বাংলাদেশের আইসিটি খাতে ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব

এ জায়গাতেই এখন চীনা কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতায় নামছে। তারা শুধু ব্যাংকিং সফটওয়্যার নয়, সার্ভার, তথ্য সংরক্ষণ, ডেটা সেন্টার, বেসরকারি ক্লাউড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোয়ও নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে চাইছে।

দেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং, আর্থিক সেবা, টেলিযোগাযোগ, শিল্প উৎপাদন থেকে সরকারি সেবা—প্রায় সব খাতেই বাড়ছে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার। এর সঙ্গে বাড়ছে ক্লাউড, ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বড় পরিসরে তথ্য বিশ্লেষণের চাহিদা। ফলে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত হচ্ছে। দেশে তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন খাতে মার্কিন, ইউরোপীয় ও ভারতীয় প্রযুক্তি কোম্পানির শক্ত অবস্থান রয়েছে। তবে টেলিযোগাযোগে দীর্ঘদিন কাজ করা চীনা কোম্পানিগুলো এখন সফটওয়্যার, ডেটা সেন্টার, ক্লাউড ও আর্থিক প্রযুক্তির মতো নতুন ক্ষেত্রে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বাজারকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও নতুন মাত্রা পাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈশ্বিক বাজার গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ভেরিফায়েড মার্কেট রিসার্চের হিসাবে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বাজারের আকার ছিল প্রায় ৮০০ কোটি ডলার। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস, ২০৩২ সাল নাগাদ এ বাজারের আকার বেড়ে ২ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে। ২০২৬ থেকে ২০৩২ সাল সময়কালে বাজারটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ১২ দশমিক ১ শতাংশ।

দেশের আইসিটি বাজার মূলত হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, টেলিযোগাযোগ ও ক্লাউড প্রযুক্তির। এর মধ্যে টেলিযোগাযোগ খাতের অংশগ্রহণ সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ। ২০২৪ সালে তথ্যপ্রযুক্তি সেবার অংশ ছিল প্রায় ৩৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ। একই বছরে ব্যাংক, আর্থিক সেবা ও বীমা খাত দেশের তথ্যপ্রযুক্তি বাজারের প্রায় ২১ দশমিক ৬৯ শতাংশ চাহিদা তৈরি করেছে। ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা, সাইবার নিরাপত্তা, আর্থিক প্রযুক্তি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা আধুনিকায়নের কারণে এ খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও ব্যয় বাড়ছে। আর্থিক খাতে ডিজিটাল রূপান্তর যত বাড়ছে, প্রযুক্তির ব্যবহারও তত বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে টেলিযোগাযোগ সবচেয়ে বড় খাত হলেও ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা খাত তথ্যপ্রযুক্তি বাজারের অন্যতম প্রধান প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন, ইউরোপীয়, ভারতীয় ও দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ‘সলিউশন’ ব্যবহার হচ্ছে। কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারের মধ্যে রয়েছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক টেমেনোসের টি২৪, মার্কিন ওরাকলের ফ্লেক্সকিউব, ভারতের ইনফোসিসের ফিনাকলের বিভিন্ন সলিউশন। পাশাপাশি দেশীয় সফটওয়্যারও ব্যবহার হচ্ছে। তবে ব্যাংকের প্রযুক্তি শুধু কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে থাকে তথ্যভাণ্ডার, সার্ভার, প্রসেসর, তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা, নেটওয়ার্ক এবং দুর্যোগের সময় বিকল্পভাবে সেবা চালু রাখার অবকাঠামো। এসব ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে বিদেশী প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে। ওরাকল, আইবিএম, ইনটেল, ডেল, এইচপিই ও সিসকোর মতো প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি দেশের ব্যাংকিং অবকাঠামোর বিভিন্ন স্তরে ব্যবহার হচ্ছে। ফলে ব্যাংকের পুরো প্রযুক্তি ব্যবস্থা সাধারণত একক কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে না। কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার এক প্রতিষ্ঠানের হলেও সার্ভার, প্রসেসর, তথ্যভাণ্ডার, নেটওয়ার্ক বা তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা অন্য প্রতিষ্ঠানের হতে পারে।

এ জায়গাতেই এখন চীনা কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতায় নামছে। তারা শুধু ব্যাংকিং সফটওয়্যার নয়, সার্ভার, তথ্য সংরক্ষণ, ডেটা সেন্টার, বেসরকারি ক্লাউড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোয়ও নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে চাইছে। ফলে প্রতিযোগিতা আর শুধু অ্যান্টেনা, রাউটার বা ট্রান্সমিশন সরঞ্জামে সীমাবদ্ধ নেই; তা ক্রমেই পুরো প্রযুক্তি অবকাঠামোকে ঘিরে বিস্তৃত হচ্ছে।

