দেশে ভারী শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে। চাহিদা সংকুচিত হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সুদের হার বাড়ানো ও জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে শিল্প খাত। পুরনো কারখানাগুলোয় যখন উৎপাদনে ভাটা চলছে, তখন নতুন বিনিয়োগের ঝুঁকি নিচ্ছেন না দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তারা। অনেক ব্যবসায়ী এখন উৎপাদন খাতের চেয়ে ট্রেডিং বা অন্যান্য সেবা খাতে বিনিয়োগ করাকে নিরাপদ মনে করছেন। এর প্রভাব পড়েছে কাঁচামাল আমদানিতে।
অনেক কারখানায়ই উৎপাদন আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ। এ ধারা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি আরো মন্থর হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের প্রথম সারির ব্যবসায়ীরা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হালনাগাদ তথ্য বলছে, সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ১৩ কোটি ৭১ লাখ টন পণ্য আমদানি হয়েছে, যাতে স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় হয়েছে ৬ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) এ আমদানির পরিমাণ ছিল ১৩ কোটি ১৭ লাখ টন, ব্যয় হয়েছিল ৬ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। সামগ্রিকভাবে পরিমাণে ৪ শতাংশ আমদানি বাড়লেও শিল্প খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভারী কাঁচামালের আমদানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক কিংবা ন্যূনতম। আর এতেই স্পষ্ট হচ্ছে উৎপাদন খাতে চলমান সংকোচন।
দেশে সিমেন্ট শিল্পের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে এর আমদানি ছিল ১ কোটি ৯০ লাখ টন, আগের বছর যা ছিল ২ কোটি ৪ লাখ টন। অর্থাৎ আমদানি কমেছে ৭ শতাংশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র দেখা গেছে।
প্রিমিয়ার সিমেন্ট পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিল্প খাতের কাঁচামাল আমদানি উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। দেশে উৎপাদন ব্যাপকভাবে ধীর হয়েছে। কর্মসংস্থান কিংবা প্রবৃদ্ধি বাড়ার কথা উৎপাদনের ওপর ভর করে। কিন্তু যেটা হচ্ছে শিল্প খাতে অনেক কারখানা এখন বন্ধ হতে শুরু করেছে। সরকার বিদেশী বিনিয়োগ আনার কথা বলছে। আমরা বলি, এগুলো বিক্রি করার একটা উদ্যোগ নিতে পারে সরকার। গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা নেই। একদিকে নতুন ইকোনমিক জোনের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে গ্যাস না চাওয়ার নিশ্চয়তাও চাওয়া হচ্ছে। ব্যবসা করতে গিয়ে একটার পর একটা সংকট মোকাবেলা করতেই হচ্ছে। অলরেডি নীতি সুদের হার যে পর্যায়ে গেছে, বিনিয়োগ কীভাবে হবে। ব্যবসায়ীরা এখন উৎপাদন খাতে মূলধন ঝুঁকির চেয়ে ট্রেডিংয়ে বা অন্যান্য সেবা খাতে বিনিয়োগ করাকে নিরাপদ মনে করছেন। আমরা বারবার বলে আসছিলাম আমাদের কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস যেন কোনোভাবে না বাড়ে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদের হার বাড়ানো এবং জ্বালানি সংকটের ফলে আগের বিনিয়োগই মুখ থুবড়ে পড়েছে। এদিকে সামনে ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এমন পরিস্থিতিতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর যখন বিকল্প ছিল না, সেখানে কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে উল্টো।’
