিয়োগ করা হয়েছে, শুধু কতগুলো ভবন নয়। যেখানে নারী, শিশু, কিশোর-কিশোরী, বৃদ্ধ, অসুস্থ সবাই স্বস্তি ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বসবাস করবে। কিন্তু সেটা না করে এখানে যেন বিকলাঙ্গ প্রজন্ম নির্মাণের ইট-সুরকির জঙ্গল নির্মাণ করা হয়েছে।’

একটি এলাকায় কত মানুষ বসবাস করতে পারবে তার একটা মানদণ্ড নির্ধারণ ছিল ড্যাপ ২০১০-এ। সেখানে আবাসিক এলাকায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ মাঠ, পার্ক, বিদ্যালয়, খোলা জায়গা, জলাশয় ইত্যাদি নাগরিক সুবিধাদির জন্য জন্য প্ল্যানিং স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ড দেয়া আছে। গণপূর্ত অধিদপ্তর সরকারি আবাসন নির্মাণের ক্ষেত্রে সেসব নীতিমালার কোনো তোয়াক্কাই করেনি বলে মন্তব্য করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘শুধু আজিমপুর নয়, ঢাকার যেখানেই টাওয়ার ভবনে সরকারি আবাসন হয়েছে, সেখানেই ড্যাপের জনঘনত্বের বিষয়টি লঙ্ঘন করেছে গণপূর্ত। আজিমপুরে এই যে অতিরিক্ত সাত-আট হাজার মানুষ বসবাস করানোর পরিকল্পনা করেছে সরকার, সেখানে তো আগে থেকেই ধারণক্ষমতার বেশি মানুষ বসবাস করে আসছে। সাত-আট হাজার মানুষ হলো দুইটা গ্রামের সমান মানুষের বসবাস। একটা গ্রামে বৃষ্টির পানিধারণের জন্য অনেক পুকুর-জলাশয় থাকে, বাজার থাকে, একাধিক স্কুল থাকে, মাদ্রাসা থাকে, মসজিদ থাকে, অনেকগুলো খেলার মাঠ থাকে। আজিমপুরের সরকারি কলোনিতে কি তার ন্যূনতম কিছু আছে?’

সরকার নিজেই যদি আবাসনের ক্ষেত্রে প্ল্যান না মানে, তাহলে জনগণ কীভাবে প্ল্যান মানবে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘মন চাইল আর ২০ তলা ভবন তুলে হাজার হাজার মানুষ বাড়তে দিলাম। তারা কীভাবে থাকবে, তাদের জন্য নাগরিক সুবিধাদি কী, এতে ইউটিলিটি-পরিষেবার ওপর কেমন চাপ বাড়বে, সবুজ-খোলা জায়গা কেমন পড়বে, সড়কের ওপর কেমন চাপ বাড়বে এসব পরিকল্পনাগত বিষয় বিবেচনায়ই না নেয়া নগরীর বাসযোগ্যতা ও টেকসই ধারণার বিপরীতে অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড এবং অন্যায্য আচরণ। এর যথাযথ তদন্ত ও সুষ্ঠু বিচার হওয়া প্রয়োজন।’

গণপূর্তের অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের চাপ পড়বে নগরসেবায়, এতে নগরবাসীর ভোগান্তি আরো সুদীর্ঘ হবে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। তার মতে, ডিএনসিসি এলাকায় যেসব উঁচু ভবন সরকার নির্মাণ করেছে, এগুলোয় নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে হলে করপোরেশনের সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আরো টাওয়ার বিল্ডিং নির্মাণ হবে। এক্ষেত্রে করপোরেশনের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। একটা ওয়ার্ডে বিদ্যমান অবকাঠামো ও জনসংখ্যার সঙ্গে যদি আরো পাঁচ হাজার মানুষ, ৫০০ গাড়ি বেড়ে যায়, তাহলে এ চাপ পড়বে সড়কে, বাজারে, স্কুলে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ সব ক্ষেত্রে। সরকারি আবাসন নির্মাণের সময় এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ডিজাইন করা প্রয়োজন। নয়তো নাগরিক সেবা দিতে গেলে নগর কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হবে।’

আরও