গ্রাহকের আস্থাই ৩০ বছরে ডিবিএইচের সবচেয়ে বড় অর্জন

আবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় খরচ হয় জমিতে। ডেভেলপারদের জিজ্ঞেস করলে জানবেন তাদের ব্যয়ের ৬০-৭০ শতাংশ যায় জমিতে। ছোট সাইজের অ্যাপার্টমেন্ট, সেকেন্ডারি মার্কেটের উন্নয়ন এবং রেজিস্ট্রেশন খরচ কমানো দরকার।

আবাসন খাতে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপরিচিত ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসি সম্প্রতি তিন দশক পূর্ণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) দায়িত্বে রয়েছেন নাসিমুল বাতেন। ২৩ বছর প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করে তিনি ডিবিএইচের শীর্ষ পদে আসেন। দেশের আবাসন খাতের বিভিন্ন দিক এবং নিজ প্রতিষ্ঠানের অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সম্প্রতি তিনি বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেহেদী হাসান রাহাত

ডিবিএইচ ফাইন্যান্স সম্প্রতি তিন দশক পূর্ণ করেছে। এ তিন দশকের পথচলা কেমন ছিল?

একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ৩০ বছর কম সময় নয়। এ অর্জনকে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য হিসেবে দেখি না। বরং খাতের জন্য আমরা কী অবদান রাখতে পারলাম সেটা বিবেচনা করি। ডিবিএইচের যাত্রা বাংলাদেশের আবাসন খাতের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন মানুষের আস্থা। গৃহ ঋণ নেয়ার কথা ভাবলে মানুষ সবার আগে ডিবিএইচের কথা ভাবে।

ডিবিএইচের প্রতিষ্ঠাতারা ভেবেছিলেন অন্য দেশে আলাদা হাউজিং ফাইন্যান্স কোম্পানি থাকলেও বাংলাদেশে তখন একটিই ছিল, আর সেটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। বিশাল জনসংখ্যার এ দেশে আবাসনের চাহিদা সব সময়ই থাকবে। তাই তারা একটি কাজই ভালোভাবে করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমাদের সামনে উদাহরণ ছিল ভারতের এইচডিএফসি, যারা প্রতিষ্ঠার পরের বছরই আমাদের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে যুক্ত হয়। শুরুতে ব্র্যাক, গ্রিন ডেল্টা ও ডেল্টা লাইফ এবং বিশ্বব্যাংকের আইএফসি ও ভারতের এইচডিএফসি—এ পাঁচ প্রতিষ্ঠান মিলে আমাদের যাত্রা শুরু হয়।

আমি ডিবিএইচের আরো দুটি অর্জনের কথা বলব। গত ২১ বছর ধরে আমরা ধারাবাহিকভাবে ট্রিপল-এ রেটিং ধরে রেখেছি। আর ৩০ বছরে আমাদের খেলাপি ঋণের হার কখনো ১ শতাংশ অতিক্রম করেনি। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা নিশ্চিন্তে এখানে টাকা রাখতে এবং ঋণ নিতে পারছেন।

আবাসন খাতে তো ব্যাংকগুলোও তখন অর্থায়ন করত। তার মধ্যে এ খাতে ব্যবসায় আসার সাহস ও আত্মবিশ্বাস পেলেন কীভাবে?

আমরা নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি শুরু করি। তখন আবাসন খাতে অর্থায়নের জন্য ব্যাংকগুলোর তেমন কোনো পণ্য ছিল না। মূলত সরকারি ব্যাংকগুলো সীমিত পরিসরে অর্থায়ন করত, তা-ও মূলত নিজের জমিতে বাড়ি নির্মাণের জন্য। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে দেশের প্রথম রিয়েল এস্টেট ডেভেলপাররা কাজ শুরু করেন। ইস্টার্ন হাউজিং ছিল প্রথম দিকে, ১৯৮৮ সালের দিকে আসে শেলটেক ও বিটিআই। কিন্তু ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ঋণ পাওয়ার সুযোগ ছিল না। ঋণের জন্য সম্পত্তি মর্টগেজ দিতে হয়, আর রাজউক ও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী আগে সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন করতে হতো, তারপর অনুমতি নিয়ে মর্টগেজ। ফলে নির্মাণাধীন ফ্ল্যাটে ফাইন্যান্সের কোনো সুযোগ তখন ছিল না।

