জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ। সহায়-সম্পদ হারানোর পাশাপাশি সুপেয় পানির সংকট, চিকিৎসার অভাব, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জীবিকার সংকট মানুষের জীবনযাত্রা ও পরিবেশকে আরো বিষিয়ে তুলেছে। দিন দিন বাড়ছে উদ্বাস্তুর সংখ্যা। বাধ্য হয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন অনেকে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়নি। এ অবস্থায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন শ্রমজীবীরা।
উপকূলের বাসিন্দারা বলছেন, বিশাল এ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বাপ-দাদার পেশা হিসেবে কৃষি ও মৎস্য চাষ বেছে নিলেও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ আর সুযোগ-সুবিধার অভাবে উদ্যোক্তা হতে পারছেন না। সমাজের চোখে ছোট হওয়ার ভয়ে শিক্ষিত বেকাররাও কৃষি বা মৎস্য চাষকেও গ্রহণ করছেন না। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে সম্ভাবনাময় যুব সমাজ। অর্থের অভাব, পারিবারিক চাপ, হীনম্মন্যতা আর হতাশায় অনেকেই পাড়ি জমাচ্ছেন মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, জাপান, কোরিয়া, দুবাই, কাতার ও সিঙ্গাপুরসহ ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে।
সাতক্ষীরা জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকারিভাবে ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে ৩০ হাজার ২৩৯ কর্মী পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১ হাজার ৪২৪, ২০২২ সালে ৫ হাজার ১১৯, ২০২৩ সালে ১০ হাজার ৯৭২, ২০২৪ সালে ৬ হাজার ৯১০ ও চলতি বছর আগস্ট পর্যন্ত ৫ হাজার ৮১৪ জন বিদেশ গেছেন। এসব কর্মীর মধ্যে পুরুষ রয়েছেন ৩০ হাজার ৭৪১ এবং নারী ৪ হাজার ৯১২ জন।
২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুসারে ৩ হাজার ৮৫৮ দশমিক ৩৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ জেলার জনসংখ্যা ২১ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮২ জন। এর মধ্যে ২৮ শতাংশের বেশিই বেকার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী জেলাটিতে ২০-২৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে।
সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী উপজেলা কালীগঞ্জের খানজিয়া গ্রামের সাব্বির হোসেন এইচএসসি পাস করে তিন বছর বেকার ছিলেন। দেশে কাজের সন্ধান না পেয়ে চলে যান সৌদি আরবে। সেখানে একটি রেস্তোরাঁয় ৭০ হাজার টাকা মাসিক বেতনে কাজ করছেন দুই বছর ধরে। তার বাবা সিরাজুল ইসলাম জানান, এখন তারা বেশ সচ্ছলতার সঙ্গে দিন কাটাচ্ছে।
সদর উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামের জাকির হোসেন চার বছর আগে ড্রাইভিংয়ের চাকরি নিয়ে চলে যান কাতারে। এখন তিনি মাসে ৫৫ হাজার টাকা বেতন পাচ্ছেন। শহরে বাড়িও করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশালসংখ্যক বেকার যুবসমাজ তৈরি হওয়ার পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। এ জেলায় ২২ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে পাঁচ লক্ষাধিক মৌসুমি বেকার রয়েছেন। কারণ বর্ষার মৌসুমে আশাশুনি, শ্যামনগর ও তালা উপজেলার নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলোয় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ফলে কর্মসংস্থান সংকট দেখা দেয়। কর্মহীন এ জনগোষ্ঠীর কিছু অংশ অন্যের জমি চাষ করলেও বড় একটি অংশ শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। পরবর্তী সময়ে যারা মৌসুমি বেকারে পতিত হয়। কর্মসংস্থানের জন্য গড়ে ওঠেনি বড় কোনো শিল্প-কারখানা। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয় না। এছাড়া জেলার বেশির ভাগ মানুষ কৃষি ও মৎস্য চাষের ওপর নির্ভরশীল হলেও তৈরি হচ্ছেন না উদ্যোক্তা। প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে মিলছে না চাকরি। সাম্প্রতিককালে কিছু যুবক ব্যক্তিপর্যায়ে মৌচাষ ও মধু সংগ্রহের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে সেটিও ব্যাহত হচ্ছে।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবুল হাসেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের যুব সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এর মূল কারণ হচ্ছে শিক্ষাজীবন শেষে তারা দেশে পছন্দের কাজ না পেয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। আবার বিদেশে গিয়েও অনেক তরুণ-তরুণী প্রতারণার শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। বেকারত্ব ঘুচাতে সরকারের বৃহৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষিত বেকার তরুণ জনগোষ্ঠীকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় সে চিন্তা করতে হবে। দেশে শিল্প ও পর্যটন খাত বাড়াতে হবে। শুধু সরকারি চাকরিই করতে হবে এমন চিন্তা বা ধারণা থেকে সরে আসতে হবে। এখন ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে। যেকোনো ছোটখাটো উদ্যোক্তা হওয়া যেতে পারে—এমন চিন্তা করতে হবে তরুণদের।’
দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাত হচ্ছে জনশক্তি রফতানি। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। তারা শ্রমলব্ধ অর্থে দেশের অর্থনীতিও গতিশীল করছে।
দেবহাটা উপজেলার শ্যামনগর গ্রামের খাদিজা বেগম গৃহকর্মী হিসেবে পাঁচ বছর ধরে সৌদি আরব রয়েছেন। তার স্বামী আব্দুর রাজ্জাক জানান, সংসারে অভাব-অনটনের কারণে খাদিজাকে সৌদি আরবে পাঠান। প্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকা বেতন পান। এতে তার সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। পাকা বাড়ি করেছেন। ছেলেমেয়ে বিয়ে দিয়েছেন প্রবাসী স্ত্রীর পাঠানো টাকায়।
সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়া এলাকার বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান ২০১৮ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিকের কাজ করছেন। বর্তমানে তার মাসিক আয় ৪৫ হাজার টাকা। তার স্ত্রী ডলি খাতুন জানান, স্বামীর পাঠানো টাকায় মেয়ের পড়ালেখার পাশাপাশি একটি বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এখন আর সংসারে কোনো অভাব নেই।
সাতক্ষীরা জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুল মজিদ জানান, গত চার-পাঁচ বছর জনশক্তি রফতানির হার বেড়েছে। শিক্ষিত বেকার ছেলেমেয়েরা সরকারিভাবে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, জাপান, কোরিয়া, দুবাই, কাতার ও সিঙ্গাপুরসহ ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন। বছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি রেমিট্যান্স আসছে সাতক্ষীরায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৮৯ কোটির টাকার বেশি রেমিট্যান্স এসেছে।
সাতক্ষীরা সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এএম মিজানুর রহমান জানান, দক্ষ কর্মী তৈরি করতে প্রতি বছর সাড়ে ৬ হাজার নারী-পুরুষকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণের মধ্যে কম্পিউটর, রেফ্রিজারেটর, ড্রাইভিং, মোবাইল সার্ভিসিং ও ইলেক্ট্রিক্যাল কোর্স রয়েছে। এছাড়া জাপান ও কোরিয়ান ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে এসব ছেলেমেয়ে দেশে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বিদেশে যাচ্ছেন বিভিন্ন কাজে।