থাকরাল ইনফরমেশন সিস্টেমস প্রাইভেট লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক বাসব প্রসাদ বাগচী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখনো সাধারণভাবে চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মূল ব্যাংকিং সফটওয়্যারে ওরাকল ফ্লেক্সকিউব, টেমেনোস টি২৪, ইনফোসিস ফিনাকল, টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমাধান ব্যবহার করছে। এর পাশাপাশি সার্ভার, প্রসেসর, তথ্য সংরক্ষণ ও নেটওয়ার্ক অবকাঠামোয় আইবিএম, ইনটেল, ডেল, এইচপি ও সিসকোর মতো পশ্চিমা প্রযুক্তিরও দীর্ঘদিনের উপস্থিতি রয়েছে।’

টেলিযোগাযোগ খাতে চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার তুলনামূলক বেশি জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘হুয়াওয়ের সার্ভার ও নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখন তারা শুধু টেলিকমে সীমাবদ্ধ থাকছে না; ক্লাউড, ডেটা সেন্টার, ব্যাংকিং অবকাঠামো ও অন্যান্য এন্টারপ্রাইজ প্রযুক্তিতেও যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের প্রযুক্তি কেবল সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে না; সক্ষমতা ও আধুনিকতার দিক থেকেও অনেক প্রতিষ্ঠান তা বিবেচনায় নিচ্ছে।’

হুয়াওয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তাদের সমন্বিত ডেটা সেন্টার, ভার্চুয়ালাইজেশন ও ফ্ল্যাশ তথ্য সংরক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে লেনদেন, নিষ্পত্তি, নজরদারি ও তথ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।

দেশের একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক বছরে দেশের বাজারে বেশকিছু চীনা প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান প্রবেশ করছে। তাদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি দামও অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক। বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলো কোর ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন সফটওয়্যারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে সরব হলে ব্যাংকের সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি অবকাঠামোর ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর এ বিস্তারের ক্ষেত্রে সামনের দিনে বিবেচনায় উঠে আসতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি। চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত চুক্তিতে চীনা প্রযুক্তি বা কোনো চীনা কোম্পানির ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে জাতীয় নিরাপত্তা সংবেদনশীল প্রযুক্তি, রফতানি নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তা নিয়ে কয়েকটি শর্ত রাখা হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তা সংবেদনশীল প্রযুক্তি ও পণ্যের বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করবে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বা যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত যেসব প্রযুক্তি তাদের এক্সপোর্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিধির আওতাধীন, সেগুলোর অনুমোদনহীন পুনঃরফতানি বা দেশের ভেতরে হস্তান্তর ঠেকাতেও ব্যবস্থা নিতে হবে। আরো তাৎপর্যপূর্ণ একটি শর্ত রয়েছে চুক্তির শেষ অংশে। সেখানে বলা হয়েছে, দুই পক্ষ যেসব দেশকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের হিসেবে চিহ্নিত করবে, সংবেদনশীল প্রযুক্তির সরবরাহ শৃঙ্খলে সেসব দেশের সফটওয়্যারের নকশা, উন্নয়ন ও সরবরাহে সম্পৃক্ততা সীমিত করার চেষ্টা করবে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে এ ধরনের সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।

চুক্তির এসব শর্ত চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে চীনের একাধিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। এর অন্যতম হুয়াওয়ে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের ‘এনটিটি লিস্ট’-এ রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি প্রশাসন বিধির আওতাধীন নির্দিষ্ট পণ্য, সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি হুয়াওয়েকে সরবরাহ করতে সাধারণত লাইসেন্সের প্রয়োজন হয়। ২০২৬ সালের জুনে হুয়াওয়েকে অনুমতি ছাড়া নিয়ন্ত্রিত সেন্সর ও সফটওয়্যার সরবরাহের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ কর্তৃক জার্মান প্রতিষ্ঠান বশকে ৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার জরিমানা করার উদাহরণও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল যোগাযোগ কমিশনের জাতীয় নিরাপত্তাজনিত ‘কাভার্ড লিস্ট’-এ হুয়াওয়ে ও জেডটিইর নাম এখনো বহাল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে এ নিয়ন্ত্রণের পরিধি বিস্তৃত করছে।

ব্যাংক খাতে অবশ্য নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি প্রযুক্তি বা পণ্যের মূল্য সুবিধার চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তবে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে পণ্য ও সেবার ক্রয়-বিক্রয় উন্মুক্ত থাকা উচিত বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব এখন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর, আধুনিক ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা উন্মুক্ত থাকলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ভোক্তাই উপকৃত হন। আমরা চাই, একটি উন্মুক্ত বিশ্ব। যদিও বিশ্ব পরিস্থিতি সে জায়গায় নেই। এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নানা ধরনের স্যাংশন ও বিধিনিষেধ আছে।’