আমরা জানতাম, জনবহুল দেশে শুধু নিজে বাড়ি বানিয়ে হাউজিং মার্কেট টেকসই হবে না। বহুতল ভবন ও ডেভেলপারদের প্রডাক্ট আসতেই হবে। তাই ১৯৯৮ সালে আমরা দেশে প্রথম ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে ঋণ দেয়া শুরু করি। এতে ডেভেলপার অঙ্গীকার করে যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রেজিস্ট্রি করে ডকুমেন্ট আমাদের দেবে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দিক থেকে সেটা ছিল অগ্রসর ভাবনা, কারণ মর্টগেজ তৈরি হচ্ছিল না, চলছিল পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর। তখন এটাই ছিল একমাত্র সমাধান। সরকার পরে এর প্রয়োজন বুঝে ২০০৬ সালে ত্রিপক্ষীয় চুক্তিকে আইনে অন্তর্ভুক্ত করে।

একইভাবে ১৯৯৯ সালে আমরা সব ডেভেলপারকে নিয়ে দেশে প্রথম প্রপার্টি ফেয়ার আয়োজন করি। এরপর থেকে রিহ্যাব প্রতি বছর এটি করছে। আজ রিয়েল এস্টেট খাতের সবাই এ মেলার অপেক্ষায় থাকে, আর ক্রেতারা কিছুটা ছাড়ে ফ্ল্যাট বুকিং দিতে পারেন। এর সূচনা ডিবিএইচের হাত ধরে।

সাহসের প্রশ্নে বলি, নতুন কিছু করতে হলে সাহসী হতেই হয়। প্রচলিত পথে হাঁটলে নতুন খাতে অবদান রাখা যায় না। অন্য দেশের উদাহরণও আমাদের ভরসা দিয়েছে।

গত ৩০ বছরে দেশের হাউজিং মার্কেট কতটা বদলেছে? বাজারের চাহিদা কি আপনারা মেটাতে পারছেন? ফাইন্যান্সিং মডেলে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি?

পরিবর্তন এসেছে, তবে যতটা আশা করেছিলাম ততটা নয়। হাউজিং এখনো মূলত মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত ও উচ্চ বিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ‘সবার জন্য আবাসন’—ধারণায় আমরা এখনো পৌঁছাতে পারিনি। মূল সমস্যা সামর্থ্য বা অ্যাফোর্ডেবিলিটি। এখন যে সাইজের অ্যাপার্টমেন্ট যে দামে বিক্রি হচ্ছে, তা মানুষের বার্ষিক আয়ের প্রায় ১৪-১৫ গুণ। এক্ষেত্রে আদর্শ অনুপাত হচ্ছে আয়ের পাঁচ-ছয় গুণ। যার মাসিক আয় ৫০ হাজার টাকা, অর্থাৎ বছরে ৬ লাখ, তার জন্য ২৫-৩০ লাখ টাকার আবাসন টেকসই হয়। অথচ এখন রাজধানীতে, এমনকি জেলা শহরেও, ৬০-৭০ লাখ টাকার নিচে অ্যাপার্টমেন্ট পাওয়া কঠিন। এর দুটি কারণ, সাইজ ও দাম। আমরা এখনো ছোট সাইজের অ্যাপার্টমেন্টে যেতে পারিনি। আর প্রতি বর্গফুটের দাম এখনো ৪-৫ হাজার টাকা। ১২০০ বর্গফুটে হিসাব করলে ৬০ লাখের ওপরে যায়, আনুষঙ্গিক খরচ ও রেজিস্ট্রেশন যোগ করলে বাজেট ৭০ লাখের বেশি। যাদের মাসিক আয় ৩০-৪০ হাজার টাকা, তাদের জন্য আমরা এখনো এটা নিশ্চিত করতে পারিনি।

