উৎসবের সময়ও গাড়ি চলাচল বাড়ে না কর্ণফুলী টানেলে

উৎসব কিংবা রাষ্ট্রীয় সাধারণ ছুটির সময়ে পদ্মা ও যমুনার ওপর নির্মিত সেতু কিংবা অন্যান্য অবকাঠামোর ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচলের হার কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

তবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চট্টগ্রামে নির্মিত ব্যয়বহুল কর্ণফুলী টানেলে সেই চিত্র দেখা যায় না। ব্যস্ত সময়েও যানবাহনের হার থাকে খুবই কম। এমনকি উৎসবের ছুটিতেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয় না। ফলে বড় প্রত্যাশা নিয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেলকে ঘিরে সেতু বিভাগের হতাশা আরো তীব্র হয়েছে।

কর্ণফুলী টানেলের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দৈনিক ২৮ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচলের কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে চলছে তিন হাজারের কিছু বেশি। ফলে বিপুল পরিমাণ পরিচালন লোকসানে চলছে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটি। যদিও সেতু বিভাগের পদ্মা ও যমুনা সেতুতে উৎসবের সময়ে স্বাভাবিক সময়ের দুই-তিন গুণ পর্যন্ত যানবাহন চলাচলের চিত্র উঠে এসেছে।

সেতু বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছর ঈদুল ফিতরের আগে ১২ মার্চ পদ্মা সেতুতে ১৮ হাজার ৪৬৪টি যানবাহন চলাচল করে। ১৩ মার্চ এ সংখ্যা ছিল ১৯ হাজার ৯২৫, ১৪ মার্চ ১৭ হাজার ৬৮৮ ও ১৫ মার্চ ১৯ হাজার ৫৫৩। তবে ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনের চাপ দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৬ মার্চ সেতুটিতে উভয় মুখে ২৮ হাজার ৬২৩টি যানবাহন চলাচল করে। আর ১৮ মার্চ যানবাহন চলাচল বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ হাজার ৮৮৫টিতে।

একইভাবে ১২ মার্চ যমুনা সেতুতে ২৫ হাজার ৭১৩টি যানবাহন চলাচল করে। ১৩ মার্চ এ সংখ্যা ছিল ২৬ হাজার ৩৩, ১৪ মার্চ ২৪ হাজার ৫০০ ও ১৫ মার্চ ২৫ হাজার ৪৪০। তবে ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এ সেতুতেও যানবাহনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। ১৬ মার্চ যমুনা সেতুতে ৩৫ হাজার ৬৫৮টি যানবাহন চলাচল করে। আর ঈদের আগে ১৮ মার্চ সেতুটিতে সর্বোচ্চ ৫১ হাজার ৫৮৪টি যানবাহন চলাচলের রেকর্ড হয়।

বিপরীতে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেলে একই সময়ে যানবাহন চলাচলে তেমন কোনো বৃদ্ধি দেখা যায়নি। ১২ মার্চ টানেল দিয়ে ২ হাজার ৯৩৯টি যানবাহন চলাচল করে। ১৩ মার্চ এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২০৭, ১৪ মার্চ ২ হাজার ৯৬৯ ও ১৫ মার্চ ৩ হাজার ৩৫২। ঈদুল ফিতরের আগে ১৬ মার্চ টানেল দিয়ে ৩ হাজার ৪৫৬টি যানবাহন চলাচল করে। ১৭ মার্চ এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২৪৯, ১৮ মার্চ ৩ হাজার ৮১৯ ও ১৯ মার্চ ৩ হাজার ১১০।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা দেশের যেকোনো সড়ক ও সেতুতে ঈদের আগে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে যানবাহনগুলোর চাপে অনেক সময় সড়কে দীর্ঘ যানজটে নানা ভোগান্তির মধ্যে পড়ে সাধারণ মানুষ। এ সময়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যেমন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সর্বশেষ ঈদের আগেও যানবাহনের চাপে বিভিন্ন অংশে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু টানেলকে ঘিরে নানা সুবিধার প্রচারণা সত্ত্বেও অধিকাংশ যানবাহনই এড়িয়ে চলছে সেতু বিভাগের এ অবকাঠামো।