আরিফ হোসেন খান আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রসহ আমাদের অন্য বড় বাণিজ্য অংশীদারদের ব্ল্যাক লিস্টেড বা স্যাংশনভুক্ত দেশ ও কোম্পানির কাছ থেকে পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে আমরা বরাবরই সতর্ক। এ বিষয়ে দেশের ব্যাংকগুলোকে দিকনির্দেশনা দেয়া আছে। স্যাংশনভুক্ত কিংবা বিধিনিষেধ আছে এমন যেকোনো কোম্পানির প্রস্তাব যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, আমরা সেটি নিতে পারি না।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নানা কারণে দেশের প্রযুক্তি বাজারে তাই সামনের দিনে এক ধরনের দ্বিমুখী চাপ তৈরি হতে পারে। একদিকে দ্রুত বাড়তে থাকা বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চীনা কোম্পানিগুলো ডেটা সেন্টার, ক্লাউড, আর্থিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোয় আরো বিস্তার ঘটাতে চাইবে। অন্যদিকে নতুন বাণিজ্য চুক্তির কারণে চীনা প্রযুক্তি কেনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পণ্য বা এর কোনো উপাদান যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি নিয়ন্ত্রণের আওতায় পড়ে কিনা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণ তালিকায় আছে কিনা—এসব বিষয়ও ক্রয় সিদ্ধান্তে বিবেচনায় নিতে হতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দেশের প্রযুক্তিসেবা নিতে অসুবিধা হবে—এমন কোনো বিষয় এখনো আমাদের নজরে আসেনি। এখন পর্যন্ত কেউ এমন কোনো অভিযোগও করেনি। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আমরা অবশ্যই খতিয়ে দেখব।’

আইসিটি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো একটি দেশ বা প্রযুক্তি পরিবেশের ওপর অতিনির্ভরতা তৈরি হলে সফটওয়্যার হালনাগাদ, যন্ত্রাংশ, লাইসেন্স, কারিগরি সহায়তা কিংবা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ডেটা দেশের ভেতরে থাকলেও সার্ভার, ক্লাউড, সফটওয়্যার বা রক্ষণাবেক্ষণের নিয়ন্ত্রণ বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকলে প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি সেই দেশের হাতে থাকে না। এ কারণে স্থানীয় ডেটা সেন্টার ও নিজস্ব ক্লাউড সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সেগুলো পরিচালনা, নজরদারি, সাইবার নিরাপত্তা, দুর্যোগকালীন পুনরুদ্ধার এবং প্রয়োজনে এক প্রযুক্তি থেকে অন্য প্রযুক্তিতে স্থানান্তরের সক্ষমতাও দেশে গড়ে তুলতে হবে।

সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বিদেশী সরবরাহকারীর মূল্যায়নের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা ও নিয়মিত ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যাংক, সরকারি তথ্য ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোয় কোন প্রযুক্তি কতটা নিরাপদ এবং কার হাতে প্রবেশাধিকার রয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। তবে এসব ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনা ও যাচাই করার মতো দক্ষ জনবল গড়ে তোলা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

আগামী দিনে প্রযুক্তি বাজারের প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনে ব্যাংকিং, আর্থিক সেবা, ই-কমার্স, টেলিযোগাযোগ, সরকারি সেবা ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহার দ্রুত বাড়তে পারে। তখন প্রতিযোগিতা শুধু সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশনে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এআই চালাতে প্রয়োজনীয় চিপ, সার্ভার, ডেটা সেন্টার, ক্লাউড ও মডেল অবকাঠামোকেও ঘিরে বাজার তৈরি হবে। আর এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তীব্র প্রতিযোগিতার প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়তে পারে।

বিডিজবস ডটকম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম মাশরুর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগামী দিনগুলোয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আরো বাড়বে। তখন কোন দেশের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, কোন ধরনের অবকাঠামোর ওপর তা চলছে এবং বাণিজ্য চুক্তির কোনো শর্ত সেখানে বাধা তৈরি করবে কিনা—এসব প্রশ্নও সামনে আসতে পারে। এ বিষয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন।’

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বাধীনতা যেন অযথা সংকুচিত না হয়, সেটিও দেখতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজন, সক্ষমতা ও ঝুঁকি বিবেচনা করে প্রযুক্তি বেছে নেয়ার সুযোগ থাকা উচিত। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড ও অন্যান্য নতুন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে এ ভারসাম্য আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।’

সব মিলিয়ে দেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বাজারকে ঘিরে সামনে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হতে পারে বলে মনে করেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়বে। তবে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ডেটার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে সংবেদনশীল ও কৌশলগত ডেটা কোথায় থাকবে, কে সেখানে প্রবেশ করতে পারবে এবং এর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—এসব বিষয়ে রাষ্ট্রের স্পষ্ট সক্ষমতা থাকতে হবে।’

আরও