এসব নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ আছে। তবে কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এটা সম্ভব নয়। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ডেভেলপার এবং সবচেয়ে বেশি এখানে জরুরি সরকারের ভূমিকা।

আবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় খরচ হয় জমিতে। ডেভেলপারদের জিজ্ঞেস করলে জানবেন তাদের ব্যয়ের ৬০-৭০ শতাংশ যায় জমিতে। ছোট সাইজের অ্যাপার্টমেন্ট, সেকেন্ডারি মার্কেটের উন্নয়ন এবং রেজিস্ট্রেশন খরচ কমানো দরকার।

ইতিবাচক পরিবর্তনও দেখছি। আগে ৫০ বছর বয়সে, অবসরের কাছাকাছি সময়ে মানুষ বাড়ির কথা ভাবত। এখন আমাদের অনেক গ্রাহকের বয়স ৩০ বা তার নিচে। সেকেন্ডারি মার্কেট কিছুটা গড়ে উঠেছে। মানুষ আর ভাবে না যে জীবনে একবারই অ্যাপার্টমেন্ট কিনবে। পরিবারের আকার, চাকরি, ক্যারিয়ারের উন্নতি বা সন্তানের স্কুল অনুযায়ী অনেকে বড় ফ্ল্যাটে যাচ্ছে বা এলাকা বদলাচ্ছে। আমরা এবং অন্য ব্যাংকগুলো আবাসন ঋণকে সহজলভ্য করেছি। কেউ বাড়ি বিক্রি করে নতুন ঋণে আরেকটি কিনছেন।

তবু আমাদের অনেক পথচলা বাকি। আবাসনকে সর্বজনীন করতে হলে ২৫-৩০ লাখ টাকার মধ্যে ফ্ল্যাট আনতে হবে। গত তিন-চার বছর আমরা সাশ্রয়ী আবাসন নিয়ে জোরালোভাবে কাজ করছি। এর সংজ্ঞা নিয়ে আইএফসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কাজ হয়েছে। এখন পর্যন্ত যা দেখছি, তা আবাসন খাতের কেবল চূড়া মাত্র, আসল জায়গায় যাওয়া বাকি রয়েছে।

সবার জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারের নীতিতে কি কোনো ঘাটতি আছে? এক্ষেত্রে সরকারের আরো কী করণীয় আছে?

ঘাটতি তো অবশ্যই আছে। সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিতে হবে সরকারকে, কারণ মূল সমস্যা জমির দাম। এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের নিজস্ব জমি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপে (পিপিপি) দেয়া যেতে পারে। তাতে ডেভেলপাররা কম খরচে প্রকল্প করতে পারবে, সরকারও লাভবান হবে। রাজউক তখন নিজের খরচে অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প না করে মনিটরিং, পরিকল্পনা ও তদারকিতে মনোযোগ দিতে পারবে, যা তার মূল কাজ।

জমির মালিক হিসেবে সরকার নিজের অংশের ফ্ল্যাট ভাড়া, সরকারি কোয়ার্টার বা বিক্রির মাধ্যমে সমাজের নির্দিষ্ট অংশকে দিতে পারবে। অন্যদিকে জমির খরচ কমায় ডেভেলপাররা সাশ্রয়ী মূল্যে অ্যাপার্টমেন্ট বানাতে পারবে। সরকার শর্ত দিতে পারে, কত অংশ সাশ্রয়ী দামে আর কত অংশ বাজারদরে বিক্রি হবে। ভারত, শ্রীলংকাসহ অন্য দেশে এভাবেই সাশ্রয়ী আবাসন গড়ে উঠেছে।