রডসহ নির্মাণ শিল্পের কাঁচামালের অন্যতম উৎস জাহাজ ভাঙা কারখানা। এছাড়া হালকা প্রকৌশল খাতের অনেক সরঞ্জামও সরবরাহ হয় এখান থেকে। পুরনো জাহাজ আমদানি করে ধাপে ধাপে কেটে বিক্রি করে সীতাকুণ্ডের উপকূলবর্তী এসব জাহাজ ভাঙা কারখানা। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে যেসব পুরনো জাহাজ আমদানি হয়েছে, সেগুলোয় লোহার পরিমাণ ৮ লাখ ৪৫ হাজার টন। যদিও এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি হওয়া পুরনো জাহাজে লোহার পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ লাখ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে ১৫ শতাংশ।
চট্টগ্রামে বড় জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড ও রড তৈরির দুটি কারখানা রয়েছে মোস্তফা হাকিম গ্রুপের। এ গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ সরওয়ার আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা নিজস্ব জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে উৎপাদিত রডের কাঁচামাল নিজেদের ইস্পাত কারখানায়ই কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করি। আমাদের গোল্ডেন ইস্পাত ও এইচএম স্টিল নামে দুটি স্বয়ংক্রিয় রড তৈরির কারখানা রয়েছে। এখন গোল্ডেন ইস্পাত লিমিটেডের উৎপাদন একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছি। আবার সব মিলিয়ে এক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে এইচএম স্টিল কারখানা গড়ে তুললেও এর উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকই অলস বসিয়ে রেখেছি। গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ, কর হার প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছে। জ্বালানি, বিশেষত গ্যাসের অতিরিক্ত দাম বাড়ানোর কারণে আমাদের কস্টিংয়ের সঙ্গে যে সেলিং প্রাইস ছিল তার কোনোটার সঙ্গেই আর কোনোটা খাপ খাচ্ছে না। আবার উৎপাদনের খরচের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্যমূল্য বাড়ানোর সুযোগও নেই। কারণ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প যেমন থেমে গেছে, আবার ব্যক্তি পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে ক্রেতারা। জানুয়ারির আগে তো কোনো বিক্রিই ছিল না। ফেব্রুয়ারির শুরুর দিক থেকে ধীরে ধীরে কিছুটা উন্নতি হতে থাকলেও স্বাভাবিক সময়ের সঙ্গে তার তুলনা করা যাচ্ছে না।’
এনবিআরের তথ্য বলছে, সদ্য শেষ হওয়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরের রড শিল্পের কাঁচামাল পুরনো লোহার টুকরো আমদানি হয়েছে ৫২ লাখ ৪১ হাজার টন। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে পুরনো লোহার টুকরা আমদানি হয়েছিল ৫১ লাখ ৪১ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে আড়াই শতাংশের মতো। এসব কাঁচামাল সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো থেকে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস ও মালয়েশিয়া থেকে পুরনো লোহার টুকরা আমদানি হয়।
বিএসআরএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমের আলীহুসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে এমনিতে মাথাপিছু ইস্পাত ব্যবহারের হার অনেক কম। ফলে চাহিদা বেড়ে প্রতি বছর উৎপাদনও বাড়ার কথা। যদিও উৎপাদন ধীর হওয়ায় সামগ্রিকভাবে এ খাতের কাঁচামালের আমদানি সেভাবে বাড়ছে না। নির্মাণকাজের স্থবিরতা এর অন্যতম কারণ। স্থানীয় ইস্পাতের চাহিদার বড় অংশই ব্যবহার হয় সরকারি নির্মাণ ও মেগা প্রকল্পে। কিন্তু এ ধরনের প্রকল্পের কাজ কমে গিয়ে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। আবার নির্মাণ মৌসুমের যে সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল সেটাও সেভাবে হয়নি। ঈদের দীর্ঘ বন্ধ ও নানা ধরনের কর্মসূচি উৎপাদনে যথেষ্ট ক্ষতি করেছে। প্রতি বছর প্রতিযোগী দেশগুলো ব্যবসার খরচ কমাচ্ছে আর আমাদের দেশে ব্যবসার খরচ নানা কারণে অনেক বেড়ে গেছে। ভালো কিছু করতে হলে দুর্বল অবকাঠামো, জ্বালানি সংকট, রাজস্ব নীতি ও ঘন ঘন পরিবর্তনের নীতি থেকে নীতিনির্ধারকদের বেরিয়ে আসতে হবে।’
