বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পরই বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক জায়গায় মরদেহ পাওয়া যেত। বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত কেবল জাসদেরই ১০ হাজারেরও অধিক কর্মীকে হত্যা করে রক্ষীবাহিনী। পরে সরকার পরিবর্তন হলেও ক্রসফায়ারের ঘটনা একেবারে থামেনি, বরং নানা সময়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী দ্বারা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটেছে, যা পুরোপুরি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
গতকাল জুলাই জাদুঘরে আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজ’-এর দ্বিতীয় পর্বে ‘রক্ষীবাহিনী ও বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ শীর্ষক সেমিনারে অংশ নিয়ে বক্তারা এ মন্তব্য করেন বক্তারা। সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ, মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন, লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহ্সান মাহমুদ। সেখানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, আইনজীবী, শিক্ষার্থী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অনেকেই পঁচাত্তর সালের জানুয়ারিতে সিরাজ সিকদার হত্যাকাণ্ডকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু এটার মাধ্যমে বাহাত্তর সাল থেকে চলা রক্ষীবাহিনীর শত শত বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে অস্বীকার করা হয়।’
নূর খান লিটন বলেন, ‘বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত সময়টায় শুধু জাসদই নয়, অন্যান্য বিরোধী দলের নেতাকর্মীরাও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। নির্যাতনের মাত্রা এতটা ভয়াবহ ছিল যে অনেকে তখন দেশ ছেড়ে পাশের দেশে হিন্দু নাম ধারণ করে থেকেছে। এমন অনেক ঘটনা আছে যে রক্ষীবাহিনী যেকোনো একটি এলাকা ঘিরে ফেলে সেখান থেকে জাসদসহ অন্যান্য বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে যেত, নির্যাতন করা হতো। অনেকের মরদেহ তখন পরিত্যক্ত বাড়িতে পাওয়া যেত। শুধু জাসদেরই ১০ হাজারের অধিক এবং ১১ হাজারের মধ্যে নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়। এমন পরিস্থিতি ছিল যে মানুষ আদালতেরও দ্বারস্থ হয়নি। যার জন্য এ বিষয়ে কোনো মামলা তখন দেখা যাবে না।’
সহুল আহমদ বলেন, ‘বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি ট্রুথ কমিশন গঠন জরুরি, যার মাধ্যমে আমরা বাহাত্তর সাল থেকে গত ৫০ বছরের বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সত্যটা জানতে পারব।’
এহ্সান মাহমুদ বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে হলে পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। স্বাধীনতা-সংগ্রামের মাধ্যমে এ দেশ পাওয়ার পর যেভাবে এক ব্যক্তির শাসন কায়েম করা হয়েছিল, যেভাবে রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র ছাড়া সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, তেমনি রক্ষীবাহিনী গঠন করে এ দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু করা হয়েছিল। আমরা জুলাই জাদুঘরে এ আলোচনা জারি রাখতে চাই।’