এছাড়া আরো কয়েকটি উপায় আছে—আর্থিক ভর্তুকি। ২০১৫ সালের পর ভারতে প্রধানমন্ত্রীর আবাস যোজনা নামের কর্মসূচির আওতায় আয়ের স্তর অনুযায়ী আবাসন খাতের ঋণে ৩ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে, যা ঋণ বিতরণের সময় গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে যায়। সাশ্রয়ী আবাসন হিসেবে যোগ্য প্রকল্পে ডেভেলপারদের জন্য আর্থিক প্রণোদনা থাকা দরকার।

আপনারা প্রচলিত অর্থায়ন ব্যবসা দিয়ে শুরু করেছিলেন। সম্প্রতি শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়নও শুরু করেছেন। তিন দশকের অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যতে আরো বড় কোনো কিছু করার পরিকল্পনা আছে কি?

গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী প্রডাক্ট তৈরি করতে হয়। তিন বছর আগে আমরা শরিয়াহভিত্তিক ইসলামিক ফাইন্যান্সিং উইন্ডো চালু করেছি। এটি খুব ভালো করছে। এখন আমাদের ব্যবসার প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসছে এখান থেকে। আমি নিশ্চিত সামনে এটি আরো ভালো করবে। পাশাপাশি আমরা কয়েকটি বিষয় নিয়ে কাজ করছি। যার মধ্যে সাশ্রয়ী আবাসন অন্যতম। ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের গ্রাহকদের জন্য কাজ চলছে। ইকোসিস্টেম গড়ে উঠলে অর্থাৎ এ দামের মধ্যে ফ্ল্যাট এলে বিষয়টি গতি পাবে। জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করছি। আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতেই হবে। পানি ও এসির ব্যবহার কমানো, সোলার ব্যবহারের মতো উদ্যোগ ছাড়া কার্বন নিঃসরণ কমবে না। টেকসই ও গ্রিন ফাইন্যান্সিংয়ের দিকে যেতে হবে। এ ধরনের নতুন যেকোনো পদক্ষেপে ডিবিএইচ শুরু থেকেই যুক্ত আছে।

আগে আবাসন খাতে অর্থায়ন মূলত ঢাকা-চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ছিল। গত পাঁচ বছরে সব বিভাগীয় শহরে আমাদের অফিস হয়েছে। প্রায় ১৯টি। ভবিষ্যতে জেলা শহরেও পৌঁছে গ্রাহকের কাছে সেবা নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। অ্যাফোর্ডেবল, ইসলামিক ও গ্রিন হাউজিং—এ ভ্যারিয়েন্টগুলো নিয়েই আমরা এগোতে চাই।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে বিনিয়োগকারীদের প্রতিও আপনাদের দায়বদ্ধতা আছে। আর্থিক ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে আপনাদের কৌশলগত অগ্রাধিকার কী?

একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু পোর্টফোলিও বাড়ানোয় নয়। গ্রাহকের আস্থা ধরে রেখে বটম লাইন, অর্থাৎ মুনাফা নিশ্চিত করতে হয়, যাতে বিনিয়োগকারীরা রিটার্ন পান। আমরা শুরু থেকেই শর্ট-টার্ম গ্রোথের চেয়ে টেকসই হওয়ায় বিশ্বাস করি। তাই বোর্ড বা ইকুইটি হোল্ডারদের কাছ থেকে কখনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ ছিল না। আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল গ্রাহকের আস্থা ধরে রেখে মুনাফা নিশ্চিত করা।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সম্পদের গুণগতমান ও খেলাপি ঋণ নিম্ন পর্যায়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। ৩০ বছরে আমাদের এনপিএল কখনো ১ শতাংশ অতিক্রম করেনি এবং এটি প্রকৃত খেলাপি ঋণ এনপিএল। ঋণ অবলোপন বা পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণ কমানো যায়, কিন্তু আমাদের অবলোপনের পরিমাণ খুবই কম। এখন পর্যন্ত ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি গৃহ ঋণ দিয়েছি, আর মোট অবলোপন ৭ কোটি টাকারও কম।

