এলডিসি উত্তরণ

বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বাড়ল ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত, বাস্তব সংস্কারের তাগিদ

জাতিসংঘের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে প্রস্তুতিকাল বাড়ানো হলেও এ সুযোগ কার্যকর করতে হলে বাংলাদেশকে কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবেলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে হবে। এজন্য অভ্যন্তরীণ সংস্কার এগিয়ে নেয়া, জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন এবং জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরো তিন বছর বাড়িয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। ফলে নতুন সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর। গতকাল নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একই সময় বাড়ানো হয়েছে নেপালের ক্ষেত্রেও। এ সিদ্ধান্তের ফলে অর্থনৈতিক দুর্বলতা মোকাবেলা, অভ্যন্তরীণ সংস্কার জোরদার এবং উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুতির জন্য বাড়তি সময় পেল বাংলাদেশ।

জি-৭৭ ও চীনের পক্ষে বাংলাদেশ ও নেপালের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর প্রস্তাব উত্থাপন করে উরুগুয়ে। এতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রূপান্তর, আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা এবং সাম্প্রতিক অভিঘাতের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিবেচনায় নেয়া হয়। এসব পরিস্থিতির সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা যুক্ত হয়ে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরো জটিল করেছে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিউইয়র্ক থেকে প্রতিক্রিয়ায় অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে সুসংবাদ। এতে উত্তরণের আগে প্রস্তুতি জোরদার করার এবং এলডিসি-সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সহায়তা ও বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখার জন্য বাড়তি সময় মিলেছে। তবে সময় বাড়লেই অর্থনীতির দুর্বলতা দূর হবে না। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে বাস্তব সংস্কারের মাধ্যমে।’

জাতিসংঘের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে প্রস্তুতিকাল বাড়ানো হলেও এ সুযোগ কার্যকর করতে হলে বাংলাদেশকে কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবেলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে হবে। এজন্য অভ্যন্তরীণ সংস্কার এগিয়ে নেয়া, জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন এবং জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অগ্রগতি সম্পর্কে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি-সংক্রান্ত কমিটিকে (সিডিপি) নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য দেয়ার বিষয়টিও প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের বিষয়টি প্রস্তাবে বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। সিডিপির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাধারণত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন কোনো দেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর প্রচলিত ভিত্তি নয়। তবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের জটিলতা ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিবেচনার দাবি রাখে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক অভিঘাত মোকাবেলার চ্যালেঞ্জ আরো বাড়িয়েছে বলেও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের পর্যালোচনায় এলডিসি উত্তরণের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করে। মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার সূচক—এ তিন মানদণ্ডের ভিত্তিতে এলডিসিগুলোর অগ্রগতি মূল্যায়ন করে সিডিপি। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের উত্তরণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর।

কভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব বিবেচনায় বাংলাদেশ, নেপাল ও লাওসকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য ব্যতিক্রমীভাবে পাঁচ বছর সময় দেয়া হয়েছিল। এবার বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল আরো তিন বছর বাড়ানো হলো। ফলে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সম্ভাব্য পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সময় কাজে লাগাতে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য উন্নত করা এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতি প্রয়োজন। পাশাপাশি করের আওতা ন্যায্য ও স্বচ্ছভাবে বাড়ানো, খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং আর্থিক অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে সংস্কার পিছিয়ে থাকলে বাড়তি সময় পাওয়া সত্ত্বেও উত্তরণ-পরবর্তী ঝুঁকি পুরোপুরি মোকাবেলা করা কঠিন হতে পারে।

রফতানি বহুমুখীকরণও বাংলাদেশের প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দেশের রফতানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাতনির্ভর হওয়ায় ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সেবার মতো খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এজন্য আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসুবিধার শর্ত পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনাও বাংলাদেশের জন্য বড় বিবেচ্য বিষয়। তবে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অর্থ সব বাজারে সব সুবিধা একই শর্তে বা একই মেয়াদে অব্যাহত থাকার নিশ্চয়তা নয়। সুবিধার ধরন ও মেয়াদ সংশ্লিষ্ট বাজারের নীতিমালা ও বিধিবিধানের ওপর নির্ভর করবে। তাই প্রধান রফতানি বাজারগুলোর সঙ্গে আগাম আলোচনা, শুল্কের সম্ভাব্য পরিবর্তন, পণ্যের উৎসবিধি এবং উত্তরণ-পরবর্তী বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার প্রস্তুতি নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বাণিজ্য চুক্তি বা বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সেসব সুযোগ কাজে লাগানোর মতো উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের মান, দক্ষতা ও সরবরাহব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় এলডিসি-সংশ্লিষ্ট সুবিধা কমে গেলে রফতানি প্রতিযোগিতায় চাপ তৈরি হতে পারে। তাই উত্তরণের প্রস্তুতিকে কেবল বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখার বিষয় হিসেবে না দেখে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে।

জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে জানানোর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোন সংস্থা কোন সংস্কার বাস্তবায়ন করবে, তার সময়সীমা কী, অর্থায়নের উৎস কোথায় এবং অগ্রগতি পরিমাপের মানদণ্ড কী হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২৯ সালের মধ্যে এমন অর্থনৈতিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে এলডিসি-সংশ্লিষ্ট সুবিধা কমে এলেও রফতানি, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

সব মিলিয়ে, অতিরিক্ত তিন বছর বাংলাদেশের জন্য প্রস্তুতি জোরদারের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সময় বাড়ানোয় নিজে থেকেই অর্থনৈতিক দুর্বলতা দূর হবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাঠামোগত সংস্কার, রফতানি বহুমুখীকরণ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি।

আরও