কেবল নির্মাণ নয়, ভোগ্যপণ্যেও লক্ষ করা যাচ্ছে সংকোচন। মানুষের খাদ্যপণ্য ব্যবহারেও এসেছে পরিবর্তন। দেশের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য গম আমদানি কমেছে ১৫ শতাংশ। এনবিআরের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গম আমদানি হয়েছে ৫৯ লাখ টন, যেখানে তার আগের অর্থবছরে ছিল ৬৯ লাখ টন। আমদানির পাশাপাশি দেশের চাহিদার মাত্র ১৩-১৪ শতাংশ গম স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। তবে ভোজ্যতেলের আমদানিতে (পাম ও সয়াবিন মিলিয়ে) ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে পাম ও সয়াবিন মিলে ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ২৪ লাখ ৫০ হাজার টন। এর আগের অর্থবছরে এ আমদানি পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ টন।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উৎপাদন ব্যবস্থায় স্থবিরতার কারণ বহুবিধ। ব্যবসা পরিচালনায় একটার পর আরেকটা সংকট ফেস করতে হয়েছে উদ্যোক্তাদের। গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ সংকট। কারখানা যেগুলো চলছে সেখানে জ্বালানি কখনো পাওয়া যাচ্ছে, আবার কখনো মিলছে না। অনেক ফ্যাক্টরিও বন্ধ কিংবা উৎপাদন সীমিত হয়ে গেছে। কাঁচামালের পাশাপাশি মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিও কমে চলেছে। অন্যদিকে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপও রয়ে গেছে। ভোগ্যপণ্যের কথা বললে গমের তৈরি খাদ্যপণ্যের ব্যবহারও অনেক কমে গেছে। ইউটিলিটি সার্ভিস না পাওয়ায় দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলেও সেগুলো পুরোপুরি বিনিয়োগবান্ধব নয় এখনো। উচ্চ ব্যয় ও পরিচালনে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে বড় উদ্যোগের পাশাপাশি ছোট পরিসরের উৎপাদন খাতও বড় হয়ে উঠবে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি করতে খোলা ঋণপত্রের নিষ্পত্তির হার কমেছে সাড়ে ২৫ শতাংশের বেশি। নতুন করে কেউ বিনিয়োগে না যাওয়ায় মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমে গেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভের যে পতন শুরু হয়েছিল, তাতে স্বস্তির জায়গা তৈরি হলেও অনিশ্চয়তার জায়গা তৈরি হয়েছে আরো অনেক ক্ষেত্রে। কারখানা সচল রাখতে যতটুকু কাঁচামালের মজুদ না থাকলেই নয়, তারা ততটুকুই আমদানি করছেন। নির্মাণ খাত কিংবা ভোগ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে অনেকেই উৎপাদন একেবারে সীমিত করে টিকে থাকার লড়াই করে যাচ্ছেন। ইকোনমিক জোনের অনুমোদন দেয়া হলেও গ্যাস-জ্বালানির নিশ্চয়তা না থাকায় বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে যাচ্ছেন। শিল্প স্থাপনের নতুন উদ্যোগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ মন্থর হয়ে গেছে।
টিকে গ্রুপের পরিচালক মুহাম্মদ মুস্তফা হায়দার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রিজার্ভ ভালোর দিকে যাচ্ছে এটা ঠিক, তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থবিরতা কাটছে না। এর আগে সংকোচনমূলক নীতির কারণে আমদানি কমেছিল। মূল্যস্ফীতি ভোক্তা চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সব ক্ষেত্রেই ধীরগতি। শিল্পে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা তৈরি হলে তা সরকারের রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলে। এর উন্নয়ন ঘটাতে উপযুক্ত পরিকল্পনার মাধ্যমে সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কমানোর পদক্ষেপ নিয়ে সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়নে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়াতেই হবে।’