বিগত ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমরা ডেটা অ্যানালাইসিস ও এআই ব্যবহার করছি। গ্রাহকদের ডেমোগ্রাফিক্স ও রিপেমেন্ট প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে নতুন ঋণ দিচ্ছি। মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে সিস্টেম নিজে প্যাটার্ন শিখে আমাদের আউটপুট দিচ্ছে। এতে দক্ষতা বাড়ছে, আর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ক্রমাগত বিকশিত হচ্ছে।

আমানতকারীর আস্থা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যত বড় অংকেরই আমানত হোক, আমরা কখনো কাউকে বলিনি একদিন”বা ১০ মিনিট পর আসুন। যেকোনো পরিমাণ আমানত ফেরত দেয়ার মতো তারল্য আমরা সব সময় রাখি। এতে মুনাফায় কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে, কারণ উদ্বৃত্ত অর্থ বিনিয়োগ করলে বেশি রিটার্ন পাওয়া যেত। তবু গ্রাহকের আস্থার জায়গায় আমরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না। টেকসই পথে ব্যবসা বাড়ানোই আমাদের লক্ষ্য।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অর্থনীতি এবং ব্যাংক ও আর্থিক খাত নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আবাসন খাতেও নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার, রড-সিমেন্টের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। সামনের দিনগুলো কেমন যাবে বলে মনে করছেন?

ব্যবসায় উত্থান-পতন থাকেই। গত ৩০ বছর সবসময় একরকম যায়নি। ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আবাসন খাতে প্রায় চার বছর মন্দা ছিল। মূল্য সংশোধনের পর খাতটি ঘুরে দাঁড়ায়। ২০২১-২২ থেকে আবার মন্দা শুরু হয়েছে, আর গত দুই বছরে তা ঘনীভূত হয়েছে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক কারণ যুক্ত হয়েছে। এ অবস্থায় দায়িত্বশীল অর্থায়ন করা দরকার। শর্ট-টার্ম গ্রোথের দিকে না গিয়ে বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টেকসই অবস্থান নিশ্চিত করাই বড় পদক্ষেপ।

অ্যাপার্টমেন্টের দাম বেশি, গ্রাহকের আয় বাড়েনি, মূল্যস্ফীতির চাপ আছে, সুদের হার বেড়েছিল (যদিও এখন কিছুটা কমেছে)। এ পরিস্থিতিতে ঋণ দেয়া যায় এবং গ্রাহকও চাইতে পারেন, কিন্তু ঋণ দেয়ার সময় হিসাব করতে হবে যেন গ্রাহক বিপদে না পড়েন।

আমরা সব সময় গ্রাহকের নগদ প্রবাহ ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাভিত্তিক অর্থায়ন করেছি। শুরুর সময় বাংলাদেশে সিকিউরিটি বা জামানতভিত্তিক ঋণ খুব জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু যারা এ পথে গেছেন, তাদের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের ওপরে চলে গেছে, যা টেকসই ফাইন্যান্সিং নয়। আমরা নিশ্চিত করি, সুদের হার বাড়লে বা গ্রাহকের ব্যবসা বাজার পরিবর্তনে ধাক্কা খেলেও তিনি যেন ঋণ পরিশোধ চালিয়ে যেতে পারেন। এ বছর ব্যবসা একটু বেশি হলো নাকি কম, তা নিয়ে আমরা খুব চিন্তিত নই। আমাদের মূল উদ্বেগ, পোর্টফোলিওর মান যেন খারাপ না হয় এবং গ্রাহকরা আমাদের ঋণ নিয়ে বিপদে না পড়েন। সেভাবেই আমরা পরিস্থিতি মোকাবেলা করছি।

আরও