বঞ্চিত ও অনগ্রসর মানুষের সামাজিক ও শিক্ষামূলক উন্নয়নে দেশের ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অর্থ ব্যয়ের কথা থাকলেও গত দেড় দশকে সেটি আবর্তিত হয়েছে ‘প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল’ ঘিরে। যেকোনো উপলক্ষ কিংবা দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান-এমডিরা সিএসআরের অর্থ জমা দিতে গণভবনে লাইন ধরতেন। হাসিমুখে ত্রাণ তহবিলের সেই চেক গ্রহণ করতেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর সে দৃশ্যের অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। এখন আর প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে সিএসআরের অর্থ জমা দেয়ার তোড়জোড় নেই। তবে আসন্ন গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন করে সিএসআরের অর্থে নজর পড়েছে।
এরই মধ্যে ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিল থেকে দেশের নাগরিক সংগঠন ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ বা ‘সুজন’কে আড়াই কোটি টাকার অনুদান দেয়া হয়েছে। এ অর্থে সংগঠনটির পক্ষ থেকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা চালানো হবে। আর এ তহবিল থেকে ২০ লাখ টাকা অনুদান পেয়েছে বিতর্ক সংগঠন ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’। এ অর্থে সংগঠনটি ‘নির্বাচনী বিতর্ক’ আয়োজন করবে বলে জানানো হয়। অন্যদিকে এ তহবিল থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারে ২০ কোটি টাকা চেয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া সংগঠনটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যস্থতায় এ টাকা চাওয়া হয়েছিল। তবে কোনো নিবন্ধিত সংগঠন না হওয়ায় এ টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ’ বা ‘এবিবি’। বাংলাদেশ ব্যাংক ও এবিবি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এবিবি চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এরই মধ্যে এবিবির পক্ষ থেকে সুজন ও ডিবেট ফর ডেমোক্রেসিকে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে ‘সুজন’কে। বাকি ২০ লাখ টাকা ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’কে দেয়া হয়েছে। এ অর্থে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার ও নির্বাচনী বিতর্ক আয়োজন করা হবে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও পরামর্শেই আমরা এ টাকা দিয়েছি।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ২০ কোটি টাকা চাওয়ার বিষয়ে মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এবিবির বৈঠকে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়েছিল। ওই বৈঠকেই প্রস্তাবটি নাকচ হয়। এ ধরনের কোনো সংগঠনকে ব্যাংকের অর্থ দেয়ার সুযোগ না থাকায় ব্যাংক এমডিরা আপত্তি জানান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বিষয়টি আমলে নিয়েছে। ওই বৈঠকের পর এ বিষয়ে আর কোনো কথা হয়নি।’
দেশের সব ব্যাংক এমডি বা শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ১১ জানুয়ারি। ‘ব্যাংকার্স সভা’ নামে পরিচিত ওই বৈঠকে গভর্নরের পক্ষ থেকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর প্রচারে সহযোগিতা করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পরামর্শেই ‘সুজন’, ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ ও ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’কে অনুদান দেয়ার প্রস্তাব তোলা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ‘সুজন’, ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’কে অনুদান দেয়ার বিষয়ে বৈঠকে কেউ আপত্তি তোলেননি। তবে বৈষম্যবিরোধীদের কীভাবে টাকা দেয়া হবে, সে বিষয়ে অনেক এমডি আপত্তি জানান। কারণ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন কোনো নিবন্ধিত দল বা সংগঠন নয়। এ সংগঠনের নামে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টও নেই। কার নামে টাকা দেয়া হবে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে টাকা দেয়ার প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নাগরিক সংগঠন হিসেবে “সুজন” বহুল পরিচিত। আর বিতর্ক আয়োজনের জন্য “ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি”র পরিচিতি রয়েছে। তাদের কার্যক্রম সমাজে দৃশ্যমান। সংস্থা দুটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই ওই অর্থ দেয়ার বিষয়টি ব্যাংকার্স সভায় তোলা হয়। টাকার অংক কম হওয়া ও প্রস্তাবের যৌক্তিকতার বিচারে ব্যাংক নির্বাহীদের কেউ এ বিষয়ে আপত্তি জানাননি। তবে বৈষম্যবিরোধীদের অনুদান দেয়ার প্রসঙ্গ এলে সে প্রস্তাব পাস হয়নি।’
ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে এবিবির মাধ্যমে আড়াই কোটি টাকা বুঝে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ‘সুজন’-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সুজন বহুদিন ধরে বাংলাদেশে নাগরিক অধিকার, জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি ও সংস্কারের পক্ষে আন্দোলন করে আসছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত দুটি সংস্কার কমিটিতে ছিলাম। সে হিসেবে জুলাই সনদের বাস্তবায়নে আমরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে। জনগণকে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে উদ্বুদ্ধ করতেই আমরা ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে অনুদান নিয়েছি। এ অর্থের যথাযথ ব্যয় নিশ্চিত করা হবে।’
এবিবির কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা বুঝে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ ভোটের পক্ষে নয়, বরং আমরা নির্বাচনী বিতর্ক আয়োজনের জন্য অনুদান নিয়েছি। এরই মধ্যে একাধিক বিতর্ক আয়োজন হয়েছে। আগামীতে আরো কয়েকটি বিতর্ক হবে।’
দেশে বিজ্ঞাপন কিংবা স্পন্সরের জন্য এত এত প্রতিষ্ঠান থাকতে ব্যাংকের সিএসআর খাতের অর্থ নেয়ার প্রয়োজন হলো কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে অনুদান চাওয়া হয়েছে। সিএসআর খাতের অর্থ নেয়ার আবেদন কেন করা হয়েছে, সেটি জেনে জানাতে হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গণ-অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির আগের ১০ বছরে দেশের ব্যাংকগুলো সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। এ ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই জমা দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে। আর সেই অর্থ দিয়ে মুজিব বর্ষ উদযাপন, চলচ্চিত্র নির্মাণ, শেখ হাসিনা পরিবারের সদস্যদের জন্ম-মৃত্যু দিবস পালনের মতো আয়োজনও করা হয়েছে। কেবল মুজিব বর্ষ উদযাপনের জন্যই শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টে অনুদান দেয়া হয় ২২৭ কোটি টাকা। সিএসআরের অর্থ ব্যয় হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণেও।
যদিও সিএসআর হলো এক ধরনের ব্যবসায়িক শিষ্টাচার বা রীতি, যা সমাজের প্রতি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনকে নিয়মের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত কার্যক্রমের ফলে উদ্ভূত বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব দূর করা ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে বিদ্যমান ক্ষোভ, অসমতা ও দারিদ্র্য কমানোর উদ্দেশ্যেই এর প্রবর্তন। বর্তমানে সারা বিশ্বেই সিএসআর খাতে ব্যয়কে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো প্রজ্ঞাপন জারি করে সিএসআর খাতে ব্যয় করার জন্য ব্যাংকগুলোকে দিকনির্দেশনা দেয়। তারপর একাধিকবার প্রজ্ঞাপন জারি করে বিধিমালা দেয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের মোট সিএসআরের ৩০ শতাংশ শিক্ষায়, ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্যে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি প্রশমন ও অভিযোজন খাতে ২০ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে (আয়-উৎসারী কার্যক্রম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি এবং অন্যান্য) ২০ শতাংশ অর্থ ব্যয়ের নির্দেশনা দেয়। একই বছরের ২৯ নভেম্বর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট তহবিলে মোট সিএসআর ব্যয়ের ৫ শতাংশ অনুদান হিসেবে দিতে হবে।