চীনা ঋণে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেলটি চালুর পর থেকে প্রতিদিন ১৭ হাজার যানবাহন চলাচলের প্রাক্কলন করা হয়েছিল। কিন্তু শুরুর পর থেকে প্রতিদিন চার-পাঁচ হাজার যানবাহন চলাচল করত। বর্তমানে সেটি আরো নিচে নেমে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজারে নেমে এসেছে। ঈদের আগের কয়েক দিন দেশের অধিকাংশ সড়ক, সেতু কিংবা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে যানবাহনের আধিক্য দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বাড়লেও কর্ণফুলী টানেলের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মূলত টানেল নির্মাণে প্রাক্কলনে অসংগতির পাশাপাশি টানেলকে ঘিরে আনুষঙ্গিক সড়ক অবকাঠামো যথাসময়ে নির্মাণ শেষ না হওয়ায় টানেল দিয়ে পর্যাপ্ত যানবাহন চলাচল করছে না।

সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকার দক্ষিণ চট্টগ্রামকে ঘিরে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল। বিশেষ করে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ অংশ থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত গভীর সমুদ্রবন্দর, একাধিক বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, একাধিক অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্মাণ পরিকল্পনা ছিল। টানেল নির্মাণকাজ যথাসময়ে সম্পন্ন হলেও উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়ন হয়নি। মূলত চীনের মতো কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের মূল প্রতিপাদ্য ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ ধারণা বাস্তবায়নে সরকারের দীর্ঘসূত্রতা মেগা প্রকল্পটিকে শ্বেতহস্তীতে রূপান্তর করেছে।

জানতে চাইলে সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদাউস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রাক্কলনের মতো যানবাহন নেই এটা সত্য। তবে টানেলকে ঘিরে সড়ক অবকাঠামো, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি আশানুরূপ হয়নি। শুরুতে যানবাহন চলাচল কম হলেও ধারাবাহিকভাবে এ সংখ্যা বাড়বে, এতে সন্দেহ নেই। দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অঞ্চল, গভীর সমুদ্রবন্দর, মেরিন ড্রাইভ সড়ক কিংবা কক্সবাজারকে ঘিরে বৃহৎ পর্যটন নগরী গড়ে তোলার কাজ সম্পূর্ণ হলে টানেল এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হবে।’

২০২২ সালের ১৮ নভেম্বর টানেল রক্ষণাবেক্ষণ ও টোল আদায়ের লক্ষ্যে সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে টানেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (সিসিসিসি) নিয়োগ দেয় সরকার। প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ বছরে মোট ৯৮৩ কোটি ৮২ লাখ ৬২ হাজার ১৬৬ টাকা পরিশোধ করতে হবে। এ হিসাবে প্রতি বছর টানেল পরিচালনায় সেতু বিভাগের ব্যয় ১৯৭ কোটি টাকা। আয় অনুযায়ী ব্যয়ের হার বেশি হওয়ায় লোকসান কমিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সেতু বিভাগ। আগে প্রতিদিন ৩৭ লাখ টাকার বেশি পরিচালন ব্যয় হলেও দেড় বছর ধরে ব্যয় কমিয়ে দৈনিক ২০-২২ লাখ টাকায় নামিয়ে এনেছে।

প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কর্ণফুলী টানেলে দৈনিক ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন চলাচলের আশা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৩ হাজার ৮০০টি যানবাহন চলাচলের ফলে অস্বাভাবিক কম আয়ের কারণে এখন বিপুল লোকসানে রয়েছে বিগত সরকারের শ্বেতহস্তী প্রকল্পটি। মূলত যথাযথ সমীক্ষার অভাব, সংযোগকারী প্রকল্প নেয়ার পরিকল্পনায় ত্রুটি ও গাফিলতিতে অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়েছে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকার প্রকল্পটি।

জানতে চাইলে কর্ণফুলী টানেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সৈয়দ রজব আলী বণিক বার্তাকে জানান, ‘সারা দেশের সেতু বিভাগের বড় অবকাঠামোগুলো একাধিক জেলাকে সংযোগ করেছে। কিন্তু টানেলের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। টানেল ছাড়াও সড়ক সেতুর মাধ্যমে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় যাতায়াত করা যায়। যার কারণে ঈদের আগে অন্যান্য সেতুর মতো টানেলের যানবাহনের আধিক্য নেই।’ তার মতে, টানেলকে ঘিরে সংযোগ সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা আসলেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।

আরও