গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা এবং সংসদকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সরকারি ও বিরোধী দল উভয়েরই দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এসেছে। এখন গণতন্ত্রকে রক্ষা করা এবং তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া সবার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। পাশাপাশি সংসদকে কার্যকর করতে হবে এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করতে হবে।
আজ মঙ্গলবার বিকালে সিলেট সিটি করপোরেশনের আয়োজনে নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় তার সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগম উপস্থিত ছিলেন।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্ব অনুষ্ঠানে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, হুইপ জি কে গউস এবং রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতন্ত্রের জন্য অতীতে দেশের মানুষ বহু ত্যাগ স্বীকার করেছে। সেই ত্যাগের বিনিময়ে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা অবহেলা করে নষ্ট করা যাবে না। এখন দেশের পুনর্গঠন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে। বারবার সেই সংগ্রাম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এবার যে সুযোগ এসেছে, সেটিকে কাজে লাগাতে হবে। দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে দেশের অভিন্ন স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সিলেটের পর্যটন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, পাহাড়, নদী, ঝরনা, চা-বাগান, বন ও হাওর সব মিলিয়ে সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন অঞ্চল। পরিকল্পিতভাবে এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে পর্যটন খাতে আরো বড় ধরনের উন্নয়ন সম্ভব।
প্রবাসীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সিলেটের প্রবাসী সমাজ শুধু এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তাদের বিনিয়োগকে পর্যটন, কৃষি, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত শিল্প, চা, মৎস্য, গ্যাস, তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে হবে।
রাষ্ট্রপতি আরো বলেন, সিলেটের হাওর ও জলাশয়কে কেন্দ্র করে মৎস্য চাষের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে নতুন শিল্প গড়ে তোলার সুযোগও রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি ও প্রবাসী বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
বিদেশে জনশক্তি রফতানির প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে কাজ করছেন। বন্ধ হয়ে যাওয়া কিছু শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ খাত আগামী দিনে আরও এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সিলেটের উন্নয়ন প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, এ অঞ্চলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিরা সিলেটের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন। বড় কিছু উন্নয়ন প্রকল্পও সামনে এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ চলছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে আসছে। এ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাংলাদেশের অন্যতম সৌন্দর্য। এ সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রাখতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল ও মতের ভিন্নতা থাকবে। কিন্তু দেশের স্বার্থে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করা সম্ভব, সেসব বিষয়ে সবাইকে একমত হতে হবে। তিনি বলেন, আমরা যদি নিজের পায়ে নিজেরা দাঁড়াতে না পারি, নিজেদের অধিকার নিজেরা আদায় করে নিতে না পারি, কেউ এসে আমাদের সবকিছু করে দিয়ে যাবে না।
অনুষ্ঠানে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে বক্তব্য দেন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ড. কামাল আহমদ চৌধুরী, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. জিয়াউর রহমান চৌধুরী, কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন (সিজেএ) প্রেসিডেন্ট পারভীন এফ চৌধুরী, সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি গোলাম ইয়াহইয়া চৌধুরী সোহেল ও ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে প্রশান্ত কুমার সিংহ।
এ সময় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।